সোমবার বোয়ালমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মোস্তাফিজুর রহমান সংঘর্ষের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, পুনরায় সংঘাতের আশঙ্কায় এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। জিহাদের ওপর হামলার ঘটনায় দুইজনকে আটক করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বোয়ালমারী উপজেলার পরমেশ্বরদী ইউনিয়নের ময়েনদিয়া বাজারটি বোয়ালমারী ও সালথা উপজেলার সীমান্ত এলাকায় অবস্থিত। বাজারের নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে পরমেশ্বরদী ইউনিয়নের বরখাস্তকৃত চেয়ারম্যান (৫ আগস্টের পর) এবং আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপিতে যোগ দেওয়া আব্দুল মান্নান মাতুব্বরের সঙ্গে সালথা উপজেলার খাড়দিয়া গ্রামের বিএনপি নেতা মুশফিক বিল্লাহ জিহাদের দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। জিহাদ মানবতাবিরোধী মামলায় সাজাপ্রাপ্ত সাবেক জামায়াত নেতা আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চুর ছেলে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধ আরও প্রকট হয়। ওই সময়ে মুশফিক বিল্লাহ জিহাদের অনুসারীদের বিরুদ্ধে আব্দুল মান্নান মাতুব্বর ও তার ভাই সিদ্দিক মাতুব্বরের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ ওঠে। এরপর মান্নান মাতুব্বর ও তার পক্ষের লোকজন এলাকা ছেড়ে গেলে বাজারের নিয়ন্ত্রণ জিহাদপন্থীদের হাতে চলে যায়।
পরবর্তীতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মান্নান মাতুব্বর ও তার অনুসারীরা এলাকায় ফিরে আসেন। এতে বাজারের নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্যকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে আবারও উত্তেজনা তৈরি হয়।
এরই মধ্যে গত শুক্রবার ময়েনদিয়া দাইপাড়া এলাকায় একটি দোকানে হামলার অভিযোগ ওঠে। ব্যবসায়ীদের দাবি, জিহাদের কয়েকজন সমর্থক এতে জড়িত ছিলেন। পরদিন শনিবার ময়েনদিয়া বাজারে জিহাদপন্থী যুবদল নেতা সোলায়মান মাতুব্বরের সঙ্গে স্থানীয় কয়েকজনের বাগ্বিতণ্ডা হয়। এ সময় এক ইলেকট্রনিক্স ব্যবসায়ীর কাছে ৪ হাজার টাকা চাঁদা চাওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরে ব্যবসায়ী ও স্থানীয়রা সেখানে জড়ো হলে হাতাহাতি হয় এবং সোলায়মান আহত হন।
খবর পেয়ে জিহাদ বাজারে গিয়ে সোলায়মানকে উদ্ধার করে একটি ফার্মেসিতে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। জিহাদের অভিযোগ, পরে রামদা, চাইনিজ কুড়াল ও লোহার পাইপসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে একদল ব্যক্তি সেখানে ঢুকে তার ওপর হামলা চালায়। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। এ ঘটনায় আব্দুল মান্নান মাতুব্বর ও তারা মিয়ার নেতৃত্বে কয়েকজনকে দায়ী করেন জিহাদ।
তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জিহাদপন্থী যুবদল নেতা মাহবুব হাসান সজিব। তার দাবি, দীর্ঘদিন ধরে আব্দুল মান্নান মাতুব্বর বাজারে প্রভাব বিস্তার করে আসছিলেন। বাজারকে তার প্রভাবমুক্ত রাখতে মুশফিক বিল্লাহ জিহাদকে উপদেষ্টা করা হয়েছিল। শনিবার মান্নান মাতুব্বরের লোকজন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা করলে জিহাদ ও সোলায়মান আহত হন বলে দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে, বাজারের ব্যবসায়ী মজিবর রহমান মোল্যা অভিযোগ করেন, জিহাদ লোকজন নিয়ে এলাকায় এসে হামলা চালান। সাধারণ দোকানি ও স্থানীয়দের কাছ থেকে চাঁদা চাওয়া এবং চাঁদা না দিলে মারধর ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি। ব্যবসায়ী মাওলানা মাসুদুর রহমানও কয়েকজনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজির অভিযোগ করেন। তার ভাষ্য, শনিবারও এক ব্যবসায়ীর কাছে ৪ হাজার টাকা দাবি করা হয়েছিল।
আব্দুল মান্নান মাতুব্বর ও তারা মিয়ার বক্তব্য জানতে তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তাদের বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
শনিবারের ঘটনার পরদিন রবিবার বিকেল ৪টার দিকে পরমেশ্বরদী ইউনিয়নের ধুলজোড়া ব্রিজ এলাকায় দুই পক্ষের লোকজন সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। প্রায় সাড়ে সাত ঘণ্টা ধরে বিকেল থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত কয়েক দফায় সংঘর্ষ চলে। একপর্যায়ে আশপাশের এলাকাতেও সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে এবং পরিস্থিতি রণক্ষেত্রের রূপ নেয়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, সালথার খাড়দিয়া গ্রামের হুমায়ন খাঁ, রফিক মোল্যা ও ইলিয়াস কাজীর নেতৃত্বাধীন এক পক্ষের সঙ্গে বোয়ালমারীর ময়েনদিয়ায় আব্দুল মান্নান মাতুব্বরের পক্ষের লোকজনের সংঘর্ষ হয়। এতে দুই পক্ষের অন্তত ৩০ জন আহত হন।
আহতদের বোয়ালমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। গুরুতর আহত পরমেশ্বরদী গ্রামের বাচ্চু মোল্যার ছেলে কবির মোল্যা, হাশেম মোল্যার ছেলে কামরুল মোল্যা এবং মনসুর মোল্যার ছেলে লোকমান মোল্যাকে প্রাথমিক চিকিৎসার পর ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
বোয়ালমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. ইজাজ আহমেদ শাওন জানান, রবিবার সন্ধ্যার পর কয়েকজন আহত ব্যক্তি হাসপাতালে আসেন। তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। গুরুতর অবস্থায় থাকা তিনজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
সংঘর্ষের পর ময়েনদিয়া বাজার ও আশপাশের এলাকায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। স্থানীয়দের মধ্যে আবারও সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আতঙ্কে রয়েছেন ব্যবসায়ীরাও। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শনিবার থেকেই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
সোমবার সকালে ওসি মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, জিহাদের ওপর হামলার ঘটনায় অভিযোগ পাওয়ার পর গতকাল দুইজনকে আটক করা হয়েছে। পরে দুই পক্ষের সংঘর্ষের খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।
নিউজ বাংলা চ্যানেল