নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরছে না। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার উচ্চমূল্যের বিপরীতে মানুষের আয় বাড়ছে ধীরগতিতে। গত দুই বছর ধরে মূল্যস্ফীতির তুলনায় মজুরি বৃদ্ধির হার কম থাকায় ক্রমেই কমছে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা। ফলে বাজারে কিছু পণ্যের দাম কমলেও সংসারের ব্যয় সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেশের মূল্যস্ফীতি, মজুরি বৃদ্ধি ও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার এমন উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) মূল্যস্ফীতি আগের প্রান্তিকের তুলনায় কমলেও মজুরি বৃদ্ধির গতি প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি। বরং প্রান্তিকের শেষ দিকে মজুরি বৃদ্ধির হার কমে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতি ও মজুরি বৃদ্ধির ব্যবধান আবার বাড়তে শুরু করেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি আগের মাসের ৯ দশমিক ২ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে আসে। জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৩১ শতাংশে। আগের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে এ হার ছিল ৯ দশমিক ২১ শতাংশ। খাদ্য ও মূল মূল্যস্ফীতি কমে আসায় সার্বিক মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে জ্বালানি মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়; বরং দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমে আসা। ফলে আগের উচ্চমূল্যের সঙ্গে নতুন ব্যয় যুক্ত হতে থাকলে এবং আয় সেই অনুপাতে না বাড়লে সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধার কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মূল্যস্ফীতি কমতে শুরু করায় মজুরি ও মূল্যস্ফীতির ব্যবধানও সংকুচিত হচ্ছিল। ওই বছরের অক্টোবর পর্যন্ত এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলেও পরবর্তী সময়ে ব্যবধান আবার বাড়তে থাকে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকেও মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল মন্থর। দেশের সব বিভাগেই আগের প্রান্তিকের তুলনায় মজুরি বৃদ্ধির হার সামান্য কমেছে। তবে বিভাগগুলোর মধ্যে ঢাকায় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল সর্বোচ্চ।
জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যে বাড়তি চাপ
খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমলেও জ্বালানি খাতে মূল্যচাপ বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রথম প্রান্তিকে জ্বালানি মূল্যস্ফীতি আগের প্রান্তিকের ১৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৭ দশমিক ৪০ শতাংশ হয়েছে। কঠিন জ্বালানি, যেমন কাঠ, কৃষিজাত উপজাত, গোবর ও পাটকাঠির মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২ দশমিক ১ শতাংশে। একই সময়ে জ্বালানি ও লুব্রিকেন্টের মূল্যস্ফীতি ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে।
অন্যদিকে খাদ্য মূল্যস্ফীতি আগের প্রান্তিকের ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ থেকে কমে ৭ দশমিক ১৩ শতাংশে নেমেছে। শাকসবজি এবং চাল ও গমজাত পণ্যের মূল্যস্ফীতিতে অবদান কমে আসায় এ উন্নতি হয়েছে। তবে মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ও ডালের মতো প্রোটিনসমৃদ্ধ পণ্যের মূল্যচাপ এখনো রয়ে গেছে। প্রথম প্রান্তিকে খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে এসব পণ্যের অবদান ছিল ৫১ দশমিক ১ শতাংশ।
এ ছাড়া ভোজ্যতেল, মসলা ও রান্নার প্রয়োজনীয় উপকরণের মূল্যস্ফীতিতে অবদান বেড়েছে। ফলে খাদ্য মূল্যস্ফীতির সামগ্রিক হার কমলেও পরিবারের দৈনন্দিন খাদ্য ব্যয়ে কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি আসেনি।
আমদানিনির্ভর পণ্যে মূল্যচাপ বাড়ছে
দেশের মূল্যস্ফীতিতে আমদানিনির্ভর পণ্যের অবদানও বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, প্রথম প্রান্তিকে সার্বিক মূল্যস্ফীতিতে আমদানিনির্ভর খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের গড় অবদান বেড়ে ২৭ শতাংশ হয়েছে। আগের প্রান্তিকে এ হার ছিল ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ। বিপরীতে দেশীয় পণ্যের অবদান ৭৫ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ৭৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
এ সময়ে সেবা ও অপচনশীল পণ্যের অবদানও বেড়েছে। সার্বিক মূল্যস্ফীতিতে সেবার অবদান ১৯ দশমিক ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ এবং অপচনশীল পণ্যের অবদান ৪৪ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৭ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে।
বেশির ভাগ নিত্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে নির্বাচিত অধিকাংশ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের খুচরা ও পাইকারি দাম আগের প্রান্তিকের তুলনায় বেড়েছে। বিশেষ করে কাঁচামরিচ ও পেঁয়াজের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। খামারের ডিম ও আলুর দামও ছিল ঊর্ধ্বমুখী। তবে মাঝারি মানের চাল, সয়াবিন তেল ও সোনালি মুরগির দাম তুলনামূলকভাবে কমেছে।
সেপ্টেম্বরে ভোক্তা মূল্যসূচকের আওতাভুক্ত ৩৮২টি পণ্যের মধ্যে ২০৩টির দাম বেড়েছে, ২৫টির দাম কমেছে এবং ১৫৪টির দাম অপরিবর্তিত ছিল। অর্থাৎ কিছু পণ্যের দাম কমার প্রবণতা থাকলেও সামগ্রিক মূল্যস্তর এখনো উচ্চপর্যায়ে রয়েছে।
ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধারে প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, শুধু মূল্যস্ফীতির হার কমানোই সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ লাঘবের জন্য যথেষ্ট নয়। একই সঙ্গে মজুরি ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মাধ্যমে মানুষের প্রকৃত আয় বাড়াতে হবে। খাদ্য, বাসস্থান, পরিবহন, চিকিৎসা ও শিক্ষার মতো মৌলিক খাতে ব্যয়ের চাপ কমানো না গেলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর আর্থিক সংকট আরও গভীর হতে পারে।
ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে. মুজেরী বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমার ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেলেও সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতার উন্নতি এখনো নিশ্চিত হয়নি। বরং মজুরি বৃদ্ধির গতি মন্থর হওয়ায় আয়-ব্যয়ের ব্যবধান নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে।
তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি মানুষের আয় বৃদ্ধির গতি বাড়ানো না গেলে বাজারে দামের চাপ কমার সুফল সাধারণ পরিবারের কাছে পৌঁছানো কঠিন হবে।
সব মিলিয়ে, মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যানে কিছুটা উন্নতি হলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় তার প্রতিফলন এখনো সীমিত। আয় বৃদ্ধির গতি বাড়ানো, নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং জ্বালানি ও সেবার মূল্যচাপ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে মূল্যস্ফীতি কমার সুফল মানুষের ঘরে পৌঁছানো কঠিন হবে।
নিউজ বাংলা চ্যানেল