নিজস্ব প্রতিবেদক, লালপুর (নাটোর)
নাটোরের লালপুরে ডিজিটাল সংযোগ স্থাপন (ইডিসি) প্রকল্পের আওতায় উপজেলা কমপ্লেক্স ভবনের চতুর্থ তলার ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ (আইসিটি ভবন) নির্মাণকাজে ব্যাপক অনিয়ম ও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। ১ কোটি ৫১ লাখ ৬১ হাজার ২৯১ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবনটির বিভিন্ন অংশে কাজ শেষ হওয়ার আগেই ত্রুটি দেখা দিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। এ ঘটনায় সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার ও নির্মাণকাজের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অধীনে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ই-স্মার্ট কনস্ট্রাকশন লিমিটেড নির্মাণকাজটি শুরু করে। তবে কাজের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও ভবনটির বিভিন্ন অংশে ত্রুটি থাকার অভিযোগ উঠেছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, ভবনটি পুরোপুরি ব্যবহারের আগেই দরজার হাতল, ছিটকিনি ও বারান্দার লোহার গ্রিলে মরিচা ধরেছে।
ভবনের বাথরুম ও বেসিনে ব্যবহৃত শাওয়ার ও পানির কলের মান নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব ফিটিংস ব্যবহারের আগেই আলগা হয়ে গেছে এবং সেগুলোর প্রলেপ উঠে যাচ্ছে। এ ছাড়া বারান্দা ও জানালায় ব্যবহৃত থাই গ্লাসের ফিনিশিং দুর্বল বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গ্লাসের রাবার বিডিং ও আঠা যথাযথভাবে লাগানো হয়নি এবং জানালার সংযোগস্থলে ফাটল ও ভাঙা অংশ দেখা গেছে।
ভবনের কয়েকটি স্থানে টাইলস ভাঙা ও অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা গেছে। দরজার কাঠের কাজ এবং কবজা সংযোজনের ফিনিশিং নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। তাঁদের মতে, সরকারি অর্থে নির্মিত একটি ভবনের ক্ষেত্রে এমন ত্রুটি গ্রহণযোগ্য নয়। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নির্মাণকাজের প্রাক্কলন, কার্যাদেশ, ব্যবহৃত সামগ্রীর মান এবং সংশ্লিষ্ট কারিগরি নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
ঠিকাদারের দাবি, ত্রুটি থাকলে সংশোধন করা হবে
অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ই-স্মার্ট কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের দায়িত্বপ্রাপ্ত মাসুদ রানা বলেন, তাঁরা কাজ শেষ করে সংশ্লিষ্টদের কাছে ভবনটি হস্তান্তর করেছেন। যদিও চূড়ান্ত বিল এখনো পাননি বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, ভবনের কোনো অংশে সমস্যা থাকলে কিংবা নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেলে সেগুলো পরিবর্তন করে দেওয়া হবে।
কাজ বুঝে নেওয়া নিয়ে কর্মকর্তাদের বক্তব্যে অসংগতি
এদিকে উপজেলা এলজিইডি দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত নকশাকার ও উপসহকারী প্রকৌশলী মো. ইকবাল হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সিডিউল অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার প্রত্যয়ন নিয়েই ঠিকাদারকে বিল দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
তবে লালপুর উপজেলা প্রকৌশলী ও প্রকল্প মনিটরিং কমিটির সদস্যসচিব মো. আওলাদ হোসেনের বক্তব্য ভিন্ন। তিনি বলেন, ভবনটির কাজ চূড়ান্তভাবে তাঁদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। বৈদ্যুতিক সংযোগের কাজও বাকি রয়েছে। কাজ বুঝে নেওয়ার পর ঠিকাদারকে বাকি বিল দেওয়া হবে।
দুই কর্মকর্তার বক্তব্যে কাজ সম্পন্ন হওয়া, ভবন হস্তান্তর এবং বিল পরিশোধের বিষয়ে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। ফলে প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা, ঠিকাদারকে কত টাকা বিল দেওয়া হয়েছে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ বুঝে নেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস
প্রকল্প মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও লালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী মো. মেশকাতুল ইসলাম বলেন, এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, যথাযথ তদারকির অভাবে নির্মাণকাজে অনিয়ম হয়ে থাকতে পারে। তাঁরা দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ভবনের নির্মাণমান যাচাই, ত্রুটিপূর্ণ কাজ সংশোধন এবং অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
সরকারি অর্থে নির্মিত এ ভবনের স্থায়িত্ব ও ব্যবহারযোগ্যতা নিশ্চিত করতে নির্মাণকাজের কারিগরি মান যাচাই, বিল পরিশোধের নথি পরীক্ষা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিউজ বাংলা চ্যানেল