ঢাকা | খ্রি.

কক্ষপথে স্টারশিপের সফল যাত্রা, ২৬ স্টারলিংক ভি৩ উপগ্রহ পাঠাল স্পেসএক্স

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Sep 29, 2026 ইং | Photo Card
কক্ষপথে স্টারশিপের সফল যাত্রা, ২৬ স্টারলিংক ভি৩ উপগ্রহ পাঠাল স্পেসএক্স ছবির ক্যাপশন: ছবি সংগৃহীত
ad728
নিউজ বাংলা ডেস্ক : মহাকাশ গবেষণায় নতুন সাফল্য পেয়েছে স্পেসএক্স। সোমবার প্রতিষ্ঠানটির স্টারশিপ মহাকাশযান সফলভাবে কক্ষপথে পৌঁছানোর পাশাপাশি ২৬টি নতুন প্রজন্মের স্টারলিংক ভি৩ উপগ্রহ সেখানে পাঠিয়েছে।

ভারতীয় সংবাদসংস্থা এএনআই নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উৎক্ষেপণের পর স্টারশিপের যাত্রায় সাময়িক উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। ওপরে ওঠার সময় মহাকাশযানটির ছয়টি র‍্যাপ্টর ভ্যাকুয়াম ইঞ্জিনের একটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে প্রকৌশলীরা অন্য ইঞ্জিনগুলো পরীক্ষা করেন। সেগুলো স্বাভাবিকভাবে কাজ করায় নির্ধারিত মিশন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

স্টারশিপের এবারের যাত্রা প্রায় ১০ ঘণ্টা স্থায়ী হওয়ার কথা। এই সময়ের মধ্যে মহাকাশযানটি পৃথিবীকে ছয়বার প্রদক্ষিণ করবে। এরপর চিলির পশ্চিমে প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণের পরিকল্পনা রয়েছে।

মিশনটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য ছিল ২৬টি স্টারলিংক ভি৩ উপগ্রহকে কক্ষপথে স্থাপন করা। স্পেসএক্সের পরবর্তী প্রজন্মের ইন্টারনেট উপগ্রহ হিসেবে ভি৩ তৈরি করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এগুলো চালু হলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ইন্টারনেটের গতি ও সংযোগের নির্ভরযোগ্যতা বাড়বে।

স্টারলিংকের তথ্য অনুযায়ী, ভি৩ উপগ্রহগুলো আগের প্রজন্মের তুলনায় অনেক বেশি তথ্য আদান-প্রদান করতে পারবে। প্রতিটি উপগ্রহ প্রতি সেকেন্ডে সর্বোচ্চ ১ টেরাবিট তথ্য ডাউনলোড এবং ১৬০ গিগাবিট তথ্য আপলোড করতে সক্ষম হবে। ভি২-এর তুলনায় ডাউনলোড সক্ষমতা প্রায় ১০ গুণ এবং আপলোড সক্ষমতা ২২ গুণ বেশি বলে জানিয়েছে স্পেসএক্স।

স্টারশিপ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর ভি৩ উপগ্রহগুলো ধাপে ধাপে নিজেদের বিভিন্ন ব্যবস্থা সক্রিয় করবে। প্রথমে অ্যান্টেনা ও সৌর প্যানেল খোলা হবে। এরপর বেতার তরঙ্গ ও লেজার যোগাযোগের মাধ্যমে পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র এবং স্টারলিংক নেটওয়ার্কের অন্য উপগ্রহগুলোর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করবে। পরে নিজস্ব থ্রাস্টার ব্যবহার করে নির্ধারিত কক্ষপথে পৌঁছানোর প্রক্রিয়া শুরু করবে।

ভি৩ উপগ্রহের অ্যান্টেনাগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে একই সময়ে বেশি তথ্য পরিবহন এবং বেশি সংখ্যক যোগাযোগ বিম ব্যবহারের সুযোগ থাকে। স্পেসএক্সের নতুন প্রজন্মের বিমফর্মার চিপ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এসব চিপের সাহায্যে বিভিন্ন যোগাযোগ বিমের মধ্যে দ্রুত ও নির্ভুলভাবে তথ্য আদান-প্রদান করা সম্ভব হবে। প্রতিটি মডেমেও আগের তুলনায় ৬৪ গুণ বেশি তথ্যপ্রবাহ পরিচালনার সক্ষমতা রাখা হয়েছে।

এর ফলে ঘনবসতিপূর্ণ শহর থেকে শুরু করে কম জনবসতিপূর্ণ এলাকাতেও একই সময়ে বেশি গ্রাহককে সেবা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী রিয়েল টাইমে যোগাযোগ বিমে তথ্যের ঘনত্ব পরিবর্তন করাও সম্ভব হবে।

স্টারলিংক নেটওয়ার্কে দ্রুত তথ্য পরিবহনের জন্য প্রতিটি ভি৩ উপগ্রহে ছয়টি উচ্চক্ষমতার ৪০০ গিগাবিট মহাকাশ লেজার রয়েছে। এগুলোর মাধ্যমে বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দ্রুত তথ্য পাঠানো যাবে। একই সঙ্গে নেটওয়ার্কে একাধিক বিকল্প পথ থাকায় কোনো একটি পথে সমস্যা দেখা দিলেও তথ্য আদান-প্রদান অব্যাহত রাখার সুযোগ থাকবে।

প্রতিটি ভি৩ উপগ্রহে রয়েছে চারটি চার-ব্যান্ডের বেতার যোগাযোগ অ্যান্টেনা। এগুলো কে-এ, ই, ভি ও ডব্লিউ—এই চারটি যোগাযোগ ব্যান্ডে কাজ করতে পারবে। স্টারলিংকের হিসাবে, এর ফলে বেতার যোগাযোগের মাধ্যমে তথ্য পরিবহনের সক্ষমতা ১ দশমিক ২ টেরাবিটে পৌঁছাবে, যা ভি২-এর তুলনায় আট গুণেরও বেশি।

নতুন অ্যান্টেনাগুলো বিভিন্ন কম্পাঙ্ক ও মেরুকরণ ব্যবহার করে সর্বোচ্চ ৬০ গিগাহার্টজ পর্যন্ত বর্ণালি কাজে লাগাতে পারবে। ভি২-এর তুলনায় এই সক্ষমতা ৪ দশমিক ৩ গুণ বেশি।

কক্ষপথে পৌঁছানোর পর উপগ্রহগুলোর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা সম্পন্ন করা হবে। সব পরীক্ষা সফল হলে সোমবার পাঠানো উপগ্রহগুলো কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই গ্রাহকদের ইন্টারনেট সেবা দেওয়া শুরু করতে পারে।

এ ছাড়া উৎক্ষেপণ করা ভি৩ উপগ্রহগুলোর তিনটিতে বিশেষ ক্যামেরা রয়েছে। স্টারশিপের তাপরোধী আবরণের কার্যকারিতা পরীক্ষা করাই এসব ক্যামেরার অন্যতম উদ্দেশ্য। ক্যামেরায় ধারণ করা ছবি পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে পাঠানো হবে। সেই ছবি বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতে উৎক্ষেপণস্থলে ফিরে আসার সময় স্টারশিপের তাপরোধী আবরণ কতটা কার্যকর থাকবে, তা মূল্যায়ন করা হবে।

স্টারশিপকে এখন পর্যন্ত তৈরি সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী রকেট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর উচ্চতা ৪০৭ ফুট। মহাকাশযানটির দুটি প্রধান অংশ রয়েছে—নিচে সুপার হেভি বুস্টার এবং ওপরে শিপ বা মূল মহাকাশযান। স্পেসএক্স দুটি অংশকেই পুরোপুরি পুনর্ব্যবহারযোগ্য করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে।

একই রকেট ও মহাকাশযান বারবার ব্যবহারের এই পরিকল্পনাকে মহাকাশযান তৈরির ক্ষেত্রে নিজেদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে দেখছে স্পেসএক্স।

তবে স্টারশিপের দীর্ঘমেয়াদি উদ্দেশ্য শুধু পৃথিবীর কক্ষপথে উপগ্রহ পাঠানো নয়। দীর্ঘ সময়ের মহাকাশযাত্রায় মানুষকে নিয়ে যাওয়ার জন্যও এটি তৈরি করা হচ্ছে। স্পেসএক্সের পরিকল্পনায় প্রথমে চাঁদ এবং পরে মঙ্গলে মানুষ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পাঠানোর কথা রয়েছে। চাঁদে দীর্ঘমেয়াদি ঘাঁটি স্থাপনের পাশাপাশি ভবিষ্যতে মঙ্গলে মানুষের স্থায়ী বসতি গড়ে তোলার লক্ষ্যও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।

স্পেসএক্সের ভাষ্য, ভবিষ্যতে মানুষ এমন সব স্থানে যাবে যেখানে এর আগে কোনো মানুষ পৌঁছায়নি। প্রতিষ্ঠানটি এই লক্ষ্যকে মহাকাশ অনুসন্ধানের নতুন যুগের সঙ্গে যুক্ত করছে।

মঙ্গলে স্বনির্ভর শহর গড়ে তুলতে বিপুলসংখ্যক মানুষ ও সরঞ্জাম পাঠাতে হবে বলে মনে করছে স্পেসএক্স। প্রতিষ্ঠানটির হিসাব অনুযায়ী, সেখানে এমন একটি শহর গড়ে তুলতে ১০ লাখের বেশি মানুষ এবং লাখ লাখ টন পণ্য পাঠানোর প্রয়োজন হতে পারে।

পৃথিবী ও মঙ্গলের মধ্যে যাত্রার সুযোগ প্রায় ২৬ মাস পরপর তৈরি হয়। এসব সময়কে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে প্রতিদিন ১০টির বেশি স্টারশিপ উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা রয়েছে স্পেসএক্সের। দীর্ঘমেয়াদে কয়েক হাজার স্টারশিপের মাধ্যমে মানুষ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম মঙ্গলে পাঠানোর লক্ষ্যও রয়েছে। এর মাধ্যমে অন্য একটি গ্রহে দীর্ঘস্থায়ী মানব উপস্থিতি তৈরির পরিকল্পনা করছে প্রতিষ্ঠানটি।

মঙ্গলে মানুষের যাত্রার ক্ষেত্রে স্টারশিপকে বড় ধরনের প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। স্পেসএক্সের পরিকল্পনা অনুযায়ী, মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় মহাকাশযানটির গতি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৭ দশমিক ৫ কিলোমিটার হতে পারে। বায়ুর ঘর্ষণে তখন এর গতি কমতে থাকবে এবং তীব্র তাপ তৈরি হবে।

এই তাপ থেকে স্টারশিপকে সুরক্ষিত রাখতে বিশেষ তাপরোধী আবরণ ব্যবহার করা হয়েছে। তবে মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের পরিবেশ পৃথিবীর তুলনায় ভিন্ন হওয়ায় সেখানে বাড়তি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে মহাকাশযানটিকে। স্পেসএক্স জানিয়েছে, মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলে তুলনামূলক বেশি মাত্রায় পারমাণবিক অক্সিজেনের উপস্থিতি তাপরোধী আবরণের জন্য অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

স্পেসএক্সের আশা, ২০২৮ সালের দিকে মঙ্গলের পৃষ্ঠে পণ্যবাহী স্টারশিপ পাঠানোর কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হতে পারে।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : নিউজ বাংলা চ্যানেল

কমেন্ট বক্স
নীরব ঘাতক কোলেস্টেরল: কারণ, ঝুঁকি ও প্রতিরোধ

নীরব ঘাতক কোলেস্টেরল: কারণ, ঝুঁকি ও প্রতিরোধ