ঢাকা | খ্রি.

বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের নতুন অধ্যায়, ৫ বছরে ১ ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের লক্ষ্য

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 28, 2026 ইং | Photo Card
বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের নতুন অধ্যায়, ৫ বছরে ১ ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের লক্ষ্য ছবির ক্যাপশন: ছবি সংগৃহীত
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদন

বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি ও প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণে একমত হয়েছেন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী। আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে জাপানি বেসরকারি খাত থেকে ১ ট্রিলিয়ন ইয়েন পর্যন্ত বিনিয়োগের সম্ভাবনা এবং এর মাধ্যমে দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে দুই দেশ। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তির মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন পর্যায়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) জাপানের রাজধানী টোকিওতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক শেষে প্রকাশিত ১৪ দফার যৌথ বিবৃতিতে এসব তথ্য জানানো হয়।

বৈঠকে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকেন্দ্রিক ‘অভিন্ন সমৃদ্ধির জন্য বিগ-বি’ উদ্যোগ, জ্বালানি নিরাপত্তায় ৫০ বিলিয়ন ইয়েনের জরুরি ঋণ সহায়তা, অবকাঠামো উন্নয়ন, ডিজিটাল রূপান্তর এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান ও প্রত্যাবাসনে জাপানের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়েও আলোচনা হয়।

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে গুরুত্ব

বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদনশিল্প, খাদ্য ও কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং ওষুধশিল্পে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ে দুই প্রধানমন্ত্রী একমত হন। যৌথ বিবৃতিতে আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ১ ট্রিলিয়ন ইয়েন পর্যন্ত সম্ভাব্য জাপানি বেসরকারি বিনিয়োগ এবং দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির পূর্বাভাসকে স্বাগত জানানো হয়।

বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে করনীতি, শুল্ক ছাড়করণ, অর্থ স্থানান্তর ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং পূর্বানুমানযোগ্যতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির সুফল দুই দেশের জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

এ ছাড়া আঞ্চলিক ব্যাপক অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (আরসিইপি) চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদানের বিষয়ে জাপানের ইতিবাচক আলোচনার আশ্বাসের কথাও যৌথ বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়ন, কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে সহযোগিতা বাড়াতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।

মাতারবাড়ীকেন্দ্রিক অবকাঠামো উন্নয়ন

পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও সরবরাহব্যবস্থার ঝুঁকি বিবেচনায় দুই দেশ ‘বিগ-বি’ উদ্যোগকে ‘অভিন্ন সমৃদ্ধির জন্য বিগ-বি’ হিসেবে এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর আওতায় মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে মাতারবাড়ী-মহেশখালী অঞ্চলকে লজিস্টিকস, জ্বালানি ও শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ছাড়া হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালুর প্রস্তুতিমূলক কাজ এগিয়ে নেওয়া, ঢাকার মেট্রোরেল লাইনগুলোর নির্মাণ ত্বরান্বিত করা এবং মাতারবাড়ী বন্দরের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়ে একমত হয়েছে দুই দেশ।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের ছয়টি প্রধান বিভাগীয় শহরকে যুক্ত করে দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্ক এবং দেশব্যাপী উড়াল সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। এসব বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে জাপানের কারিগরি সহায়তা, বিনিয়োগ ও অর্থায়ন কামনা করেন তিনি।

জ্বালানি ও প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাপানের ‘পাওয়ার এশিয়া’ উদ্যোগের আওতায় বাংলাদেশকে ৫০ বিলিয়ন ইয়েনের জরুরি সহায়তা ঋণ দেওয়ার জন্য দেশটির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), দক্ষ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে দুই দেশের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি লেটার অব ইনটেন্ট স্বাক্ষরিত হয়েছে।

প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে বাংলাদেশ-জাপান টেক পার্ক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস ও ইলেকট্রনিকস উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা তুলে ধরেন তিনি। পাশাপাশি মহাকাশবিজ্ঞান, স্যাটেলাইট প্রকৌশল এবং ডিজিটাল প্রযুক্তিতে সহযোগিতা বাড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেন।

প্রতিরক্ষা ও সমুদ্র নিরাপত্তা

দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদারে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তি স্বাক্ষরকে স্বাগত জানিয়েছেন দুই প্রধানমন্ত্রী। সমুদ্র পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, উপকূলীয় টহল ও বন্দর নিরাপত্তায় সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় সহযোগিতা সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

রোহিঙ্গা সংকট ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা

মিয়ানমারের অবনতিশীল পরিস্থিতি এবং এর ফলে সৃষ্ট রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুতি সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন দুই প্রধানমন্ত্রী। তাঁরা সহিংসতা বন্ধ, মানবিক সহায়তা নিশ্চিত এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সংলাপের আহ্বান জানান।

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার বিষয়ে জাপানের সমর্থনকে স্বাগত জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, সংকটের স্থায়ী সমাধান মিয়ানমারেই নিহিত। রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে নিজ দেশে প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

বৈঠকে মুক্ত ও অবাধ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা, আন্তর্জাতিক আইন ও আইনের শাসন সমুন্নত রাখা এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদারের বিষয়েও দুই নেতা অভিন্ন অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের নির্বাচনে জাপানের সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের প্রত্যাশা

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক, প্রযুক্তি ও উৎপাদনশিল্পের কেন্দ্রে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের নবম বৃহত্তম ভোক্তা অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের জিডিপি এক ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে জাপানের অবদানের কথা স্মরণ করে তিনি দুই দেশের সম্পর্ককে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা, শান্তি ও সমৃদ্ধির ভিত্তিতে আরও এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

সহযোগিতার অগ্রাধিকার নির্ধারণ ও সিদ্ধান্তগুলোর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে মন্ত্রী পর্যায়ের যৌথ কমিশন গঠনের প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে দুই দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচিকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। দুই দেশের নেতারা আশা প্রকাশ করেন, এই শীর্ষ বৈঠকের মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তায় বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হবে।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : নিউজ বাংলা চ্যানেল

কমেন্ট বক্স