শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবি জানিয়েছে, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার ছাপাখানায় প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপার কাজ দ্রুতগতিতে চলছে। বই মুদ্রণ থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ে গ্রহণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে গুণগত মান নিশ্চিত করতে এবার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নেওয়া হয়েছে। এ কার্যক্রম তদারকিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, এনসিটিবি ও একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়ে ৫৩টি মনিটরিং দল মাঠে কাজ করছে।
মানদণ্ড পূরণ না হওয়ায় এরই মধ্যে বিভিন্ন প্রেসের প্রায় সাড়ে চার লাখ ছাপানো ফর্মা এবং ২৭ হাজার নিম্নমানের বই বাতিল ও ধ্বংস করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, শুধু মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান নয়, বই গ্রহণের সময় মাঠ পর্যায়ে কোনো অনিয়ম বা দায়িত্বে শৈথিল্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট বই গ্রহণকারী কর্মকর্তা ও শিক্ষকদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারের লক্ষ্য, নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনেই শিক্ষার্থীদের হাতে শতভাগ মানসম্মত ও ত্রুটিমুক্ত বই তুলে দেওয়া।
এনসিটিবির চেয়ারম্যান প্রফেসর মোহাম্মাদ গোলাম ফখরুল মাওলা বলেন, এ বছর পাঠ্যবইয়ের মান নিয়ে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। গুণগত মান ঠিক না থাকায় ইতিমধ্যে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ ছাপানো ফর্মা এবং ২৭ হাজার নিম্নমানের বই বাতিল করা হয়েছে। ৩০ নভেম্বরের মধ্যে শতভাগ মানসম্মত ও নিখুঁত বই উপজেলায় পৌঁছাতে মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবি নিরলসভাবে কাজ করছে।
তিনি আরও বলেন, অতীতে প্রেস ও মাঠ পর্যায়ে অসাধু চক্রের যোগসাজশের সুযোগ থাকলেও এবার বই গ্রহণের সময় সংশ্লিষ্ট জেলা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের সরাসরি মান যাচাইয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বই গ্রহণের পরও মান নিয়ে কোনো সমস্যা ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট গ্রহীতা কর্মকর্তাকেও শাস্তির আওতায় আনা হবে।
এনসিটিবির ২২ সেপ্টেম্বরের উৎপাদন প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, ইবতেদায়ি, মাধ্যমিক, দাখিল, ভোকেশনাল ও কারিগরি স্তর মিলিয়ে মোট ৩০ কোটি ৭১ লাখ ৯৮ হাজার ১০১ কপি বই ছাপানো হবে। এর মধ্যে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের বইও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। গত বছরের তুলনায় এবার এক মাস আগেই মুদ্রণকাজ শুরু হয়েছে এবং দেশের বিভিন্ন প্রেসে তা চলমান রয়েছে।
প্রাক-প্রাথমিক স্তরের ৫৭ লাখ ৩০ হাজার ৬৪০টি বইয়ের মধ্যে ৪২ লাখ ৬৬ হাজার ২৫৩টি বা ৭৪ দশমিক ৪৫ শতাংশের মুদ্রণ শেষ হয়েছে। প্রাথমিক স্তরে ৭ কোটি ৬০ লাখ ৯৭ হাজার ৯৬টি বইয়ের মধ্যে ছাপা হয়েছে ২ কোটি ৮০ লাখ ৭৮ হাজার ৯৯৬টি, যা মোটের ৩৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ। আর মাধ্যমিক স্তরের ২২ কোটি ১১ লাখ ৮২ হাজার ৫৯২টি বইয়ের মধ্যে ১ কোটি ৫২ লাখ ৬৪ হাজার ৪০০টি বা ৭ শতাংশ বই ছাপানো শেষ হয়েছে।
এনসিটিবির বিতরণ শাখার এক কর্মকর্তা জানান, প্রাক-প্রাথমিক স্তরের বইয়ের মুদ্রণ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এরই মধ্যে বাঞ্ছারামপুর, সরাইলসহ দেশের কয়েকটি উপজেলায় বই সরবরাহ শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সব উপজেলায় শতভাগ বই পৌঁছে দেওয়া হবে। তবে ইংরেজি ভার্সন ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বিশেষ বইগুলো জেলা পর্যায়ে পাঠানো হবে।
এনসিটিবি জানিয়েছে, সরকারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ ১১৩টি প্রেসের মধ্যে বর্তমানে ৯১টিতে পুরোদমে বই ছাপার কাজ চলছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে যাতে মুদ্রণ ব্যাহত না হয়, সে জন্য বড় প্রেসগুলোতে জেনারেটর ব্যাকআপ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে এসব প্রতিষ্ঠানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা হচ্ছে।
নতুন বইয়ের কাগজের জিএসএম ও মুদ্রণের মান যাচাইয়ে পিডিআই (প্রি-ডেলিভারি ইন্সপেকশন) এজেন্সির পাশাপাশি ল্যাব পরীক্ষার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। সম্প্রতি ৯টি প্রেসের কাগজের নমুনা বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদে (বিসিএসআইআর) পরীক্ষা করা হলে সেগুলো মানসম্মত পাওয়া যায়।
পাঠ্যবইয়ের মুদ্রণ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্বচ্ছতা, অনিয়ম কিংবা কৃত্রিম সংকট যাতে তৈরি না হয়, সে জন্য এনসিটিবির বিশেষ টিমের পাশাপাশি একাধিক গোয়েন্দা সংস্থাকেও মাঠ পর্যায়ে কাজে লাগানো হয়েছে। এনসিটিবি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে মোট ৫৩টি মনিটরিং টিম সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছে। এর মধ্যে এনসিটিবির নিজস্ব ৩৩টি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৭টি দল ছাপাখানাগুলোতে নজরদারি করছে।
এ ছাড়া এনসিটিবির সচিব ও সদস্যদের নেতৃত্বে আরও ৫টি বিশেষ টিম মাঠ থেকে তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে। মনিটরিং কর্মকর্তারা প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত পর্যন্ত সরাসরি প্রেসে অবস্থান করছেন।
এনসিটিবির কর্মকর্তারা জানান, নতুন বইয়ের কাগজের ৮৫ শতাংশ উজ্জ্বলতা এবং মুদ্রণমান নিশ্চিত করতে সংস্থার নিজস্ব তদারকির পাশাপাশি পিডিআই এজেন্সির মাধ্যমে কেমিক্যাল ও গুণগত মান পরীক্ষা করা হচ্ছে। র্যান্ডম ভিত্তিতে ৯টি প্রেসের কাগজের নমুনা বিসিএসআইআরে পরীক্ষা করা হয়েছে এবং সব নমুনাই মানসম্মত পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, মানদণ্ড পূরণ না করায় বিভিন্ন প্রেসের প্রায় সাড়ে চার লাখ ছাপানো ফর্মা ও ২৭ হাজার নিম্নমানের বই বাতিল ও বিনষ্ট করা হয়েছে।
শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বাসসকে বলেন, উপজেলা পর্যায়ে নিম্নমানের কাগজে তৈরি কোনো বই গ্রহণ করা হবে না। তাঁর ভাষ্য, সরকার বাজারদর যাচাই করে এবার যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করেছে, যাতে কম দামের অজুহাতে কোনো প্রতিষ্ঠান নিম্নমানের বই তৈরির সুযোগ না পায়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মানসম্মত বই সরবরাহে ব্যর্থ হলে কোনো মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ছাড় দেওয়া হবে না।
এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) প্রফেসর মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু বাসসকে বলেন, শিক্ষার্থীদের হাতে নির্ধারিত সময়ে বই পৌঁছে দিতে রোডম্যাপ অনুযায়ী কাজ চলছে। ৩০ নভেম্বরের মধ্যে বই সরবরাহ শেষ করার জন্য প্রেস মালিকদের স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মাঠ পর্যায়ের টিমগুলো প্রতিদিন প্রেসে অবস্থান করে পুরো কার্যক্রম তদারক করছে। তাঁদের মূল লক্ষ্য হলো বছরের প্রথম দিনেই শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন শ্রেণির সম্পূর্ণ সেট বই তুলে দেওয়া।
নিউজ বাংলা চ্যানেল