নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের ইসলামী ব্যাংকিং খাতে আমানত ও বিনিয়োগ বাড়লেও গ্রাহকদের আস্থা ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর আমানত কাঠামো, প্রবাসী আয় সংগ্রহ এবং জনবলের পরিবর্তন খাতটির সামনে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের আগস্টে ইসলামী ব্যাংকগুলোর মোট আমানতের ৮৬ দশমিক ৮৪ শতাংশ এসেছে মুদারাবাভিত্তিক হিসাব থেকে। একই সময়ে বেসরকারি খাতের আমানতের অংশ ছিল ৮৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ। ফলে আমানতকারীদের আস্থা এবং বেসরকারি গ্রাহকদের অংশগ্রহণ এ খাতের স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে ইসলামী ব্যাংকিং খাতের আমানত, বিনিয়োগ, প্রবাসী আয়, এজেন্ট ব্যাংকিং ও সম্পদের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে একদিকে সম্পদ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির তথ্য পাওয়া গেছে, অন্যদিকে প্রচলিত ব্যাংকের তুলনায় আমানত ও প্রবাসী আয় সংগ্রহে প্রবৃদ্ধির ব্যবধানও স্পষ্ট হয়েছে।
খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, মুদারাবাভিত্তিক আমানতের ওপর নির্ভরশীলতা ইসলামী ব্যাংকিংয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এ ব্যবস্থায় আমানতকারীদের আস্থা, ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা এবং ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকের আর্থিক দুর্বলতা, আমানত উত্তোলন নিয়ে অনিশ্চয়তা কিংবা সুশাসনের ঘাটতি গ্রাহকদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করা, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তাঁরা।
প্রবাসী আয় সংগ্রহে প্রচলিত ব্যাংকের তুলনায় পিছিয়ে
ইসলামী ব্যাংকিং খাতের অন্যতম উদ্বেগের জায়গা প্রবাসী আয় সংগ্রহ। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্টে দেশের ব্যাংকিং খাতের মাধ্যমে মোট প্রবাসী আয় এসেছে ২৯৬ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার। এর মধ্যে প্রচলিত ব্যাংকগুলো সংগ্রহ করেছে ২৩৩ কোটি ৭০ লাখ ডলার। বিপরীতে ইসলামী ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে ৬৩ কোটি ডলার।
তবে আগের মাসের তুলনায় ইসলামী ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে প্রবাসী আয় বেড়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে এ মাধ্যমে প্রবাসী আয় এসেছিল ৫৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার। আগস্টে তা বেড়ে ৬৩ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। এতে মাসিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৬ দশমিক ০১ শতাংশ। ২০২৫ সালের আগস্টে ইসলামী ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে প্রবাসী আয় এসেছিল ৬১ কোটি ডলার। সে হিসাবে এক বছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ২৯ শতাংশ।
অন্যদিকে, প্রচলিত ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে প্রবাসী আয় ২০২৫ সালের আগস্টের ১৮১ কোটি ২০ লাখ ডলার থেকে বেড়ে ২০২৬ সালের আগস্টে ২৩৩ কোটি ৭০ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। এ ক্ষেত্রে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৯ দশমিক ০১ শতাংশ।
অর্থাৎ ইসলামী ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে প্রবাসী আয় বাড়লেও বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হিসাবে প্রচলিত ব্যাংকের তুলনায় তারা অনেক পিছিয়ে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রবাসী আয় সংগ্রহে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে গ্রাহকসেবা, অর্থ স্থানান্তরের সহজলভ্যতা, ডিজিটাল সুবিধা এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থা বাড়ানো জরুরি।
এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে প্রায় অর্ধেক আমানত ইসলামী ব্যাংকের
এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে তুলনামূলক শক্ত অবস্থানে রয়েছে ইসলামী ব্যাংকগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্টে দেশের ব্যাংকগুলোর এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ৫২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকগুলোর আমানত প্রায় ২৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা, যা মোট আমানতের ৪৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ।
তবে এ খাতেও বার্ষিক আমানত কমেছে। ২০২৫ সালের আগস্টে ইসলামী ব্যাংকগুলোর এজেন্ট ব্যাংকিং আমানত ছিল ২৬ হাজার কোটি টাকা। এক বছর পর তা কমে ২৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকায় নেমেছে। অর্থাৎ বার্ষিক হিসাবে আমানত কমেছে ২ দশমিক ৬৯ শতাংশ।
অন্যদিকে, প্রচলিত ব্যাংকগুলোর এজেন্ট ব্যাংকিং আমানত একই সময়ে ২১ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২৬ হাজার ৯০০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৮ দশমিক ১০ শতাংশ।
এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংকগুলোর উল্লেখযোগ্য অবস্থান রয়েছে। তবে এ অবস্থান ধরে রাখতে এজেন্ট নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, ডিজিটাল সেবার মানোন্নয়ন এবং গ্রাহকসেবা সহজ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
সম্পদ ও বিনিয়োগ বাড়লেও কমেছে জনবল
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্টে ইসলামী ব্যাংকগুলোর মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা। আগের মাসে এ সম্পদের পরিমাণ ছিল ৯ লাখ ৯৬ হাজার কোটি টাকা। এক মাসে সম্পদ বেড়েছে প্রায় শূন্য দশমিক ৯০ শতাংশ। ২০২৫ সালের আগস্টে মোট সম্পদ ছিল ৯ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরে সম্পদ বেড়েছে প্রায় ৬ দশমিক ৫৭ শতাংশ।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ২০২৫ সালের আগস্টে ইসলামী ব্যাংকগুলোর মোট বিনিয়োগ ছিল ৫ লাখ ৭১ হাজার ৫৩১ কোটি টাকা। ২০২৬ সালের আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ১২ হাজার ২৯৪ কোটি টাকায়। এক বছরে বিনিয়োগ বেড়েছে ৭ দশমিক ১৩ শতাংশ।
তবে সম্পদ ও বিনিয়োগ বাড়ার বিপরীতে জনবল কমেছে। ২০২৬ সালের আগস্টে ইসলামী ব্যাংকিং খাতে কর্মীর সংখ্যা ছিল ৪৪ হাজার ৭৮২ জন। আগের বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৪৭ হাজার ৬৪১। অর্থাৎ এক বছরে জনবল কমেছে প্রায় ৬ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে এ প্রবণতার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ডিজিটাল সেবা ও স্বয়ংক্রিয় কার্যক্রম বৃদ্ধি এবং ২০২৪ সালের জুলাইয়ের পর পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনায় অস্থিতিশীলতার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। তবে জনবল কমার পেছনে কোন কারণ কতটা ভূমিকা রেখেছে, তা নির্দিষ্টভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
আমানতের প্রবৃদ্ধি মাত্র ২ দশমিক ৭৮ শতাংশ
ইসলামী ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক চিত্রে আমানতের প্রবৃদ্ধিও উদ্বেগের বিষয়। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্টে ইসলামী ব্যাংকগুলোর আমানত আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৭৮ শতাংশ বেড়েছে। বিপরীতে মোট বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ দশমিক ১৩ শতাংশ।
আমানতের তুলনায় বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি বেশি হওয়ায় ব্যাংকগুলোর তারল্য ব্যবস্থাপনা ও আমানত সংগ্রহের সক্ষমতার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। যদিও শুধু এ দুই প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে কোনো ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না, তবু আমানত সংগ্রহের গতি, নগদ অর্থের প্রাপ্যতা এবং বিনিয়োগের গুণগত মান নিয়মিত পর্যবেক্ষণ জরুরি।
প্রতিবেদনে আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারি বাড়ানো, তারল্য সহায়তা দেওয়া, ব্যাংকগুলোর দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রয়োজনে প্রশাসক নিয়োগের মতো পদক্ষেপও ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিস্থিতি উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে বলে প্রতিবেদনে পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
আস্থা ফেরাতে প্রয়োজন কার্যকর সংস্কার
ইসলামী ব্যাংকিং খাতের সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। একদিকে আমানত ও বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা, অন্যদিকে গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। বিশেষ করে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর আমানত পরিস্থিতি, প্রবাসী আয় সংগ্রহে প্রবৃদ্ধির ব্যবধান এবং এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে আমানত কমে যাওয়ার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু তারল্য সহায়তা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। এর জন্য ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংকের আর্থিক দুর্বলতা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে হবে। পাশাপাশি আমানতকারীদের অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়ে আস্থা তৈরি এবং গ্রাহকসেবার মান উন্নয়নেও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে ইসলামী ব্যাংকিং খাতের প্রবৃদ্ধি ও দুর্বলতা—দুই দিকই উঠে এসেছে। সম্পদ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও আমানত সংগ্রহের সীমিত প্রবৃদ্ধি, প্রচলিত ব্যাংকের তুলনায় প্রবাসী আয় সংগ্রহে পিছিয়ে থাকা এবং জনবল হ্রাসের মতো বিষয়গুলো নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সুশাসন, আর্থিক সক্ষমতা, কার্যকর তদারকি ও আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার সমন্বিত উদ্যোগই পারে ইসলামী ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে।
নিউজ বাংলা চ্যানেল