নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশজুড়ে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে জনজীবনে চরম দুর্ভোগ নেমে এসেছে। গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে আবাসিক এলাকায় চুলায় গ্যাসের সংকট, সিএনজি স্টেশনগুলোতে চাপ এবং শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ভারতের ঝাড়খণ্ডের গড্ডায় আদানি গ্রুপের ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রের সরবরাহ নিয়ে। চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুৎ দিতে পরপর তিন দফা চিঠি দিয়েও প্রত্যাশিত সরবরাহ পাচ্ছে না বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। প্রতিবারই সরবরাহ বাড়ানোর আশ্বাস দেওয়া হলেও তা স্থায়ী হচ্ছে না।
পিডিবি সূত্র জানায়, আগস্টের শুরুতেও আদানি কেন্দ্র থেকে প্রায় পূর্ণ সক্ষমতার কাছাকাছি বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছিল। ৭ আগস্ট ভোর ৫টায় সরবরাহ ছিল ১ হাজার ৪৫৩ মেগাওয়াট। কিন্তু পরদিন ৮ আগস্ট তা কমে দাঁড়ায় ৭৯০ মেগাওয়াটে। সর্বশেষ রোববার সরবরাহ হয়েছে ৯১৫ মেগাওয়াট। গত ২৩ দিন ধরে কেন্দ্রটি উৎপাদনক্ষমতার প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে বলে পিডিবি সূত্রের দাবি।
পিডিবির একজন কর্মকর্তা বলেন, তীব্র গরমে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা অস্বাভাবিক বেড়েছে। এ অবস্থায় আদানির সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণ জানতে আগস্ট মাসে তিনটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। জবাবে আদানি কখনো কয়লা ভিজে যাওয়ার কথা জানিয়েছে, আবার কখনো কয়লা পরিবহণের রেললাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা বলেছে। প্রতিবারই তিন দিনের মধ্যে পূর্ণ সরবরাহে ফেরার আশ্বাস দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
মাঝে এক-দুই দিন সরবরাহ ১ হাজার মেগাওয়াট ছাড়ালেও পরবর্তী সময়ে তা আবার কমে যাচ্ছে। ফলে দেশের সবচেয়ে বেশি চাহিদার সময়ে আদানির বিদ্যুৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কয়লা সরবরাহ নিয়ে প্রশ্ন
পিডিবি জানিয়েছে, কয়লার দাম নিয়ে আদানি গ্রুপের সঙ্গে বিরোধ রয়েছে এবং বিষয়টি অর্থনৈতিক আদালতের একজন মধ্যস্থতাকারীর কাছে বিচারাধীন। তবে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের কাছে আদানির বিদ্যুৎ বিল বকেয়া নেই। গত মাসেও প্রতিষ্ঠানটিকে ৯ কোটি ডলারের বেশি বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
আদানি গ্রুপের কেন্দ্রটি ভারতের গড্ডায় অবস্থিত হওয়ায় কয়লা সরবরাহ ও কেন্দ্রটির প্রকৃত উৎপাদন পরিস্থিতি সরেজমিনে যাচাই করাও বাংলাদেশের জন্য সহজ হচ্ছে না। পিডিবির কর্মকর্তাদের ভারত গিয়ে কেন্দ্র পরিদর্শনের সুযোগ না থাকায় কয়লা সরবরাহ ও রেল যোগাযোগসংক্রান্ত আদানির দেওয়া তথ্যের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে।
আদানির বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত তাদের পক্ষ থেকে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
ভূরাজনৈতিক প্রভাবের আশঙ্কা
আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ার পেছনে কোনো ভূরাজনৈতিক কারণ রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিদ্যুৎ বিভাগ ও পিডিবির কর্মকর্তাদের কেউ কেউ মনে করছেন, দুই দেশের সাম্প্রতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের সঙ্গে বিষয়টির কোনো যোগসূত্র আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তবে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের সরাসরি কোনো যোগসূত্র রয়েছে—এমন নিশ্চিত তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বাংলাদেশি কর্মকর্তারা কেন্দ্রটি সরেজমিনে পরিদর্শন করতে পারলে প্রকৃত কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেত।
অন্যদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত জাতীয় কমিটির প্রতিবেদনে আদানি চুক্তিতে বড় ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তোলা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে করা এই চুক্তির কারণে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতেও উৎপাদন কম
আদানির সরবরাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি দেশের অন্যান্য কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেও উৎপাদন কমেছে। ফলে লোডশেডিং পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে।
পিডিবি সূত্র অনুযায়ী, রোববার দুপুর ১২টার পিক আওয়ারে দেশে লোডশেডিং ছিল প্রায় ৩ হাজার ৫৯০ মেগাওয়াট। বিদ্যুতের চাহিদা ১৬ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেলেও সরবরাহ ছিল প্রায় ১৩ হাজার মেগাওয়াট। গত মাসে সর্বোচ্চ লোডশেডিং প্রায় ৩ হাজার ৭০০ মেগাওয়াটে উঠেছিল।
দেশের কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে আদানি ছাড়া প্রায় ৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও রোববার দুপুর ২টার দিকে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ২০০ মেগাওয়াট।
রামপাল কেন্দ্রের ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১ হাজার ১৫০ মেগাওয়াট। পায়রা কেন্দ্র থেকে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা থাকলেও উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় ৫৬৫ মেগাওয়াটে। একটি ইউনিট যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ রয়েছে।
আরএনপিএল কেন্দ্রও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ১ হাজার ৩০০ মেগাওয়াটের পরিবর্তে প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দিচ্ছে। এসএস পাওয়ারের একটি ইউনিট শনিবার রাতে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উৎপাদন ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট থেকে নেমে ৬০০ মেগাওয়াটে দাঁড়ায়। ইউনিটটি রোববার চালু হওয়ার কথা ছিল।
মেরামতের জন্য মাতারবাড়ী কেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ থাকায় সেখান থেকে পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৫৬০ মেগাওয়াট। বরিশালের কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকেও স্বাভাবিক সময়ে ৩০০ মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎ পাওয়া গেলেও বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ২০০ মেগাওয়াট।
জ্বালানি কিনতে ৩ হাজার কোটি টাকা
বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল কিনতে রোববার অর্থ মন্ত্রণালয় ৩ হাজার কোটি টাকা ছাড় করেছে বলে জানা গেছে। সরকারের এই অর্থ ছাড়ের ফলে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বাড়িয়ে ঘাটতি কিছুটা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।
তবে গ্যাসের সংকট, কয়লাভিত্তিক একাধিক কেন্দ্রের উৎপাদন ঘাটতি এবং আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে সংকট কাটার সম্ভাবনা কম। ফলে তীব্র গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটে নগর থেকে গ্রাম—সর্বত্রই জনদুর্ভোগ অব্যাহত রয়েছে।
নিউজ বাংলা চ্যানেল