পাকিস্তানের পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, দেশটির বেসামরিক সরকার গত এক বছরে অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। ইসলামাবাদে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সরকার থাকলেও দেশের নিরাপত্তা, কূটনীতি ও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে রাওয়ালপিন্ডির প্রভাব স্পষ্ট। এসব সিদ্ধান্তে মুনিরের ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন তারা।
একই সময়ে পাকিস্তান অর্থনৈতিক দুর্বলতা, বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়ায় বিদ্রোহ এবং পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরে বাড়তে থাকা অসন্তোষের মতো একাধিক সংকটে রয়েছে। ক্ষমতাকেন্দ্রের দমন-পীড়নের খবর যাতে আন্তর্জাতিকভাবে ছড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের ওপরও বিভিন্ন বিধিনিষেধ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাকিস্তানে সামরিক ক্ষমতা দখলের পুরোনো ইতিহাস
১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর পাকিস্তানে চারবার সামরিকভাবে ক্ষমতা দখলের ঘটনা ঘটেছে। ১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খান ক্ষমতা নেন। ১৯৬৯ সালে তাকে সরিয়ে ক্ষমতায় আসেন ইয়াহিয়া খান। ১৯৭৭ সালে জুলফিকার আলী ভুট্টোকে সরিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন জিয়া-উল-হক। এরপর ১৯৯৯ সালে নওয়াজ শরিফকে সরিয়ে ক্ষমতায় আসেন জেনারেল পারভেজ মোশাররফ।
এর মধ্যে ১৯৫৮, ১৯৭৭ ও ১৯৯৯ সালে নির্বাচিত বেসামরিক সরকার সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিল।
তবে পাকিস্তানে সামরিক বাহিনীর প্রভাব সব সময় সরাসরি সামরিক শাসনের মাধ্যমে প্রকাশ পায়নি। একটি পদ্ধতিতে সেনাবাহিনী সরাসরি বেসামরিক সরকারকে সরিয়ে সংবিধান স্থগিত বা পরিবর্তন করে সামরিক আইন জারি করে। অন্যদিকে রয়েছে ‘নরম অভ্যুত্থান’-এর ধারণা। এতে সংবিধান, নির্বাচন, সংসদ ও প্রধানমন্ত্রী বহাল থাকলেও পররাষ্ট্রনীতি, পারমাণবিক অস্ত্র, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে সামরিক বাহিনীর প্রভাব বজায় থাকে।
পর্যবেক্ষকদের একটি অংশ মনে করেন, পাকিস্তান বেশ কিছু সময় ধরে এমন একটি হাইব্রিড শাসনব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
মুনিরের ক্ষমতা বৃদ্ধির পেছনে ইমরান পর্ব
ইমরান খান ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর পাকিস্তানে আসিম মুনিরের ক্ষমতা বাড়ার বিষয়টি স্পষ্ট হতে থাকে। পরে ইমরান খান কারাগারে যাওয়ার পর পরিস্থিতি আরও পরিবর্তিত হয়। তার দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের ওপর দমন-পীড়ন চালানো হয় এবং বেসামরিক নাগরিকদের সামরিক আদালতে বিচার করা হয়। ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগেও ইমরানের দলকে দুর্বল করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ ও পাকিস্তান পিপলস পার্টির মধ্যে জোট গড়ে ওঠে। এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে মুনিরের প্রভাব আরও শক্ত হয়েছে বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকেরা।
ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পরও মুনিরের ক্ষমতা আরও বেড়েছে বলে তাদের একটি অংশের মত। ওই সময় তিনি নিজেকে ফিল্ড মার্শাল পদে উন্নীত করেন এবং নিজের ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ় করেন।
বর্তমানে মুনিরের বয়স ৫৮ বছর। ফিল্ড মার্শাল হিসেবে তার অবসরের নির্দিষ্ট বয়সসীমা নেই। সম্প্রতি পাকিস্তানের আইনেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন বিধান অনুযায়ী, মুনির কখন অবসর নেবেন বা আদৌ অবসর নেবেন কি না, সেটি ফেডারেল সরকার নির্ধারণ করবে। ফলে আপাতত তার পদ ছাড়ার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।
নাকভির মন্তব্যে নতুন জল্পনা
মুনিরের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নাকভি সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে দেশটির শাসনব্যবস্থা কার্যত ‘ভেঙে পড়েছে’ বলে মন্তব্য করেন। তিনি সরাসরি সামরিক শাসনের কথা না বললেও তার বক্তব্যকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন পর্যবেক্ষকেরা।
নাকভি একসময় সিএনএনের সাংবাদিক ছিলেন। বড় ধরনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ছাড়াই তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন। সিনেটের মাধ্যমে শেহবাজ শরিফের মন্ত্রিসভায় যোগ দেওয়ার আগে সক্রিয় রাজনীতিতে তার বড় ভূমিকা ছিল না। বর্তমানে তিনি পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডেরও প্রধান।
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম-ফজলের প্রধান মাওলানা ফজলুর রহমান নাকভিকে নিয়ে কটাক্ষ করে বলেন, ‘নাকভি সাহেব আমাদের সন্তানের মতো। কিন্তু সময়ের আগেই বড় হয়ে গেছেন।’
এর কয়েক সপ্তাহ আগে নাকভি ক্ষমতাকেন্দ্রকে ‘ইউনিফর্ম খুলে রাজনীতিতে নামার’ আহ্বান জানিয়েছিলেন। পাকিস্তানে মুনিরের ক্ষমতা বাড়ার সময়েই নাকভির রাজনৈতিক উত্থান হওয়ায় তার বক্তব্যকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
পাকিস্তানের লেখক ও ডন-এর কলামনিস্ট ইউসুফ নজর বলেন, ‘গণমাধ্যম ও রাজনীতিবিদেরা স্বাভাবিকভাবেই মোহসিন নাকভির দিকে নজর দিয়েছেন। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসলে ক্ষমতাকেন্দ্রের হয়ে কথা বলেন। আরো নির্দিষ্ট করে বললে, তিনি ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের হয়ে কথা বলেন।’
তার মতে, পাকিস্তানের ক্ষমতার কাঠামোর ওপর মুনিরের বাড়তে থাকা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি নাকভির বক্তব্য থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।
নজর আরও বলেন, ‘এত বেশি ক্ষমতা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে নেওয়ার মাধ্যমে ফিল্ড মার্শাল একটি বড় ঐতিহাসিক দায়িত্বও নিজের ওপর নিয়েছেন। ব্যবস্থা যদি সত্যিই ভেঙে পড়ে থাকে, তাহলে এর দায় থেকে ফিল্ড মার্শালের নিজেকে আলাদা করা অসম্ভব।’
মুনিরের সামনে দুটি পথ দেখছেন আয়েশা সিদ্দিকা
পাকিস্তানের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক আয়েশা সিদ্দিকার মতে, মুনিরের সামনে এখন দুটি পথ রয়েছে। তার ভাষায়, মুনিরের উচিত হয় ‘বাড়ি ফিরে যাওয়া এবং সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া’, নয়তো সরাসরি জনগণের সামনে এসে সামরিক আইন জারি করা।
আয়েশা সিদ্দিকার মতে, পেছন থেকে সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করে পাকিস্তানের শাসনব্যবস্থার সংকটের সমাধান করা সম্ভব নয়।
অন্যদিকে ইউসুফ নজর পাকিস্তানের বর্তমান সংকটের পেছনে আরও কিছু কাঠামোগত সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন। তার মতে, ক্ষমতা একটি ছোট অভিজাত গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত ক্ষমতা প্রদর্শনের প্রবণতাও রয়েছে। পাশাপাশি এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, যেখানে ক্ষমতাবানরা সরকারি পদকে নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পত্তির মতো ব্যবহার করেন।
নজর আরও প্রশ্ন তুলেছেন, পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্ব দেশের প্রকৃত সমস্যাগুলো বুঝতে পেরেছে কি না। তিনি বলেন, ‘মি. নাকভির বক্তব্যে আমি সন্তুষ্ট নই। দেশের সমস্যাগুলো কী, তা নিয়ে তার গভীর কোনো ধারণা আছে বলে আমার মনে হয়নি।’
‘নরম অভ্যুত্থান’-এর অভিযোগ
পর্যবেক্ষকদের মতে, পাকিস্তানে সামরিক বাহিনীর প্রভাব বর্তমানে সরাসরি ক্ষমতা দখলের চেয়ে ভিন্ন রূপেও প্রকাশ পাচ্ছে। সংবিধান ও বেসামরিক প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সামরিক নেতৃত্বের প্রভাবাধীন থাকলে সেটিকে ‘নরম অভ্যুত্থান’ হিসেবে দেখা হয়।
২০২২ সালে ইমরান খানের সঙ্গে সেনাবাহিনীর সম্পর্কের অবনতি এবং পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের পর মুনিরের ক্ষমতা আরও বিস্তৃত হয়েছে বলে মনে করেন অনেকে।
পারভেজ মোশাররফের মতো মুনির এখনো একই সঙ্গে সামরিক পোশাক ও বেসামরিক সরকারি পদ গ্রহণ করেননি। তবে সামরিক আইন জারি না করেও তিনি একই ধরনের ক্ষমতা ব্যবহার করছেন বলে সমালোচকদের অভিযোগ। এ কারণেই তিনি ধীরে ধীরে সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণের দিকে এগোচ্ছেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সামরিক অভ্যুত্থানের দাবি আদিল রাজার
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাবেক ভিন্নমতাবলম্বী এবং বর্তমানে ইউটিউবার আদিল রাজা দাবি করেছেন, দেশটির বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিবর্তনের পরিকল্পনা সেনাবাহিনী চূড়ান্ত করেছে।
এক ইউটিউব ভিডিওতে তিনি দাবি করেন, আসিম মুনির প্রেসিডেন্ট এবং মোহসিন নাকভি প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন। তবে একই সঙ্গে একটি ‘গণতান্ত্রিক আবরণ’ রাখা হবে বলেও তিনি দাবি করেন।
আদিল রাজার দাবি অনুযায়ী, একটি সাত ঘণ্টার গোয়েন্দা সংস্থার বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন—এমন দুই অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির কাছ থেকে তিনি এসব তথ্য পেয়েছেন। তার দাবি, পাকিস্তানের শীর্ষ সামরিক নেতৃত্ব মনে করছে দেশটির বর্তমান ব্যবস্থা ‘ভেঙে পড়েছে’। এ কারণে নতুন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা তৈরির প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও দাবি করেন, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সমর্থন নিশ্চিত করার দায়িত্ব মোহসিন নাকভিকে দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে ‘জোর করে’ সংবিধান পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে বলেও তিনি দাবি করেন।
আদিল রাজা আরও বলেন, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি এবং তার ছেলে ও পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রধান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারিকে ‘নিরাপদে পাকিস্তান ছাড়ার সুযোগ’ দেওয়া হয়েছিল।
তবে তার মতে, মুনির সরাসরি সামরিক আইন জারি না করে তার অনুগত একটি বেসামরিক সরকারের মাধ্যমেও ক্ষমতা পরিচালনা করতে পারেন।
সরাসরি সামরিক শাসন আসছে কি না, নিশ্চিত নয়
আসিম মুনির পাকিস্তানকে আরেকটি সামরিক অভ্যুত্থানের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন কয়েকজন বিশেষজ্ঞ ও পাকিস্তানবিষয়ক পর্যবেক্ষক।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল সি এম শেঠ মোহসিন নাকভির বক্তব্যকে বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাব্য ইঙ্গিত হিসেবে দেখেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, নাকভির মন্তব্য ‘পাকিস্তানে সামনে কী ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে, তার ইঙ্গিত’।
তিনি আরও বলেন, ‘সম্ভবত মুনির দেশটির নিয়ন্ত্রণ নেবেন এবং সামরিক আইন জারি করবেন।’ তবে মেজর জেনারেল শেঠ স্পষ্ট করেছেন, এটি তার নিজের মূল্যায়ন।
সব মিলিয়ে পাকিস্তানের সামনে এখন বড় প্রশ্ন—বর্তমান ক্ষমতার কাঠামো কি হাইব্রিড শাসনব্যবস্থার মধ্যেই থাকবে, নাকি শেষ পর্যন্ত সরাসরি সামরিক শাসনের দিকে যাবে?
ডন-এর কলামনিস্ট ইউসুফ নজরের মতে, মুনির যত বেশি ক্ষমতা নিজের হাতে নিচ্ছেন, চলমান সংকটের দায়ও তত বেশি তার ওপর পড়ছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই ক্ষমতার কাঠামো সফল হলে কৃতিত্ব যাবে রাওয়ালপিন্ডির দিকে। কিন্তু ব্যবস্থা ব্যর্থ হলে সেই ব্যর্থতার দায় নেওয়ার মতো বেসামরিক নেতা তখন খুব কমই অবশিষ্ট থাকবেন।
নিউজ বাংলা চ্যানেল