ঢাকা | খ্রি.

ডিজিটাল অর্থনীতির ভবিষ্যৎ: ক্যাশলেস বাংলাদেশ গড়ার এখনই সময়

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 22, 2026 ইং | Photo Card
ডিজিটাল অর্থনীতির ভবিষ্যৎ: ক্যাশলেস বাংলাদেশ গড়ার এখনই সময় ছবির ক্যাপশন:
ad728
মো: মামুনার রশিদ : আমরা এমন একটি সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন প্রযুক্তি শুধু মানুষের জীবনযাত্রা বদলে দিচ্ছে না; বদলে দিচ্ছে অর্থনীতির কাঠামো, ব্যবসা পরিচালনার পদ্ধতি, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং সম্পদ লেনদেনের ধারণাও। একসময় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু ছিল নগদ অর্থ, কাগজের নথি, ব্যাংকের শাখা এবং সরাসরি উপস্থিতি। এখন একটি স্মার্টফোনের মাধ্যমে মানুষ অর্থ পাঠাচ্ছে, পণ্য কিনছে, বিল পরিশোধ করছে, ব্যবসা পরিচালনা করছে এবং পৃথিবীর অন্য প্রান্তে থাকা মানুষের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন করছে।

এই পরিবর্তনের নাম শুধু ডিজিটাল পেমেন্ট নয়। এটি একটি বৃহত্তর রূপান্তর—*ডিজিটাল অর্থনীতি (Digital Economy)।*

প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি এই রূপান্তরের একজন সাধারণ অংশগ্রহণকারী হয়ে থাকবে, নাকি নিজস্ব উদ্ভাবন, প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ ও শক্তিশালী আর্থিক অবকাঠামোর মাধ্যমে এই নতুন অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করবে?

আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশ চাইলে পারবে। তবে এর জন্য প্রয়োজন সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কার্যকর নীতিমালা এবং সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ।

## ১. পৃথিবীর অর্থনীতি কোন দিকে এগোচ্ছে?

ভবিষ্যতের অর্থনীতি ক্রমেই ডিজিটাল সংযোগ, তাৎক্ষণিক লেনদেন, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত, স্বয়ংক্রিয় সেবা এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসার দিকে এগোচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের Global Findex Database 2025 অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ৭৯ শতাংশের আর্থিক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। ২০২১ সালে এই হার ছিল ৭৪ শতাংশ। একই গবেষণায় দেখা যায়, বিশ্বব্যাপী প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ৮৬ শতাংশের কাছে মোবাইল ফোন রয়েছে। এই তথ্য দেখায়, ডিজিটাল আর্থিক সেবার বিস্তারের জন্য বিশ্বজুড়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে।

সূত্র: [World Bank — Global Findex Database 2025](https://www.worldbank.org/en/publication/globalfindex/report)

অন্যদিকে, GSMA-এর State of the Industry Report on Mobile Money 2026 অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী মোবাইল মানি সেবার মাধ্যমে ২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি লেনদেন হয়েছে। অর্থাৎ, মোবাইলভিত্তিক আর্থিক সেবা এখন আর কেবল ছোট অঙ্কের অর্থ পাঠানোর মাধ্যম নয়; এটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সূত্র: [GSMA — State of the Industry Report on Mobile Money 2026](https://www.gsma.com/solutions-and-impact/connectivity-for-good/mobile-for-development/gsma_resources/the-state-of-the-industry-report-on-mobile-money-2026/)

এই পরিসংখ্যান আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়: ডিজিটাল আর্থিক সেবা আর ভবিষ্যতের কোনো পরীক্ষামূলক ধারণা নয়। এটি ইতিমধ্যে বাস্তব অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তবে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে—বিশ্বের সব দেশ সম্পূর্ণ নগদবিহীন অর্থনীতিতে যাচ্ছে, এমন নয়। অনেক দেশ নগদ অর্থের ব্যবহার কমিয়ে নিরাপদ, সহজ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল লেনদেনের প্রসার ঘটাচ্ছে। বাংলাদেশের জন্যও বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি *Cash-Light, Digital-First Economy*—যেখানে নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা কমবে, কিন্তু যাঁদের ডিজিটাল সেবা ব্যবহারের সুযোগ নেই, তাঁরাও আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে পড়বেন না।

## ২. ডিজিটাল অর্থনীতি বলতে আমরা আসলে কী বুঝি?

অনেকে ডিজিটাল অর্থনীতিকে শুধু মোবাইল ব্যাংকিং, QR কোড কিংবা অনলাইন পেমেন্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেন। বাস্তবে এর পরিধি অনেক বড়।

ডিজিটাল অর্থনীতি হলো এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে প্রযুক্তি ও ডিজিটাল অবকাঠামোর মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা, সেবা প্রদান, তথ্য বিনিময়, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং মূল্য সৃষ্টি করা হয়।

এর মধ্যে রয়েছে:

- ডিজিটাল ব্যাংকিং ও তাৎক্ষণিক অর্থ স্থানান্তর
- মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ও ডিজিটাল ওয়ালেট
- QR কোড ও কার্ডভিত্তিক পেমেন্ট
- ই-কমার্স ও ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস
- অনলাইন ব্যবসা, ফ্রিল্যান্সিং ও আন্তর্জাতিক সেবা রপ্তানি
- ডিজিটাল পরিচয় ও ইলেকট্রনিক ডকুমেন্ট
- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক আর্থিক সেবা
- ডিজিটাল ঋণ, সঞ্চয় ও বীমা
- সরকারি ফি, ভাতা, কর ও অন্যান্য অর্থপ্রদানের ডিজিটাল ব্যবস্থা
- ডিজিটাল হিসাবরক্ষণ, সরবরাহব্যবস্থা ও ব্যবসায়িক ব্যবস্থাপনা

অর্থাৎ, একজন কৃষক ফসল বিক্রির অর্থ সরাসরি ডিজিটাল মাধ্যমে গ্রহণ করলে, একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী QR কোডে পেমেন্ট নিলে, একজন ফ্রিল্যান্সার আন্তর্জাতিক গ্রাহকের কাছ থেকে বৈধ ডিজিটাল চ্যানেলে অর্থ পেলে এবং একজন নাগরিক ঘরে বসে সরকারি ফি পরিশোধ করলে—সব ক্ষেত্রেই ডিজিটাল অর্থনীতি শক্তিশালী হয়।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রযুক্তি শুধু অর্থ স্থানান্তর করবে না; এটি মানুষের সময় বাঁচাবে, ব্যবসার ব্যয় কমাতে সাহায্য করবে এবং নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করবে।

## ৩. বাংলাদেশের সামনে কেন এত বড় সুযোগ?

বাংলাদেশের সামনে একটি বিশেষ সুযোগ রয়েছে। আমাদের বিশাল জনগোষ্ঠী, তরুণ প্রজন্ম, মোবাইলভিত্তিক আর্থিক সেবার অভিজ্ঞতা, উদ্যোক্তা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা এবং ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল ব্যবসার চাহিদাকে একত্রিত করা গেলে একটি শক্তিশালী ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব।

বাংলাদেশের মানুষ ইতিমধ্যে মোবাইলভিত্তিক আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে পরিচিত। ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, পেমেন্ট সেবা, ই-কমার্স কোম্পানি এবং প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তারা বিভিন্নভাবে এই খাতকে এগিয়ে নিচ্ছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের Bangladesh Payment Systems Report 2025 দেশের পেমেন্ট অবকাঠামো, ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার, রিয়েল-টাইম সেটেলমেন্ট, জাতীয় পেমেন্ট সুইচ, আন্তঃসংযুক্ত ডিজিটাল লেনদেন এবং ক্যাশলেস অর্থনীতির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছে।
লেখক : ব্যবস্থাপনা পরিচালক -অ্যালাইন গ্লোবাল লি.

নিউজটি পোস্ট করেছেন : নিউজ বাংলা চ্যানেল

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
অরুণাচলে আকস্মিক বন্যায় ৫ সেনাসদস্য নিখোঁজ

অরুণাচলে আকস্মিক বন্যায় ৫ সেনাসদস্য নিখোঁজ