এই পরিস্থিতিতে মেধা পাচার ঠেকানোর প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের জ্ঞান ও দক্ষতাকে দেশের কাজে ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে সরকার। এ উদ্যোগকে বলা হচ্ছে ‘ব্রেইন সার্কুলেশন’ বা ‘মেধা আবর্তন’।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তব্যে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, সরকার প্রথমবারের মতো মেধা পাচারকে মেধা আবর্তনে পরিণত করার কথা বিবেচনা করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এ পরিকল্পনার আওতায় ভিজিটিং স্কলার কর্মসূচি, যৌথ গবেষণা এবং বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তবে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে, মেধাবীদের দেশ ছাড়ার পেছনে যেসব কারণ কাজ করছে, সেগুলো পরিবর্তন না করে শুধু দেশে ফেরার আহ্বানের মাধ্যমে এই প্রবণতা কতটা বদলানো সম্ভব।
ইউনেস্কোর একটি গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য বাংলাদেশ থেকে বিদেশে গিয়েছিলেন ২৪ হাজার ১১২ জন। এক দশক পর ২০২৩ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে ৫২ হাজার ৭৯৯ জনে পৌঁছায়। অর্থাৎ ১০ বছরে বিদেশমুখী শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১১৯ শতাংশ বেড়েছে। শুধু ২০২২ সালেই বিদেশে পাড়ি জমান ৪৯ হাজার ১৫১ জন। অন্য একটি পরিসংখ্যান বলছে, ওই বছর বিদেশে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৬৯ হাজারের বেশি ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রেও বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়ছে। ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে দেশটির বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১৭ হাজার ৯৯ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছিলেন। আগের শিক্ষাবর্ষের তুলনায় এই সংখ্যা ২৬ শতাংশ বেশি। এক দশকের হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে ২৫০ শতাংশেরও বেশি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, উচ্চ বেতনের পাশাপাশি উন্নত গবেষণাগার, আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা, গবেষণা অনুদান, আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্ক, পেশাগত স্বাধীনতা এবং দক্ষতার যথাযথ মূল্যায়ন—এসব কারণেও অনেকে বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী জাহিদ রহমানের ভাষ্য, দেশটিতে গবেষণায় বড় ধরনের বিনিয়োগ এবং উদ্ভাবনী কাজে উৎসাহ দেওয়া হয়। ফলে শিক্ষার্থীদের নতুন কিছু করার আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, মেধাবী তরুণেরা কেন দেশ ছাড়ছেন, শুধু সেটি জানলেই হবে না; তাঁরা কেন দেশে ফিরতে আগ্রহী নন, সেটিও চিহ্নিত করা জরুরি। একই সঙ্গে এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ঘাটতিও রয়েছে। প্রতিবছর কতজন শিক্ষার্থী বিদেশে যাচ্ছেন, তাঁদের মধ্যে কতজন পড়াশোনা শেষে দেশে ফিরছেন এবং কতজন স্থায়ীভাবে বিদেশে থেকে যাচ্ছেন—এসব তথ্য সংরক্ষণে একটি সমন্বিত ও হালনাগাদ জাতীয় ডাটাবেজ প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম বলেন, উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়া শিক্ষকদের একটি বড় অংশ আর দেশে ফেরেন না। বিদেশে যাওয়া মেধাবীদের দেশে ফেরাতে হলে তাঁদের জন্য বিদেশের মতো সুযোগ-সুবিধা তৈরি করতে হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চীন ও ভারত বিদেশে থাকা নিজেদের মেধাবীদের দেশের উন্নয়নে যুক্ত করতে বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছে। গবেষণা অনুদান ও প্রণোদনার পাশাপাশি প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের সুযোগ এবং প্রবাসী গবেষক ও পেশাজীবীদের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছে দেশ দুটি।
বাংলাদেশও একই ধরনের উদ্যোগ নিতে চায়। বিদেশে থাকা প্রত্যেক বাংলাদেশিকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব না হলেও তাঁদের জ্ঞান, পুঁজি, প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ দেশের উন্নয়নে কীভাবে ব্যবহার করা যায়, সেই পথ খুঁজছে সরকার।
নিউজ বাংলা চ্যানেল