ঢাকা | খ্রি.

মশার ডানায় ভর করে ছড়ায় রোগ, উৎস ধ্বংসেই নিয়ন্ত্রণের জোর

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 1, 2026 ইং | Photo Card
মশার ডানায় ভর করে ছড়ায় রোগ, উৎস ধ্বংসেই নিয়ন্ত্রণের জোর ছবির ক্যাপশন: ছবি সংগৃহীত
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক

কানের কাছে মশার ভোঁ ভোঁ শব্দ কমবেশি সবারই পরিচিত। অনেকের ধারণা, মশা মুখ দিয়ে এই শব্দ তৈরি করে। আসলে শব্দটির উৎস মশার ডানা। ডানা দ্রুত নাড়ানোর ফলে তৈরি হয় পরিচিত সেই ভোঁ ভোঁ আওয়াজ। আর ডানার ওপর ভর করেই মশা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছড়িয়ে পড়ে এবং নানা রোগের জীবাণু বহন করে।

মশার মধ্যে শুধু স্ত্রী মশাই মানুষের রক্ত পান করে—এমন ধারণা প্রচলিত থাকলেও বাস্তবে স্ত্রী মশা বিভিন্ন প্রাণীর রক্তও গ্রহণ করে। ডিম উৎপাদন ও পরিপক্বতার জন্য অনেক প্রজাতির স্ত্রী মশার রক্তের প্রয়োজন হয়। সেই প্রয়োজন মেটাতেই তারা মানুষের পাশাপাশি বিভিন্ন পশু-পাখির শরীরে আক্রমণ করে।

তবে সব মশার উড়ান ক্ষমতা এক নয়। কোনো কোনো প্রজাতি অল্প দূরত্বে বিচরণ করে, আবার কিছু প্রজাতি রক্তের সন্ধানে কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত উড়ে যেতে পারে। ফলে মশার প্রজননস্থল থেকে আশপাশের জনবসতিতে রোগবাহী মশার বিস্তার ঘটার ঝুঁকি তৈরি হয়।

বাংলাদেশের ম্যালেরিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রজাতিগুলোর মধ্যে অ্যানোফিলিস মিনিমাস উল্লেখযোগ্য। পাহাড়ি ও সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় এর উপস্থিতি রয়েছে। সাধারণভাবে এটি কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত বিচরণ করতে পারে। মানুষ বা উপযুক্ত প্রাণীর সন্ধানে আরও দূরে যাওয়ার সক্ষমতাও এই প্রজাতির ক্ষেত্রে দেখা যায়। এ মশার আচরণ ও কামড়ানোর সময় সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

দেশের সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চল, সুন্দরবন ও গোসাবাসহ বিভিন্ন এলাকায় অ্যানোফিলিস সান্ডাইকাস প্রজাতির উপস্থিতি রয়েছে। লবণাক্ত বা উপকূলীয় পরিবেশে টিকে থাকার সক্ষমতার কারণে এ মশার নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় পরিবেশ ও প্রজননস্থলকে গুরুত্ব দিতে হয়। শুধু ঘরের ভেতরে মশা ঠেকানোর ব্যবস্থা করলেই সবসময় এ ধরনের মশার বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

ঢাকাসহ দক্ষিণ এশিয়ার শহরাঞ্চলে ম্যালেরিয়ার অন্যতম বাহক অ্যানোফিলিস স্টিফেনসাই। নগর পরিবেশে এর উপস্থিতি ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে তা ধ্বংস করা এবং আক্রান্ত এলাকায় নিয়মিত নজরদারি চালানো তাই গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে কিউলেক্স কুইনকুইফ্যাসিয়েটাস সাধারণত নোংরা ও জমে থাকা পানিতে বংশবিস্তার করে। নালা-নর্দমা, ড্রেন, ডোবা, গ্যালিপিট ও অন্যান্য বদ্ধ জলাশয় এদের সম্ভাব্য প্রজননস্থল। ফাইলেরিয়াসহ বিভিন্ন রোগের সংক্রমণের সঙ্গে এই প্রজাতির সম্পর্ক রয়েছে। ফলে মশা নিয়ন্ত্রণে শুধু পূর্ণবয়স্ক মশা নিধনের বদলে প্রজননস্থল ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

অন্যদিকে এডিস ইজিপ্টাই অপেক্ষাকৃত কম দূরত্বে বিচরণ করলেও ঘনবসতিপূর্ণ শহরাঞ্চলে এটি অত্যন্ত কার্যকরভাবে মানুষের রক্তের উৎস খুঁজে পায়। ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো রোগের বিস্তারে এই মশার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বাড়ির আশপাশে জমে থাকা অল্প পরিমাণ পরিষ্কার পানিতেও এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে। ফলে শহরাঞ্চলে নিয়মিতভাবে জমে থাকা পানি অপসারণ করা মশা নিয়ন্ত্রণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার আরেক বাহক এডিস অ্যালবোপিকটাস। শহরতলি, গ্রামাঞ্চল ও গাছপালাপূর্ণ এলাকায় এ প্রজাতির বিস্তার বেশি দেখা যায়। এডিস ইজিপ্টাইয়ের তুলনায় এর বিচরণক্ষেত্র কিছুটা বেশি হওয়ায় প্রজননস্থলের আশপাশের এলাকাতেও এটি ছড়িয়ে পড়তে পারে।

মশার প্রজাতিভেদে উড়ার দূরত্ব, কামড়ানোর সময়, প্রজননস্থল ও পরিবেশগত পছন্দ ভিন্ন। তাই সব মশার জন্য একই ধরনের নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি কার্যকর হবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। কোনো এলাকায় ম্যালেরিয়া, কোথাও ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া, আবার কোথাও ফাইলেরিয়ার ঝুঁকি বেশি হতে পারে। সেক্ষেত্রে রোগ ও মশার প্রজাতি অনুযায়ী স্থানীয়ভাবে পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।

মশা নিয়ন্ত্রণে শুধু ধোঁয়া বা প্রাপ্তবয়স্ক মশা মারার ওপর নির্ভর না করে উৎসস্থল ধ্বংস, জমে থাকা পানি অপসারণ, নালা-নর্দমা পরিষ্কার, প্রজননস্থল চিহ্নিতকরণ এবং নিয়মিত নজরদারিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন। প্রয়োজন অনুযায়ী মশারি, রিপেলেন্ট ও অন্যান্য ব্যক্তিগত সুরক্ষা ব্যবস্থাও ব্যবহার করতে হয়।

মশা উড়ে বলেই এক এলাকার রোগবাহী পোকা অন্য এলাকায় পৌঁছাতে পারে। কিন্তু মশার বিস্তার ঠেকাতে কেবল ধোঁয়া সৃষ্টি বা দৃশ্যমান মশা নিধন যথেষ্ট নয়। কোথায় মশা জন্মাচ্ছে, কোন প্রজাতি সেখানে সক্রিয় এবং কোন রোগের ঝুঁকি তৈরি করছে—এসব তথ্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়াই কার্যকর মশক নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি।

দেশের সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি নাগরিকদেরও তাই মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল ধ্বংসে সক্রিয় হতে হবে। বাড়ি, অফিস, নির্মাণাধীন ভবন, ড্রেন ও আশপাশের জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করা গেলে মশার বংশবিস্তার অনেকটাই কমানো সম্ভব। মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে—মশা মারার চেয়ে মশার জন্ম ঠেকানো।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : নিউজ বাংলা চ্যানেল

কমেন্ট বক্স