নিজস্ব প্রতিবেদক
ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সৃষ্ট নিরাপত্তা সংকটে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেল পরিবহনের ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। এক বছরের ব্যবধানে তেল পরিবহনের গড় ভাড়া ব্যারেলপ্রতি ৩ ডলার থেকে বেড়ে ২০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচলে অনিশ্চয়তা, ট্যাংকারে হামলা এবং যুদ্ধঝুঁকির কারণে নির্দিষ্ট কিছু রুটে ভাড়া বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৩৫ ডলারেও পৌঁছেছে।
মার্কিন বিনিয়োগ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকসের বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির উন্নতির স্পষ্ট লক্ষণ না থাকায় স্বল্প মেয়াদে তেল পরিবহনের ভাড়া উচ্চপর্যায়ে থাকতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামেও নতুন করে ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।
গোল্ডম্যান স্যাকসের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধঝুঁকির কারণে তেল পরিবহনে ব্যারেলপ্রতি অতিরিক্ত ৭ ডলার, জ্বালানির দাম বৃদ্ধিতে ৪ ডলার এবং ওমান উপসাগরে এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে তেল স্থানান্তরে আরও ৪ ডলার ব্যয় হচ্ছে। এসব অতিরিক্ত ব্যয় সামুদ্রিক পরিবহন খাতের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরের শেষ নাগাদ আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারে থাকতে পারে। তবে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, জাহাজে নতুন করে হামলা, তেল অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি এবং দীর্ঘস্থায়ী ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দাম এ পূর্বাভাস ছাড়িয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বুধবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ১০৯ দশমিক ৩৪ ডলার। একই দিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম দাঁড়ায় ৯৮ দশমিক ৪৭ ডলারে।
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে তেলবাহী সুপারট্যাংকারের ভাড়াও রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছে। গত সেপ্টেম্বরে পারস্য উপসাগর থেকে চীন পর্যন্ত অপরিশোধিত তেল পরিবহনে একটি সুপারট্যাংকারের দৈনিক ভাড়া ছিল ১০ লাখ ডলার। অক্টোবরের শুরুর দিকে পারস্য উপসাগর থেকে পূর্ব এশিয়ায় তেল পরিবহনের ক্ষেত্রে সেই ভাড়া ১৪ লাখ ডলার ছাড়িয়ে যায়।
হরমুজ প্রণালির বাইরে ওমান উপসাগরে বড় ট্যাংকারগুলোকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। সেখান থেকে ছোট জাহাজে তেল স্থানান্তর করা হচ্ছে, যা ‘শিপ-টু-শিপ ট্রান্সফার’ নামে পরিচিত। এ প্রক্রিয়ায় সময় ও পরিচালন ব্যয় বাড়ছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে ট্যাংকার আটকে থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যবহারের উপযোগী সুপারট্যাংকারের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। ফলে তেল উৎপাদক ও ক্রেতারা আফরাম্যাক্স ও সুয়েজম্যাক্সের মতো অপেক্ষাকৃত ছোট ট্যাংকার ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছেন।
বিশ্ববাজারভিত্তিক তথ্য ও বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, নতুন করে হামলার পর মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ আবারও কমেছে। গত দুই সপ্তাহে অন্তত ১৮টি ট্যাংকারে হামলার ঘটনা ঘটেছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে পারস্য উপসাগর থেকে দৈনিক তেল সরবরাহ কমে ৮৫ লাখ ব্যারেলে নেমেছে। দুই সপ্তাহ আগেও এ সরবরাহ ছিল দৈনিক ২ কোটি ব্যারেলের বেশি।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, তেল সরবরাহে এ ধরনের বিঘ্ন দীর্ঘায়িত হলে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়বে। পাশাপাশি জাহাজ চলাচল, পণ্য পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানার উৎপাদন খরচেও বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দীর্ঘ সময় উঁচু থাকলে এর প্রভাব পড়তে পারে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি এবং তেলবাহী জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
নিউজ বাংলা চ্যানেল