ঢাকা | খ্রি.

সম্পত্তি বাজেয়াপ্তে নতুন বিধি, ক্ষতিপূরণ পাবে শহীদ পরিবার

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Sep 8, 2026 ইং | Photo Card
সম্পত্তি বাজেয়াপ্তে নতুন বিধি, ক্ষতিপূরণ পাবে শহীদ পরিবার ছবির ক্যাপশন: ছবি সংগৃহীত
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত, নিলাম বা বিক্রি এবং সেখান থেকে প্রাপ্ত অর্থ ভুক্তভোগী ও শহীদ পরিবারগুলোর মধ্যে ক্ষতিপূরণ হিসেবে বণ্টনের প্রক্রিয়া স্পষ্ট করতে ‘রুলস অব প্রসিডিউর’ সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশোধিত বিধি চূড়ান্ত হওয়ার পর তা ‘রেট্রোস্পেক্টিভ ইফেক্ট’ বা পূর্ববর্তী সময় থেকে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত রয়েছে। ফলে এর আগে ট্রাইব্যুনালের রায়ে সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ পাওয়া আসামিদের ক্ষেত্রেও সংশোধিত বিধি প্রয়োগের সুযোগ তৈরি হবে।

সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ তথ্য জানান চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন এবং বিদ্যমান কার্যপ্রণালী বিধিতে আসামির সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত বা জরিমানা এবং ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণের মৌলিক বিধান রয়েছে। তবে বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি কোন সরকারি বা প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে জব্দ, নিলাম কিংবা বিক্রি করা হবে—সে বিষয়ে বিস্তারিত কর্মপদ্ধতি স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। এ কারণে রায় বাস্তবায়নের পর্যায়ে একটি আইনি শূন্যতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রসিকিউশন সূত্র জানায়, ট্রাইব্যুনাল-২-এর একটি মামলার শুনানিতে বিষয়টি আদালতের নজরে আনা হয়। প্রচলিত ‘পাবলিক ডিমান্ড রিকভারি অ্যাক্ট’ এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৮৬ ধারায় জরিমানা আদায় ও সম্পত্তি বিক্রির যে প্রক্রিয়া রয়েছে, প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এনে সেই আদলের একটি কার্যকর কাঠামো ট্রাইব্যুনালের বিধিতে যুক্ত করার চিন্তা করা হচ্ছে। আইনগতভাবে একে ‘মিউটেটিস মিউটেন্ডিস’ নীতিতে প্রয়োগের কথা বিবেচনা করা হচ্ছে।

এতে ট্রাইব্যুনালের রায় কার্যকর করার সময় সরকারের নির্বাহী বিভাগ কোন পদ্ধতিতে সম্পত্তি শনাক্ত, বাজেয়াপ্ত, নিলাম ও বিক্রি করবে, সে বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট আইনি ভিত্তি পাওয়া যাবে।

এদিকে কার্যপ্রণালী বিধি সংশোধনের রূপরেখা তৈরিতে দুই ট্রাইব্যুনালের বিচারপতি ও আইনজীবীদের সমন্বয়ে একটি আইনি সেমিনার আয়োজনের কথাও ভাবা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতামত নিয়ে সংশোধনের প্রয়োজনীয় দিকগুলো চূড়ান্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

শেখ হাসিনার কোন সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আওতায়

জুলাই হত্যাকাণ্ডের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ রয়েছে। এ আদেশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তার নিজের নামে থাকা সম্পত্তির কোনগুলো বাজেয়াপ্তের আওতায় পড়বে, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।

২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জমা দেওয়া হলফনামায় শেখ হাসিনা নিজের নামে প্রায় ৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের হিসাব দেখিয়েছিলেন। এর মধ্যে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে থাকা অর্থ, সঞ্চয়পত্র, এফডিআর, যানবাহন, স্বর্ণালঙ্কার, আসবাবপত্র এবং বিভিন্ন স্থানে থাকা জমি রয়েছে।

হলফনামা অনুযায়ী, ব্যাংক ও বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তার প্রায় ২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা, ২৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র এবং ৫৫ লাখ টাকার স্থায়ী আমানত রয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ৪৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা মূল্যের দুটি মোটরগাড়ি, ১৩ লাখ ২৫ হাজার টাকার স্বর্ণালঙ্কার এবং ৭ লাখ ৪০ হাজার টাকা মূল্যের আসবাবপত্রের তথ্যও দেওয়া হয়েছিল।

স্থাবর সম্পদের মধ্যে গোপালগঞ্জ সদর, টুঙ্গিপাড়া, গাজীপুর ও রংপুরে থাকা মোট ১৫ দশমিক ৩ বিঘা কৃষিজমি, পূর্বাচলে নিজের নামে থাকা ১০ কাঠার প্লট এবং টুঙ্গিপাড়ায় তিনতলা ভবনসহ ৬ দশমিক ১০ শতক জমির তথ্য রয়েছে।

তবে হলফনামায় ঘোষিত সম্পদের বাইরেও তদন্তে অতিরিক্ত সম্পত্তির তথ্য পাওয়া গেলে সেগুলোও আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় আসতে পারে। ২০০৮ সালের নির্বাচনের সময় সম্পদ বিবরণীতে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে পরবর্তী অনুসন্ধানে পাওয়া সম্পদের পার্থক্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। তদন্তে কোনো সম্পত্তি গোপন করা বা অপরাধলব্ধ অর্থে অর্জনের প্রমাণ মিললে আদালতের আদেশ অনুযায়ী সেসব সম্পদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকবে।

পরিবারের অন্যদের সম্পত্তি নিয়ে আইনি সীমা

তবে শেখ হাসিনার নামে থাকা সম্পত্তি এবং তার পরিবারের অন্য সদস্যদের নামে থাকা সম্পত্তির ক্ষেত্রে আইনগত অবস্থান এক নয়। কোনো ব্যক্তির অপরাধের দায়ে অন্য প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যের নিজস্ব সম্পত্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাজেয়াপ্ত করার সুযোগ নেই।

ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িটি শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত নামে নয়; এটি শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টের সম্পত্তি। ফলে শুধু শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দেওয়া রায়ের ভিত্তিতে ট্রাস্টের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা যাবে কি না, তা পৃথক আইনি প্রশ্নের বিষয়।

একইভাবে ধানমন্ডির ‘সুধা সদন’ এবং গাজীপুরের বাগানবাড়ির মালিকানার ক্ষেত্রেও অন্য সদস্যদের নাম রয়েছে। এসব সম্পত্তি শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত মালিকানাধীন না হলে শুধু তার দণ্ডের কারণে তা বাজেয়াপ্ত করা যাবে না।

পূর্বাচলে শেখ হাসিনা, তার সন্তান ও পরিবারের অন্য সদস্যদের নামে বরাদ্দ নেওয়া ৬০ কাঠা জমি নিয়েও দুর্নীতির অভিযোগে মামলা চলমান রয়েছে। এসব সম্পত্তির ক্ষেত্রে আদালতের পৃথক সিদ্ধান্ত এবং মালিকানা ও অর্থের উৎসের প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো সম্পত্তি অন্য ব্যক্তির নামে থাকলেও তদন্তে যদি প্রমাণ হয় যে সেটি দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির অপরাধলব্ধ অর্থে কেনা হয়েছে বা প্রকৃত মালিকানা গোপন করে অন্যের নামে রাখা হয়েছে, তাহলে সংশ্লিষ্ট আদালতের আদেশের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।

সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও তা থেকে ক্ষতিপূরণের অর্থ বিতরণের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়ন কাঠামো তৈরি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কার্যপ্রণালী বিধি সংশোধন চূড়ান্ত হলে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির সম্পত্তি শনাক্তকরণ, বাজেয়াপ্ত, নিলাম বা বিক্রি এবং সেই অর্থ ভুক্তভোগী ও শহীদ পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতা অনেকটাই কমবে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : নিউজ বাংলা চ্যানেল

কমেন্ট বক্স
গাজায় ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার ১১২ মরদেহ, হাজারো মানুষের অংশগ্

গাজায় ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার ১১২ মরদেহ, হাজারো মানুষের অংশগ্