কূটনৈতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ গত জুলাইয়ে নয়াদিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশনের ফিল্ড অফিসার আশরাফ হোসেন যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। এর আগে নয়াদিল্লি, কলকাতা ও দুবাই মিশনে কর্মরত আরও তিন কর্মকর্তা তৃতীয় দেশে পাড়ি জমান। তাঁদের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে সরকারের কাছে এখনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই।
বিষয়টি নিয়ে দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার এম রিয়াজ হামিদুল্লাহর সঙ্গে একাধিকবার হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। উপহাইকমিশনার প্রীতি রহমানও এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সূত্রের দাবি, চার কর্মকর্তাই ছাত্রজীবনে বর্তমানে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের বিভিন্ন পদে ছিলেন। তাঁদের এভাবে দেশত্যাগের ঘটনায় সরকার বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে বলে জানা গেছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্রও বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। সূত্রটি জানায়, নয়াদিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশনের কনসুলার শাখায় কর্মরত আশরাফ হোসেন সপরিবারে দেশে ফেরার কথা জানিয়ে মিশন ত্যাগ করেন। তাঁর দেশে ফেরার জন্য টিকিটও করা হয়েছিল এবং মিশনে আনুষ্ঠানিক বিদায়ও নেন তিনি। কিন্তু পরে বাংলাদেশে না ফিরে গোপনে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। এরপর থেকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না এবং তিনি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আনুষ্ঠানিক কোনো রিপোর্টও দেননি।
কূটনৈতিক সূত্রের দাবি, আশরাফ হোসেনের যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার ক্ষেত্রে নয়াদিল্লি মিশনের দেওয়া নোট ভারবাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তিনি কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পেলেন এবং তাঁর জন্য মিশন থেকে কীভাবে নোট ভারবাল দেওয়া হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কূটনীতিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সংশ্লিষ্ট মিশনের সহযোগিতা ছাড়া এ ধরনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার সুযোগ সীমিত।
একইভাবে নয়াদিল্লি হাইকমিশনের উপপরিচালক (ডিডি) নাসিরউদ্দিনও যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেছেন বলে সূত্র জানিয়েছে। তিনি ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে দিল্লির হাইকমিশন থেকে দেশে ফেরেন। এরপর সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগ না দিয়ে সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। তাঁর যুক্তরাষ্ট্রের ভিসার ক্ষেত্রেও নয়াদিল্লি মিশনের কনসুলার শাখার মাধ্যমে নোট ভারবাল দেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কোনো কর্মকর্তা তৃতীয় দেশে যেতে চাইলে সংশ্লিষ্ট মিশনের নোট ভারবাল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পরবর্তী সময়ে যে দেশে যাওয়া হচ্ছে, সেই দেশের দূতাবাস ভিসা প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট মিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তাই নয়াদিল্লি থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া দুই কর্মকর্তার ক্ষেত্রে কীভাবে নোট ভারবাল দেওয়া হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কীভাবে এর অনুমোদন পেয়েছিলেন, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
কলকাতা ও দুবাই থেকেও দেশত্যাগ
কলকাতায় বাংলাদেশের উপহাইকমিশনে কর্মরত মাহমুদুল হাসান পলাশও ৫ আগস্টের পর দেশত্যাগ করেছেন বলে জানা গেছে। সূত্রের দাবি, সরকার পরিবর্তনের পর তিনি লন্ডনে চলে যান। পরে সেখান থেকে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের পক্ষে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সক্রিয় রয়েছেন। ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে আয়োজিত শেখ হাসিনার একটি অনলাইন সংবাদ সম্মেলনেও তিনি বক্তব্য দেন। ছাত্রজীবনে তিনি বুয়েটে ছাত্রলীগের পদধারী ছিলেন।
এ ছাড়া দুবাই মিশনে কর্মরত যুগ্ম পরিচালক বদরুল ইসলামও ৫ আগস্টের পর দুবাই থেকে অন্য একটি দেশে চলে গেছেন বলে জানা গেছে।
কূটনৈতিক সূত্রের মতে, বিদেশে কোনো মিশনের গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলোর একটি হলো কনসুলার শাখা। ভিসা, কনসুলার সেবা, সরকারি বিভিন্ন যোগাযোগ এবং নথিপত্রের কাজ এই শাখার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে এই শাখার দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের দেশত্যাগের প্রক্রিয়া এবং তৃতীয় কোনো দেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে মিশন থেকে নোট ভারবাল দেওয়ার বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিউজ বাংলা চ্যানেল