অভিযোগ রয়েছে, রাজউকের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে যোগসাজশের কারণে জমি উদ্ধারের উদ্যোগ থমকে আছে। ফলে দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি মূল্যের সম্পত্তিটি এখনো বেদখল অবস্থায় রয়েছে।
নথিপত্র পর্যালোচনায় জানা যায়, ১৯৬২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) আবাসিক প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বাড্ডা মৌজায় সিএস দাগভুক্ত ১১ একর জমি অধিগ্রহণ করে। ঢাকা জেলা প্রশাসনের এলএ কেস নম্বর ১৩৮/৬১-৬২-এর আদেশে ওই বছরের ২৫ এপ্রিল জমির দখল ডিআইটির কাছে হস্তান্তর করা হয়। তৎকালীন টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট-১৯৫৩-এর ৯৩-এ ধারা অনুসরণ করেই অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়। সরকারি ক্ষমতাবলে জমির দখল নেওয়ার পর ডিআইটির অনুকূলে ‘দখল হস্তান্তর সনদ’ও দেওয়া হয়। পরে ১৯৮৭ সালে আইন সংশোধনের মাধ্যমে ডিআইটির নাম পরিবর্তন করে রাজউক করা হয়।
জানা যায়, ২০০৫ সালে জমিটি দখলে রাখার উদ্দেশ্যে দেলোয়ার হোসেন ব্যাপারী নামে এক ব্যক্তি হাইকোর্টে রিট করেন। একই বছর রাজউকের আলোচিত ম্যাজিস্ট্রেট রোকন উদ-দৌলা জমিটি দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ অভিযান চালান। ওই অভিযানে ক্ষুব্ধ ব্যক্তিরা পরে হাইকোর্টে আরেকটি রিট করেন। এরপর ২০০৭ সালে মেরুল কাঁচাবাজার সমিতিও রিট করে। এভাবে পর্যায়ক্রমে জমিটি নিয়ে রাজউকের বিরুদ্ধে মোট পাঁচটি রিট মামলা হয়।
অভিযোগকারীদের দাবি, এত বড় জমি বেদখলে থাকলেও তা উদ্ধারে রাজউকের তেমন আগ্রহ নেই। ২১ বছরেও রিট মামলাগুলোর কোনো নিষ্পত্তি হয়নি। জমিতে থাকা বিভিন্ন আড়ত থেকে প্রতি মাসে যে অর্থ আদায় হয়, তার একটি অংশ রাজউকের কিছু অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারী পান বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, রামপুরা ব্রিজ থেকে কিছুটা দূরে মূল সড়কের পাশেই রয়েছে বাঁশের আড়ত। এরপর রয়েছে মেরুল কাঁচাবাজার। সেখানে টিনের ছোট একটি ঘরে ‘মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতি ও মেরুল সোনার বাংলা মৎস্য আড়ত’-এর কার্যালয়। এর পাশেই গড়ে উঠেছে বড় একটি বস্তি। ১১ একর জমির কাছাকাছি রয়েছে ইস্ট-ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি ও মেরুল বায়তুল জামে মসজিদ।
রাজউক জমিটির মালিকানা দাবি করলেও সরেজমিনে সেখানে ব্যক্তিমালিকানার দাবিতে একটি সাইনবোর্ড দেখা যায়। এতে জমির আমমোক্তার হিসেবে মোহাম্মদ শরীফ ভূইয়া ও বাবু চন্দ্র দাসের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। সাইনবোর্ডে জমির দাগ হিসেবে সিএস ও এসএ-১২৪৩, আরএস-৩০৩৯ এবং সিটি-১৫০০৯ নম্বর দেওয়া রয়েছে। সেখানে মোট জমির পরিমাণ ২৭ দশমিক ৫০ শতাংশ উল্লেখ করা হয়েছে।
মেরুল বাড্ডার জমি উদ্ধার ও রিট মামলা নিয়ে রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ডে হতাশা প্রকাশ করেছেন রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলাম। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘রাজউকের বিরুদ্ধে এমন অসংখ্য রিট মামলা রয়েছে। মামলা চালানোর জন্য আইনজীবী নিয়োগ করা আছে। রাজউকের বহু কর্মকর্তা আছেন, যারা কাজ করতে চান না। কারণ, তারা কাজ না করলেই তাদের লাভ। এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে চাচ্ছি না।’
জমি ঘিরে আরেক চক্রের বিরুদ্ধে ৩০০ কোটি টাকা হাতানোর অভিযোগ
রাজউকের এই জমিকে কেন্দ্র করে আরও একটি চক্রের বিরুদ্ধে প্রায় ছয় হাজার সাধারণ মানুষকে প্রতারণার মাধ্যমে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। জমির ওপর ‘মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতি’র নামে ১ একর ৮৯ শতাংশ জমি বরাদ্দের দাবিতে একটি সাইনবোর্ডও টানানো হয়েছে। ১৯৮৮ সালে যাত্রা শুরু করা সমিতিটির সদস্যসংখ্যা ধাপে ধাপে প্রায় ছয় হাজারে পৌঁছেছে।
জমিতে ব্যবসা করা এক মুদি দোকানি জানান, জমিটির মালিকানা নিয়ে থাকা আইনি জটিলতা ও অস্পষ্টতাকে কাজে লাগিয়ে একটি প্রভাবশালী চক্র ‘মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতি’ গঠন করে। সাইনবোর্ড টাঙিয়ে তারা প্রচার করে, সেখানে আধুনিক কাঁচাবাজার ও মার্কেট নির্মাণ করা হবে এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা কম দামে দোকান পাবেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সমিতির সদস্যরা দোকান পাননি। বরং তাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে।
২০১০ সালের ৮ মার্চ সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এ কে এম মিজানুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক মো. মনিরুজ্জামান মনির এবং অর্থ সম্পাদক ফেরদৌস আহমেদের স্বাক্ষর করা এক নোটিশে প্রত্যেক সদস্যকে মামলা পরিচালনা ও অন্যান্য খরচ বাবদ এককালীন ১ হাজার টাকা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই নোটিশে মৃত বা অন্যত্র চলে যাওয়া সদস্যদের সদস্যপদ ওয়ারিশ কিংবা অন্য ব্যক্তির নামে হস্তান্তরের সুযোগ রাখা হয়। এজন্য ২ হাজার টাকা করে নেওয়ার কথা বলা হয়। বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের নোটিশ দিয়ে সদস্যদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
স্থায়ী দোকান পাওয়ার আশায় প্রায় ছয় হাজার মানুষ তাদের সঞ্চয় সমিতির কাছে জমা দেন। রসিদ ও বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে ধাপে ধাপে তাদের কাছ থেকে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০০৫ সালের দিকে বিতর্কিত ওই জমিতে রাজউক উচ্ছেদ অভিযান চালালে সমিতির কার্যক্রমও থমকে যায়। বিষয়টি প্রকাশ্যে চলে আসার আশঙ্কায় সদস্যদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয় এবং তারা চাঁদা দেওয়া বন্ধ করে দেন। তবে এরপরও সমিতির কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। রাজউকের আইনি জটিলতা শিগগিরই শেষ হবে—এমন আশ্বাস দিয়ে সমিতির কার্যক্রম মেরুল বাড্ডা থেকে মতিঝিলে সরিয়ে নেওয়া হয়। সেখানে রসিদের মাধ্যমে চাঁদা ও কিস্তির টাকা আদায় আবারও চলতে থাকে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, রাজউকের চোখের সামনে একটি ভুয়া সমিতি দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল অর্থ সংগ্রহ করেছে। বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে প্রতিকার পেতে রাজপথ ও আইনি পথে ঘুরছে।
তাদের দাবি, ভুয়া ‘দোকানদার সমিতি’র পেছনে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি প্রায় ৩০০ কোটি টাকার হিসাব উদ্ধার করে ক্ষতিগ্রস্ত সদস্য ও তাদের উত্তরসূরিদের অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতির সদস্য মো. হুমায়ুন কবির বলেন, ‘মেরুল বাড্ডার মতো এলাকায় নিজের একটা দোকান হবে, সেই আশায় সমিতির সদস্য হয়েছি। মাসে মাসে টাকা পরিশোধ করেছি। দীর্ঘ ১৬ বছরেও দোকান মেলেনি। উল্টো সমিতিতে সদস্যদের টাকা লুট হয়েছে। সমিতির পাঁচ হাজার সদস্যের প্রায় ৩০০ কোটি টাকা উধাও।’
আরেক সদস্য মো. রবিউল ইসলাম (সুজন) বলেন, ‘একটি দুষ্টচক্রের খপ্পরে পড়ে মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতির সদস্য হয়েছি। দীর্ঘ ২০ বছরে সমিতিতে প্রায় ৫ লাখ টাকা পরিশোধ করেছি। দোকান পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, এজন্য সমিতিতে কিস্তি দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। তবে, আমার জমানো টাকার হদিস নেই সমিতিতে।’
সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহীন বলেন, ‘১৯৮৮ সালে সমিতি যাত্রা শুরু হয়েছিল। একটানা ৩০ বছর পর্যন্ত সমিতির সদস্যরা চাঁদা দিয়েছেন। কিন্তু, তাদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। ফলে গত ১০ বছর সমিতির সমস্ত কার্যক্রম সম্পূর্ণ থমকে আছে। এর পেছনে মূল কারণ—আমাদের সমিতিতে ঘটে যাওয়া অনিয়ম এবং কোটি কোটি টাকা লুটপাট।’
তিনি আরও বলেন, ‘সমিতির সাইনবোর্ড দেওয়া জমি রাজউকের। রাজউকের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার পরও ‘শংকর’ নামের একপক্ষ জমির দাবি তুলে মামলা ঝুলিয়ে রেখেছে।’
শাহীন জানান, মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত রাজউক সমিতিকে জমি বুঝিয়ে দেবে না। তার ভাষ্য, রাজউকের সঙ্গে তারা দীর্ঘদিন আইনি লড়াই করেছেন এবং ২০০৫ সালে রাজউকের আলোচিত ম্যাজিস্ট্রেট রোকন উদ-দৌলার উচ্ছেদ অভিযানের বিরুদ্ধে ২৫ কোটি টাকার মামলা করা হয়েছে।
সূত্র: কালবেলা
নিউজ বাংলা চ্যানেল