ঢাকা | খ্রি.

তৃতীয় টার্মিনালে বদলে যাবে ঢাকার বিমানবন্দর

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Sep 19, 2026 ইং | Photo Card
তৃতীয় টার্মিনালে বদলে যাবে ঢাকার বিমানবন্দর ছবির ক্যাপশন: ছবি সংগৃহীত
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক

সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে আংশিকভাবে চালু হতে যাচ্ছে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নবনির্মিত তৃতীয় টার্মিনাল। বিশাল এই অবকাঠামো চালুর মধ্য দিয়ে দেশের এভিয়েশন খাতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহর সম্প্রসারণ, নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালু, কার্গো পরিবহন বৃদ্ধি এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পথও খুলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তৃতীয় টার্মিনাল চালুর প্রস্তুতির পাশাপাশি বিমানের বহর আধুনিকায়নেও এগোচ্ছে সরকার। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং থেকে আরও ১১টি উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে চুক্তির সম্ভাবনার কথা জানা গেছে। পাশাপাশি এয়ারবাসের কাছ থেকেও ১০টি উড়োজাহাজ কেনার প্রস্তুতি চলছে। সব মিলিয়ে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বিমানের বহরে ২১টি নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত করার প্রক্রিয়া এগোচ্ছে।

এদিকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে আগামী ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২৪ সেপ্টেম্বর অধিবেশনে তাঁর ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে। সফর শেষে ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে তাঁর দেশে ফেরার কথা রয়েছে। নিউইয়র্কে অবস্থানকালে বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের প্রস্তুতিও চলছে।

কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। এর আগে গত ৩১ আগস্ট পাঠানো এক চিঠিতে ট্রাম্প বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। একই সময়ে বোয়িংয়ের কাছ থেকে নতুন উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।

২১ নতুন উড়োজাহাজের প্রস্তুতি

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বর্তমান বহরে ১৯টি উড়োজাহাজ রয়েছে। নতুন ২১টি উড়োজাহাজ যুক্ত হলে বহরের আকার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর ফলে পুরোনো উড়োজাহাজ প্রতিস্থাপনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণ, নতুন গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা এবং পরিচালন ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া ও উত্তর আমেরিকায় নতুন গন্তব্য চালুর পরিকল্পনাও এতে সহজ হতে পারে।

নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত করার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বোয়িংয়ের সঙ্গে আরও ১১টি উড়োজাহাজ কেনার আলোচনা এগিয়েছে। অন্যদিকে এয়ারবাসের সঙ্গে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে আগামী মাসে চুক্তির প্রস্তুতি রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

তৃতীয় টার্মিনালে বাড়বে যাত্রীসেবা

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে যাত্রী ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। বর্তমানে টার্মিনাল-১ ও টার্মিনাল-২ দিয়ে বছরে প্রায় ৮০ লাখ যাত্রী সেবার সক্ষমতা থাকলেও বাস্তবে এর চেয়ে অনেক বেশি যাত্রী এসব টার্মিনাল ব্যবহার করছেন। তৃতীয় টার্মিনাল যুক্ত হলে অতিরিক্ত প্রায় এক কোটি ২০ লাখ যাত্রী ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা তৈরি হবে বলে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

বেবিচকের সদস্য (এটিএম) এয়ার কমডোর মো. নূর-ই-আলম জানিয়েছেন, বর্তমানে প্রতি ঘণ্টায় গড়ে ২০ থেকে ২২টি ফ্লাইট পরিচালনার সক্ষমতা রয়েছে। তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হাইস্পিড ট্যাক্সিওয়ের কারণে রানওয়ের অকুপেন্সি টাইম কমেছে। ভবিষ্যতে প্রতি ঘণ্টায় ২৪ থেকে ২৬টি ফ্লাইট পরিচালনার সক্ষমতা অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগাতে রানওয়ে ব্যবস্থাপনা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। শাহজালাল বিমানবন্দর চারদিক থেকে আবাসিক এলাকা দিয়ে ঘেরা হওয়ায় দ্বিতীয় রানওয়ে নির্মাণের ক্ষেত্রে জায়গার সংকট রয়েছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে ঢাকার বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কার্গো সক্ষমতাও বাড়বে

তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে শুধু যাত্রী ব্যবস্থাপনাই নয়, কার্গো পরিবহনেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। বর্তমানে আমদানি কার্গো ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা ৮৪ হাজার টন। নতুন অবকাঠামো যুক্ত হলে তা প্রায় তিন লাখ ৫৭ হাজার টনে উন্নীত হওয়ার কথা। রপ্তানি কার্গো ব্যবস্থাপনার সক্ষমতাও বেড়ে প্রায় সাত লাখ ৪৭ হাজার টনে উন্নীত হবে।

ফলে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন রপ্তানি পণ্য দ্রুত আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানোর সুযোগ বাড়বে। ব্যবসায়ীদের মতে, এয়ার কার্গো ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়ানো গেলে সময় ও পরিবহন ব্যয় কমিয়ে দেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরও বাড়ানো সম্ভব হবে।

বাড়বে চেক-ইন ও পাসপোর্ট কাউন্টার

তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে যাত্রীসেবার অবকাঠামোগত সক্ষমতাও কয়েক গুণ বাড়বে। বর্তমানে বিমানবন্দরে ৬২টি চেক-ইন কাউন্টার রয়েছে। নতুন টার্মিনাল চালু হলে এ সংখ্যা বেড়ে ১৮৯টিতে দাঁড়াবে। পাসপোর্ট নিয়ন্ত্রণ কাউন্টারও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। ভবিষ্যতে বোর্ডিং গেটের সংখ্যা ৩৪টিতে উন্নীত করার সুযোগ থাকবে।

কার পার্কিং সুবিধাও বাড়বে। বর্তমানে প্রায় ৮০০টি গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা থাকলেও তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে তা প্রায় দুই হাজার ৩০টি গাড়িতে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

দ্বিতীয় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার নিয়ে আগ্রহ

তৃতীয় টার্মিনালের যাত্রী হ্যান্ডলিং কার্যক্রমে দ্বিতীয় অপারেটর হিসেবে কাজ করতে একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আগ্রহ প্রকাশ করেছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক মেনজিস এভিয়েশন তাদের মধ্যে অন্যতম। প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের শত শত বিমানবন্দরে এভিয়েশন সেবা দিয়ে থাকে।

মেনজিস জানিয়েছে, ঢাকার তৃতীয় টার্মিনালে কাজের সুযোগ পেলে প্রথম বছরেই প্রায় এক কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে সরাসরি এক হাজারের বেশি কর্মসংস্থান এবং সরবরাহ শৃঙ্খল ও স্থানীয় অর্থনীতিতে কয়েক হাজার পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

একই কাজে আগ্রহ দেখিয়েছে তুরস্কের চেলেবি, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডনাটা, সুইজারল্যান্ডভিত্তিক সুইসপোর্টসহ আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। মেনজিস ঢাকায় একটি প্রশিক্ষণ একাডেমি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে। সেখানে আন্তর্জাতিক মানের এভিয়েশন প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বাংলাদেশি তরুণদের দীর্ঘমেয়াদি কর্মজীবনের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।

জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে চুক্তি এখনো হয়নি

তৃতীয় টার্মিনালের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে সরকারের চূড়ান্ত চুক্তি এখনো সম্পন্ন হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, যেকোনো সময় এ চুক্তি হতে পারে।

চুক্তি সম্পন্ন হলে জাপান এয়ারপোর্ট টার্মিনাল কোম্পানি, সুমিতোমো করপোরেশন, নিপ্পন কোয়েই ও নারিতা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট করপোরেশনের সমন্বয়ে গঠিত কনসোর্টিয়ামটি তৃতীয় টার্মিনালের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেবে।

বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতও তৃতীয় টার্মিনাল চালুর প্রস্তুতির পাশাপাশি জাপানি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনের উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন।

বদলে যেতে পারে দেশের এভিয়েশন চিত্র

বিশেষজ্ঞদের মতে, তৃতীয় টার্মিনাল শুধু ঢাকার বিমানবন্দরের সক্ষমতা বাড়াবে না; এটি দেশের এভিয়েশন খাতের সামগ্রিক চিত্রও বদলে দিতে পারে। উন্নত ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা, দ্রুত ব্যাগ হ্যান্ডলিং, আধুনিক যাত্রীসেবা এবং বড় পরিসরের কার্গো সুবিধা চালু হলে আন্তর্জাতিক যাত্রী ও এয়ারলাইন্সগুলোর কাছে ঢাকার আকর্ষণ বাড়তে পারে।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের সংযোগস্থলে হওয়ায় আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। এ জন্য বিমানবন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল, দ্রুত গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং এবং আন্তর্জাতিক মানের সেবা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আর্থিক খাতের বিশ্লেষক প্রফেসর আবু আহমেদ বলেন, তৃতীয় টার্মিনাল চালু এবং বিমানের বহরে নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হলে ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজস্ব আয়, কর্মসংস্থান ও পর্যটন খাতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাঁর মতে, টার্মিনালের পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের বিষয়গুলো দ্রুত চূড়ান্ত করা প্রয়োজন।

নিউইয়র্ক রুট চালুর সম্ভাবনা

নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হওয়ার ফলে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত ঢাকা-নিউইয়র্ক সরাসরি ফ্লাইট চালুর প্রক্রিয়াও গতি পেতে পারে। সরকার আগামী বছর এ রুট চালুর লক্ষ্যে কাজ করছে বলে বিমানমন্ত্রী জানিয়েছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরাসরি নিউইয়র্ক ফ্লাইট চালু হলে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বাংলাদেশি, ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের যাতায়াতে সময় কমবে। একই সঙ্গে বিদেশি এয়ারলাইন্সের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমিয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের নিজস্ব যাত্রী পরিবহন সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

সব মিলিয়ে তৃতীয় টার্মিনাল, নতুন উড়োজাহাজ, আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণ এবং কার্গো সক্ষমতা বৃদ্ধির সমন্বিত উদ্যোগ বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তব অর্থনৈতিক সুফলে রূপ দিতে দ্রুত পরিচালন চুক্তি, দক্ষ জনবল, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, রানওয়ে সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক মানের সেবা নিশ্চিত করাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : নিউজ বাংলা চ্যানেল

কমেন্ট বক্স
বিশ্বকাপের ম্যাচ ভারত থেকে শ্রীলংকায় সরিয়ে নিতে উপদেষ্টার নি

বিশ্বকাপের ম্যাচ ভারত থেকে শ্রীলংকায় সরিয়ে নিতে উপদেষ্টার নি