নিজস্ব প্রতিবেদন
ভারতে বিরোধী দল ও শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ বন্ধ, নির্বিচারে সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিপেটা, ব্যাপক আটক এবং যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক নির্যাতনের অভিযোগে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জাতিসংঘের ২৪ জন স্বাধীন বিশেষজ্ঞ ভারতের কর্তৃপক্ষের প্রতি এ আহ্বান জানান। আলজাজিরা ও রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
বিবৃতিতে বিশেষজ্ঞরা বলেন, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার চর্চার সময়ও নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিক্ষোভকারীদের ওপর লাঠিপেটার পাশাপাশি হাজারো মানুষকে সমাবেশে অংশ নিতে বাধা দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া বিক্ষোভ ও সংশ্লিষ্ট আটক অভিযানে যৌন সহিংসতা এবং লিঙ্গভিত্তিক নির্যাতনের অভিযোগ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তাঁরা।
বিশেষজ্ঞরা অবিলম্বে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ বন্ধ, নির্বিচারে সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বায়োমেট্রিকসহ ডিজিটাল নজরদারির অপব্যবহার ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা থেকে বিরত থাকতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান।
একই সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আচরণ, আহত হওয়ার ঘটনা এবং আটকের সময় দুর্ব্যবহারের অভিযোগের নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্তের ওপর গুরুত্ব দেন তাঁরা। তাঁদের মতে, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার সুরক্ষার পাশাপাশি মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি।
জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদ বিভিন্ন দেশের নির্দিষ্ট মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও নথিবদ্ধ করার জন্য স্বাধীন বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দেয়। তাঁরা জাতিসংঘের বিশেষ প্রক্রিয়ার আওতায় দায়িত্ব পালন করলেও স্বাধীনভাবে কাজ করেন। তাঁদের বক্তব্য জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সম্মিলিত সিদ্ধান্তের প্রতিফলন নয়।
ভারত এর আগেও আন্তর্জাতিক মহলের এ ধরনের সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করে একে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছে। চলতি মাসের শুরুতে বিক্ষোভ ঘিরে ব্যাপক আটকের ঘটনায় জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর উদ্বেগ প্রকাশ করলেও ভারত একই ধরনের অবস্থান নেয়।
এদিকে চলতি মাসে ভারতে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি), অন্যান্য বিরোধী দল ও শিক্ষার্থী সংগঠনের নেতৃত্বে বিক্ষোভ চলছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে শুরু হওয়া এ আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কারণ ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ক। এ প্রক্রিয়ায় প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ পড়ার বিষয়টি দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার ঘটনায় দরিদ্র, গৃহহীন ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মানুষ অসমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষও রয়েছেন। আন্দোলনকারীদের দাবি, ভোটার তালিকা সংশোধনের এ প্রক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সমর্থক নন—এমন জনগোষ্ঠীর ভোটাধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তবে বিজেপি ও ভারতের নির্বাচন কমিশন এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। নির্বাচন কমিশনের ভাষ্য, ভোটার তালিকা সংশোধনের উদ্দেশ্য মৃত, স্থানান্তরিত, দ্বৈত নামধারী এবং অন্যান্য অযোগ্য ব্যক্তিদের নাম বাদ দেওয়া। ভুলবশত কোনো যোগ্য ভোটারের নাম বাদ পড়লে তা পুনরায় অন্তর্ভুক্তির জন্য আবেদন ও আপিলের সুযোগ রয়েছে বলেও জানিয়েছে কমিশন।
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ, বিক্ষোভে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ—সব মিলিয়ে ভারতে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের সর্বশেষ আহ্বানে বিক্ষোভকারীদের অধিকার সুরক্ষা, বলপ্রয়োগের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহির বিষয়টি নতুন করে আন্তর্জাতিক আলোচনায় এসেছে।
নিউজ বাংলা চ্যানেল