নিজস্ব প্রতিবেদক
চিত্রনায়ক, চলচ্চিত্র প্রযোজক ও শিল্পপতি অনন্ত জলিল কি দেউলিয়া হয়ে গেছেন? চলচ্চিত্রাঙ্গন থেকে শুরু করে ব্যবসায়িক মহলে এখন এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। সাভারের হেমায়েতপুরে অবস্থিত তাঁর বিশাল গার্মেন্টশিল্প প্রতিষ্ঠান ‘এজেআই শিল্প পার্ক’ কার্যত বন্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়ায় এ আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে। একসময় যেখানে প্রায় ১৩ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিক কাজ করতেন, সেখানে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র এক হাজারের মতো। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, শিল্প পার্কটি বিক্রির জন্য ক্রেতা খুঁজছেন অনন্ত জলিল।
এজেআই গ্রুপ ও এবি গ্রুপের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই শিল্প পার্ক একসময় দেশের উল্লেখযোগ্য গার্মেন্টশিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পরিচিত ছিল। কিন্তু করোনা মহামারির পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে শুরু করে। একের পর এক আর্থিক ক্ষতি, বড় অঙ্কের রপ্তানি আদেশ বাতিল এবং ব্যবসায়িক মন্দার কারণে প্রতিষ্ঠানটি ঘুরে দাঁড়ানোর চ্যালেঞ্জে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে অনন্ত জলিল ধীরে ধীরে গার্মেন্টশিল্প থেকে সরে আসার উদ্যোগ নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, করোনা মহামারির সময় থেকেই অনন্ত জলিলের ব্যবসায় মন্দাভাব শুরু হয়। এর মধ্যে জার্মানি থেকে পাওয়া প্রায় ৪০০ কোটি টাকার একটি বড় রপ্তানি আদেশ বাতিল হয়ে যায়। এতে বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে তাঁর প্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি আরও প্রায় ৫০ কোটি টাকার রপ্তানি আদেশ নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়। সব মিলিয়ে এসব ক্ষতি প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক কার্যক্রমে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। দীর্ঘদিন ধরে লোকসানের চাপ সামলাতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত শিল্প পার্কটি বিক্রির সিদ্ধান্তের দিকে এগোচ্ছেন তিনি বলে জানা গেছে।
ইতোমধ্যে শিল্প পার্কের অন্তর্ভুক্ত এবি গ্রুপ অন্য একজনের কাছে হস্তান্তর করেছেন অনন্ত জলিল। এবার পুরো শিল্প পার্কটিই বিক্রি করে দেওয়ার জন্য সম্ভাব্য ক্রেতা খুঁজছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে এ বিষয়ে অনন্ত জলিলের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য কিংবা শিল্প পার্কটির বিক্রির প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁর সামগ্রিক আর্থিক অবস্থা এবং তিনি আদৌ দেউলিয়া হয়েছেন কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
ব্যবসায়িক মন্দার বিষয়ে অনন্ত জলিল কয়েক মাস আগেও নিজের ব্যবসার খারাপ পরিস্থিতির কথা জানিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। তবে দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক ক্ষতির পরিপ্রেক্ষিতে গার্মেন্টশিল্প থেকে সরে আসার উদ্যোগকে ঘিরে তাঁর ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক পরিকল্পনা নিয়েও নানা আলোচনা চলছে।
উল্লেখ্য, গার্মেন্টশিল্প ও বাণিজ্যে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৪ সালে সিআইপি মর্যাদা লাভ করেন অনন্ত জলিল। গার্মেন্ট ব্যবসার পাশাপাশি চলচ্চিত্র প্রযোজনা ও অভিনয়ে যুক্ত হয়ে তিনি দেশের বিনোদনজগতে পরিচিতি অর্জন করেন। তাঁর প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান মনসুন ফিল্মসের ব্যানারে এ পর্যন্ত প্রায় ১০টি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, ব্যয়বহুল নির্মাণ এবং দেশের বাইরের বিভিন্ন লোকেশনে শুটিংয়ের মাধ্যমে বাংলা চলচ্চিত্রে নতুন মাত্রা যুক্ত করার উদ্যোগ নেন তিনি।
২০১০ সালে ‘খোঁজ—দ্য সার্চ’ চলচ্চিত্র প্রযোজনা ও অভিনয়ের মধ্য দিয়ে বড় পর্দায় তাঁর যাত্রা শুরু হয়। প্রথম সিনেমাতেই আলোচনায় আসেন তিনি। এরপর ২০১১ সালে ‘হৃদয় ভাঙা ঢেউ’, ২০১২ সালে ‘দ্য স্পিড’, ২০১৩ সালে ‘মোস্ট ওয়েলকাম’ ও ‘নিঃস্বার্থ ভালোবাসা’, ২০১৪ সালে ‘মোস্ট ওয়েলকাম-২’, ২০২২ সালে ‘দিন—দ্য ডে’ এবং ২০২৩ সালে ‘কিল হিম’ চলচ্চিত্রে প্রযোজনা ও অভিনয় করেন।
এ ছাড়া ‘নেত্রী—দ্য লিডার’, ‘দ্য স্পাই’ ও ‘অপারেশন জ্যাকপট’ চলচ্চিত্রের সঙ্গেও যুক্ত রয়েছেন তিনি। একদিকে চলচ্চিত্রজগতে তাঁর পরিচিতি, অন্যদিকে বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার অভিজ্ঞতা—সব মিলিয়ে অনন্ত জলিলের ব্যবসায়িক সংকটের খবর এখন নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে শিল্প পার্ক বিক্রির বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তথ্য এবং তাঁর আর্থিক অবস্থার পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া গেলেই এ পরিস্থিতির প্রকৃত ব্যাপ্তি স্পষ্ট হবে।
নিউজ বাংলা চ্যানেল