ঢাকা | খ্রি.

অর্থনীতি ভালো থাকার পরও মূল্যস্ফীতির চাপে ট্রাম্প, সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 28, 2026 ইং | Photo Card
অর্থনীতি ভালো থাকার পরও মূল্যস্ফীতির চাপে ট্রাম্প, সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন ছবির ক্যাপশন: ছবি সংগৃহীত
ad728
নিউজ বাংলা ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি অব্যাহত, বেকারত্বের হার তুলনামূলক কম এবং শেয়ারবাজারও রয়েছে প্রায় রেকর্ড উচ্চতায়। কিন্তু এসব ইতিবাচক সূচক সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ কমাতে পারছে না। মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে তাই এক জটিল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্র স্বস্তিদায়ক হলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চ দাম নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ তাঁর প্রশাসনের জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে।

এ ধরনের পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন নয়। ২০২৪ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলেন। অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক শক্তিশালী থাকা সত্ত্বেও অনেক ভোটারকে তিনি বোঝাতে পারেননি যে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তাঁদের অনুকূলে রয়েছে। এবার সেই ব্যবধানের ভিন্ন রূপ সামলাতে হচ্ছে ট্রাম্পকে।

২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প দ্রুত দ্রব্যমূল্য কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি জিতলে সাথে সাথে দাম কমিয়ে দেব।’ তবে ক্ষমতায় আসার পর সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন যে প্রত্যাশার তুলনায় কঠিন, তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে প্রকাশিত সর্বশেষ মুদ্রাস্ফীতির প্রতিবেদনেও দেখা গেছে, পণ্যের দাম এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ২ শতাংশ এবং বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ২ শতাংশে স্থিতিশীল। অন্যান্য উন্নত অর্থনীতির তুলনায় প্রবৃদ্ধির এই হারকে সম্মানজনক বলে বিবেচনা করা যায়। বেকারত্বের বর্তমান হারও অর্থনীতি ভেঙে পড়ার কোনো ইঙ্গিত দেয় না। তারপরও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সন্তুষ্টি ফিরছে না।

ট্রাম্পের দাবি, বাইডেনের কাছ থেকে তিনি দুর্বল অর্থনীতি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছেন। নিজের নীতির সাফল্যের প্রমাণ হিসেবে তিনি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ এবং শেয়ারবাজারের পারফরম্যান্সের কথা তুলে ধরছেন। তাঁর সহযোগী ও অর্থনৈতিক ভাষ্যকার ল্যারি কুডলো বর্তমান প্রবৃদ্ধিকে ‘কখনো না বলা সেরা গল্প’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর যুক্তি, ‘কারও চাকরি যাচ্ছে না।’

কিন্তু ভোটারদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। তাঁরা মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) কিংবা শেয়ারবাজারের রেকর্ড দিয়ে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিচার করার বদলে সুপারমার্কেটে পণ্যের দাম, পেট্রলের খরচ এবং মাসিক বিল পরিশোধের সামর্থ্যকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাঁদের কাছে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়েছে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।

আয় ও পণ্যমূল্যের ব্যবধানও মানুষের অসন্তোষের একটি কারণ। গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে গড় ঘণ্টাপ্রতি আয় বেড়েছে ৩ শতাংশ। একই সময়ে পণ্যের দাম বেড়েছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থাৎ মজুরি বৃদ্ধির গতি মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। অর্থনীতি পরিচালনায় ট্রাম্পের প্রতি ভোটারদের নেতিবাচক মূল্যায়নের পেছনে এই ব্যবধান ভূমিকা রাখছে।

ডেমোক্র্যাটদের কাছে বিষয়টি পরিচিত। প্রবীণ ডেমোক্র্যাটিক জরিপকারী সেলিন্ডা লেক মনে করেন, অর্থনীতিবিদ ও সাধারণ মানুষ ‘মুদ্রাস্ফীতি কমা’ কথাটিকে ভিন্নভাবে বোঝেন। তিনি বলেন, ‘অর্থনীতিবিদরা যখন বলেন মুদ্রাস্ফীতি কমেছে, তখন তাঁরা বোঝান যে মূল্যবৃদ্ধির হার কমেছে। আর ভোটাররা যখন বলেন মুদ্রাস্ফীতি কমেছে, তখন তাঁরা বোঝান যে দাম আগের জায়গায় ফিরে গেছে। কিন্তু বাস্তবে দাম তো আর কখনোই আগের জায়গায় ফিরে যায় না।’

লেকের মতে, মানুষ অর্থনীতির পরিসংখ্যানের চেয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে। তাঁর ভাষায়, ‘ভোটাররা অর্থনীতিকে তাঁদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে বিচার করেন, অর্থনৈতিক সূচক দিয়ে নয়। আপনি মানুষের বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার সাথে তর্ক করতে পারবেন না।’

মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে ট্রাম্পের পরিস্থিতি তাই বাইডেনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে অনেকটাই মিলে যাচ্ছে। বাইডেনের সমালোচকেরা তাঁর ওপর মূল্যস্ফীতির দায় চাপিয়েছিলেন। তবে মহামারি এবং এর কারণে সরবরাহব্যবস্থায় সৃষ্ট বিঘ্নের মতো নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরের বিষয়গুলোকে তিনি কারণ হিসেবে তুলে ধরতে পেরেছিলেন।

ট্রাম্পের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ তুলনামূলক কম। কয়েকজন অর্থনীতিবিদের মতে, বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির পেছনে তাঁর নিজের নীতিরও ভূমিকা রয়েছে। এর মধ্যে শুল্ক আরোপ এবং ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব উল্লেখযোগ্য।

রিপাবলিকানপন্থী হিসেবে পরিচিত ইউনিভার্সিটি অব ম্যারিল্যান্ডের অর্থনীতিবিদ পিটার মরিসি বলেন, ‘এই মুদ্রাস্ফীতি স্পষ্টতই ডোনাল্ড ট্রাম্পের কারণে হয়েছে। এটি তাঁর শুল্ক এবং যুদ্ধের ফল। মানুষ তা জানে। তারা তা দেখতে পাচ্ছে।’

২০২৫ সালের এপ্রিলে ট্রাম্পের ঘোষিত ‘লিবারেশন ডে’ শুল্ক ভোক্তাদের ব্যয় বাড়িয়েছে। ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, এসব শুল্কের কারণে ভোক্তা পণ্যের দাম প্রায় ২ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। পরবর্তী সময়ে ট্রাম্প কিছু শুল্ক স্থগিত করেন, নতুন বাণিজ্য চুক্তি করেন এবং জরুরি ক্ষমতা প্রয়োগ করে শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের বাধার মুখে পড়েন। এসব ঘটনা না ঘটলে শুল্কের প্রভাব আরও বেশি হতে পারত।

এরপর ইরানকে কেন্দ্র করে সংঘাতের কারণে তেলের দাম বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে পেট্রলের খরচে, যা পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়ের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে।

এ পরিস্থিতিতে হোয়াইট হাউস কর কমানো, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং প্রেসক্রিপশনের ওষুধের ব্যয় কমানোর মতো পদক্ষেপকে সাধারণ পরিবারের জন্য প্রশাসনের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে। একই সঙ্গে জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ কমাতে সহায়ক বিভিন্ন নীতি গ্রহণের উদ্যোগও বাড়াচ্ছে।

ট্রাম্প ক্রেডিট কার্ডের সুদের হারের ওপর সীমা নির্ধারণের আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের প্রত্যেককে ৫ হাজার ডলার দেওয়ার ধারণাও সামনে এনেছেন।

দুই দলের রাজনীতিতেই পরিচিত একটি বাস্তবতা এসব উদ্যোগে প্রতিফলিত হচ্ছে—দ্রব্যমূল্য নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগ বেশি থাকলে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি ও কম বেকারত্বের পরিসংখ্যান দিয়ে তাঁদের সন্তুষ্ট করা কঠিন। বাইডেন তাঁর সময়ে অর্থনৈতিক সাফল্যের পরিসংখ্যান ও সাধারণ মানুষের অনুভূতির মধ্যকার ব্যবধান দূর করতে পারেননি। এখন ট্রাম্পের সামনে একই প্রশ্ন: মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তিনি কি সেই ব্যবধান কমাতে পারবেন?

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের ইঙ্গিত হলো, অর্থনীতির প্রকৃত পরিসংখ্যানের পাশাপাশি—কিংবা তার চেয়েও বেশি—অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ভোটারদের ব্যক্তিগত ধারণা নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সূত্র: বিবিসি


নিউজটি পোস্ট করেছেন : নিউজ বাংলা চ্যানেল

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে জ্বালানি তেলের সংকট নেই: বিপিসি চেয়ারম

ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে জ্বালানি তেলের সংকট নেই: বিপিসি চেয়ারম