সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত কয়েক মাসে সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান, স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধান ও কূপের ওয়ার্কওভার শুরু, নতুন রিগ কেনার উদ্যোগ এবং জ্বালানি তেলের মজুদ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মাতারবাড়ীতে তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের প্রাথমিক কাজও শুরু হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় বিশ্ববাজার থেকে দেশে জ্বালানি পরিবহনে সাময়িক সমস্যায় পড়তে হয়। তখন দেশের জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে। তবে গ্যাস ও কয়লার সংকটের প্রভাব জুলাই থেকে লোডশেডিংয়ে পড়তে শুরু করেছে।
বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘সংকট মোকাবেলায় আমরা ১৮০ দিনের একটি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। এই কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে দেখতে হবে- আমরা এ ব্যাপারে প্রো অ্যাকটিভ কি না। বিশেষ করে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে আমাদের যে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছে সেটি ছিল চ্যালেঞ্জিং।’
মন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য হলো জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত করা, গ্যাসের সিস্টেম লস ৬ দশমিক ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনা, তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য মডেল পিএসসি ২০২৬ চূড়ান্ত করা এবং কয়লা উত্তোলনে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া। তিনি বলেন, আর্থিক সংকট, অনিয়ম ও দুর্নীতিসহ বিভিন্ন কারণে বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাত এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
গ্যাস অনুসন্ধানে তৎপরতা
কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী পেট্রোবাংলা, বাপেক্স ও জ্বালানি বিভাগের তত্ত্বাবধানে দৈনিক প্রায় ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে পরিত্যক্ত কূপগুলো থেকে গ্যাস উৎপাদনের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। পাশাপাশি সাতটি অনুসন্ধান কূপ, সাতটি উন্নয়ন কূপ এবং দুটি কূপের ওয়ার্কওভারের জন্য প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।
সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ঠিকাদার নিয়োগে দরপত্র আহ্বানের পাশাপাশি স্থলভাগে ইজারা দেওয়ার জন্য মডেল উৎপাদন অংশীদারি চুক্তি (পিএসসি) চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়াও চলছে। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে দরপত্র আহ্বানের লক্ষ্য সামনে রেখে খসড়া মডেল পিএসসি আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে ফেরার পর এটি মন্ত্রিপরিষদের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে।
এদিকে সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে পেট্রোবাংলা। আগামী ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত এতে দরপত্র জমা দেওয়া যাবে। এখন পর্যন্ত সাতটি দেশি-বিদেশি কোম্পানি দরপত্র প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পেট্রোবাংলার কাছ থেকে তথ্য প্যাকেজ কিনেছে। তুরস্কের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান টার্কিশ পেট্রোলিয়াম ওভারসিজ কোম্পানিও নথি কিনে আনুষ্ঠানিকভাবে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে আগের তুলনায় আর্থিক ও বাণিজ্যিক সুবিধা বাড়িয়ে পিএসসি সংশোধন করা হয়েছে।
গ্যাস অনুসন্ধানের সক্ষমতা বাড়াতে ২ হাজার হর্স পাওয়ারের একটি রিগ কেনার মূল্যায়ন চলছে। একই সঙ্গে ১ হাজার ৫০০ হর্স পাওয়ারের আরেকটি রিগ সংগ্রহের জন্য বিস্তারিত প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির কাজ চলছে। প্রস্তাব চূড়ান্ত হলে তা অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে।
এরই মধ্যে স্থলভাগে ২৯টি কূপ খনন বা ওয়ার্কওভার শেষ হয়েছে। আরও কয়েকটি কূপের কাজ চলমান রয়েছে। নতুন গ্যাসক্ষেত্রের সম্ভাবনা যাচাইয়ে সিসমিক জরিপও পরিচালনা করা হচ্ছে। দুটি ব্লকে ২ডি সিসমিক তথ্য সংগ্রহের পর সেগুলো বিশ্লেষণের কাজ চলছে।
একনেক মূল্যায়নসহ একটি উন্নয়ন কূপ ও দুটি অনুসন্ধান কূপ খননের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। প্রকল্পটির আওতায় ৩ হাজার ৫৫০ মিটার গভীরতার বেগমগঞ্জ-৫, ৩ হাজার ৪০০ মিটার গভীরতার বেগমগঞ্জ-৬ এবং ৫ হাজার ৩০০ মিটার গভীর সুনেত্রা কূপ খনন করা হবে।
এলএনজি আমদানিতে আলোচনা
এলএনজি আমদানির জন্য মিয়ানমার, মালয়েশিয়া, ওমান, আজারবাইজান, আলজেরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করছে জ্বালানি মন্ত্রণালয়। এলএনজি অবকাঠামো খাতে খুব বেশি অগ্রগতি না হলেও মাতারবাড়ীতে তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) স্থাপনের কাজ পেতে যাচ্ছে চীনের প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড (সিএনইই)। চীন সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের ‘জিটুজি’ ব্যবস্থার আওতায় প্রতিষ্ঠানটিকে এই টার্মিনাল স্থাপনের কাজ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে জ্বালানি বিভাগ।
কয়লা খাতে গতি কম
কয়লা উন্নয়নের ক্ষেত্রে কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী পাঁচটি আবিষ্কৃত কয়লাক্ষেত্র থেকে কয়লা উন্নয়নে নীতিগত সিদ্ধান্ত ও সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়ার কথা ছিল। বড়পুকুরিয়া কয়লাক্ষেত্রের উত্তর-দক্ষিণ অংশে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে খননের জন্য কারিগরি-আর্থিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষাও অনুমোদন করা হয়েছিল। তবে এসব উদ্যোগে এখনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট) প্রকৌশলী মো. শোয়েব বলেন, ‘কয়লা উত্তোলন বিষয়ে আমাদের যে চলমান কাজ তা চালু রেখেছি। বড়পুকুরিয়াতে নতুন করে আরো ৩০০ একর জায়গায় কয়লা উত্তোলনের কাজ চলমান আছে। এরই মধ্যে সেখানে বোরহোল করা হয়েছে। এখন নকশার করার কাজ এগিয়ে চলছে। তবে এখানে কোন কোম্পানি কয়লা উত্তোলন করবে- সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি।’
তিনি আরও জানান, খালিশপুরে ২০০৬ সালে একটি বেসরকারি কোম্পানি কয়লা অনুসন্ধানের লাইসেন্স পেয়েছিল। বর্তমানে ওই কোম্পানিটিই সেখানে কয়লা অনুসন্ধানে আগ্রহ প্রকাশ করছে।
জ্বালানি তেলের মজুদ বাড়ানোর উদ্যোগ
জ্বালানি তেলের মজুদ সক্ষমতা ৬০ দিন থেকে বাড়িয়ে ৯০ দিনে উন্নীত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে জ্বালানি বিভাগ অবকাঠামো উন্নয়নসহ বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
সৌরবিদ্যুতে গুরুত্ব
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত থেকেও বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী চার বছরের মধ্যে এ খাত থেকে ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে নতুন সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়।
এ ছাড়া সরকারি অফিস ভবনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দক্ষ ব্যবহারের জন্য গাইডলাইন তৈরি করা হয়েছে। পিকআওয়ারে মার্কেট ও শপিং মলে অতিরিক্ত আলোকসজ্জা বন্ধ রাখতে নিয়মিত ভিজিলেন্স টিমও কাজ করছে।
নিউজ বাংলা চ্যানেল