ঢাকা | খ্রি.

ডিসেম্বর ঘিরে আওয়ামী লীগের তৎপরতা, সতর্ক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Aug 29, 2026 ইং | Photo Card
ডিসেম্বর ঘিরে আওয়ামী লীগের তৎপরতা, সতর্ক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছবির ক্যাপশন: ছবি সংগৃহীত
ad728

নিউজ বাংলা ডেস্ক: গণ-অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাচ্যুত হয়ে রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকলেও ডিসেম্বরকে সামনে রেখে নতুন করে তৎপর হওয়ার চেষ্টা করছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সংগঠিত করা, বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো এবং বিভিন্ন এলাকায় আকস্মিক মিছিলের মাধ্যমে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে গোয়েন্দা সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

সূত্রের দাবি, ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে ঘিরে দেওয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক বার্তা ও দেশে ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সক্রিয় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। এ জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করা হচ্ছে। বিদেশে অবস্থানরত নেতাদের সঙ্গে এনক্রিপ্টেড অ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ রাখার কথাও জানা গেছে।

গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে একটি প্রতিবেদন সরকারের উচ্চপর্যায়ে দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি বা নাশকতার কোনো প্রচেষ্টা যাতে সংগঠিত হতে না পারে, সে বিষয়ে প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিভিন্ন এলাকায় ঝটিকা মিছিল

গত কয়েক সপ্তাহে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের নামে কয়েকটি ঝটিকা মিছিলের খবর পাওয়া গেছে। বনানী, ময়মনসিংহ, শরীয়তপুর, সাভার ও সুনামগঞ্জের ঘটনাগুলো বিশেষভাবে নজরে এসেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর।

ময়মনসিংহের গাঙ্গিনাপাড় এলাকায় যুবলীগের নেতাকর্মীদের ঝটিকা মিছিল ঠেকাতে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে কোতোয়ালি মডেল থানার ১ নম্বর পুলিশ ফাঁড়ির পুরো টিম প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফাঁড়ির ইনচার্জসহ ওই টিমে ২৭ জন সদস্য ছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তর থেকেও দেশের বিভিন্ন ইউনিটকে সতর্ক করে মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা

গোয়েন্দা সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকার পতনের পর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী আত্মগোপনে গেলেও তাদের সাংগঠনিক যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়নি। গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, গাজীপুর, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জের কিছু নেতাকর্মী বিদেশে অবস্থানরত নেতাদের সঙ্গে তুলনামূলক বেশি যোগাযোগ রাখছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

টেলিগ্রাম, ফেসবুক এবং বিভিন্ন এনক্রিপ্টেড যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে দলীয় বার্তা ছড়িয়ে নেতাকর্মীদের সক্রিয় রাখার চেষ্টা চলছে। ডিসেম্বরকে সামনে রেখে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সংগঠিত রাখাও এর অন্যতম লক্ষ্য বলে গোয়েন্দা সূত্রের দাবি।

এ ছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্যের আড়ালে দলীয় কর্মকাণ্ডে অর্থায়নের জন্য তহবিল গঠনের চেষ্টা চলছে বলেও সূত্রের দাবি।

আত্মগোপনে বিভিন্ন এলাকার নেতাকর্মী

রাজধানীর কয়েকটি আবাসিক ও অপরাধপ্রবণ এলাকায় আওয়ামী লীগপন্থি কিছু নেতাকর্মী আত্মগোপনে রয়েছেন বলে গোয়েন্দা তথ্যের বরাতে জানা গেছে। ভাটারা, বনশ্রী, আফতাবনগর, মহানগর আবাসিক, খিলক্ষেত, নিকুঞ্জ, মোহাম্মদপুর, বসিলা, কামরাঙ্গীরচর, শনির আখড়া, যাত্রাবাড়ী ও উত্তরা এলাকার নাম এ ক্ষেত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

দক্ষিণাঞ্চলের ভোলা, পটুয়াখালী, বরিশাল, পিরোজপুর, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা, ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়ার কিছু অপরাধী ও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ব্যক্তিও রাজধানীর এসব এলাকায় আত্মগোপনে থাকতে পারেন বলে গোয়েন্দাদের ধারণা।

নজর এড়াতে আত্মগোপনে থাকা ব্যক্তিদের কেউ রাইড শেয়ারিং বা অটোরিকশা চালাচ্ছেন, কেউ ব্যবসা করছেন। আবার কেউ বিউটি পার্লার, মোটরসাইকেলের শোরুম কিংবা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির আড়ালে অবস্থান করছেন বলে সূত্র জানিয়েছে। কিছু ব্যক্তি অনলাইন পোর্টাল ও ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রচার চালাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

পলাতক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ

দেশে থাকা নেতাকর্মীদের সঙ্গে বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের কয়েকজন শীর্ষ নেতার যোগাযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করেছে। তাদের মধ্যে ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামাল, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, নসরুল হামিদ বিপু, এনামুল হক শামীম, জাহাঙ্গীর আলম, নিক্সন চৌধুরী, নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন, নজরুল ইসলাম বাবু ও মহিউদ্দিন মহারাজের নাম এসেছে।

এদিকে নারায়ণগঞ্জের সাবেক আলোচিত নেতা শামীম ওসমানের একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে ডিসেম্বরকে সামনে রেখে নেতাকর্মীদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এসব যোগাযোগ বা কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক ব্যক্তির সম্পৃক্ততা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

বিস্ফোরক উদ্ধারে উদ্বেগ

সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিত্যক্ত অবস্থায় ককটেল ও বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের পাশাপাশি বিস্ফোরক ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম জব্দের ঘটনাও ঘটেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এসব ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।

গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, বিচ্ছিন্ন এসব ঘটনার আড়ালে কেউ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এ কারণে সম্ভাব্য নাশকতার বিষয়ে আগাম তথ্য সংগ্রহ ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

রাজনৈতিকভাবে ফিরে আসা কতটা সম্ভব

নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের জন্য দ্রুত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ফিরে আসা সহজ হবে না। দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে তৃণমূল পর্যন্ত বিভিন্ন নেতার বিরুদ্ধে ক্ষমতাকালীন কর্মকাণ্ডের অভিযোগ এবং জুলাই-আগস্টের সহিংসতার দায় নিয়ে জনমনে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তা রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের পথে বড় বাধা হতে পারে।

সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক আব্দুল কাইয়ুমের মতে, আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের হাতে থাকা অর্থ ব্যবহার করে কেউ কেউ অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করতে পারেন। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে দলটির প্রতি সমর্থনের ঘাটতির কারণে এ ধরনের প্রচেষ্টা সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম। তারপরও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে গোয়েন্দা তৎপরতা ও আগাম ব্যবস্থা জোরদারের প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) নাঈম আশফাক চৌধুরীও মনে করেন, কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হলে তা জাতীয় নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা আগের তুলনায় উন্নত হয়েছে এবং জনগণের সহযোগিতা থাকলে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধ করা সম্ভব।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও সমাজ-অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হকের মতে, ডিসেম্বরের মধ্যে আওয়ামী লীগের ফিরে আসার বক্তব্য মূলত দলীয় নেতাকর্মীদের মনোবল ধরে রাখা ও রাজনৈতিক অস্তিত্ব বজায় রাখার কৌশল হতে পারে। কারণ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর নির্দিষ্ট একটি সময়সীমা ঘোষণা করে দ্রুত রাজনৈতিকভাবে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হওয়া বাস্তবে অত্যন্ত কঠিন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। কোনো মহল বিশেষ উদ্দেশ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করছে কি না, সে বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনা হবে।

সব মিলিয়ে ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য রাজনৈতিক তৎপরতা, মাঠপর্যায়ের যোগাযোগ এবং বিচ্ছিন্ন মিছিলের ঘটনাগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে প্রশাসন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের আড়ালে যাতে সহিংসতা বা নাশকতার সুযোগ তৈরি না হয়, সে বিষয়েও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : নিউজ বাংলা চ্যানেল

কমেন্ট বক্স
অবশেষে হরমুজ পাড়ি দিল ‘বাংলার জয়যাত্রা’

অবশেষে হরমুজ পাড়ি দিল ‘বাংলার জয়যাত্রা’