নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ স্বাক্ষরিত নতুন বিধিমালার গেজেট সম্প্রতি প্রকাশ করা হয়েছে। এতে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী ও সমর্থকদের প্রচারণা এবং নির্বাচনী ব্যয়ের ওপর বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ করা হয়েছে। আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৬ মাসের কারাদণ্ড, ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। গুরুতর বিধিভঙ্গের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিলও করতে পারবে ইসি।
নতুন বিধিমালার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো নির্বাচনী প্রচারে পোস্টার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা। কোনো প্রার্থী বা তার সমর্থক পোস্টার ঝোলাতে বা সাঁটাতে পারবেন না। পাশাপাশি ভবন, দেয়াল, গাছপালা, বেড়া, বিদ্যুতের খুঁটি, সেতু, কালভার্ট ও সরকারি স্থাপনাসহ বিভিন্ন স্থানে প্রচারসামগ্রী ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধ থাকছে।
তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল গেজেটে প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত কোনো ধরনের প্রকাশ্য মিছিল করা যাবে না। বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেল, নৌযান কিংবা ট্রেন ব্যবহার করেও মিছিল বা শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নির্বাচনী প্রচারে হেলিকপ্টারসহ যেকোনো ধরনের আকাশযান ব্যবহারও পুরোপুরি নিষিদ্ধ।
তবে অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণার সুযোগ রাখা হয়েছে। এ ধরনের প্রচার শুরু করার আগে কোন কোন প্ল্যাটফর্ম বা মাধ্যম ব্যবহার করা হবে, তা রিটার্নিং কর্মকর্তাকে লিখিতভাবে জানাতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারের জন্য যে অর্থ ব্যয় হবে, সেটিও প্রার্থীর মোট নির্বাচনী ব্যয়ের অংশ হিসেবে গণ্য হবে।
ডিজিটাল প্রচারণায় এআইয়ের অপব্যবহার ঠেকাতেও নতুন বিধিমালায় স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। প্রার্থী বা তার সমর্থকরা নির্বাচনসংক্রান্ত মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর, বিদ্বেষমূলক কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণাত্মক বক্তব্য প্রচার করতে পারবেন না। নির্বাচনবান্ধব পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—এমন কনটেন্ট তৈরি ও প্রচারের ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
ভোটারদের প্রভাবিত করার জন্য অর্থ লেনদেন, খাবার বা পানীয় পরিবেশন এবং উপহারসামগ্রী বিতরণের ক্ষেত্রেও কঠোর বিধিনিষেধ রাখা হয়েছে। ধর্মীয় উপাসনালয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি কার্যালয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালানো যাবে না। একই সঙ্গে ধর্মের অপব্যবহার, পেশিশক্তির প্রয়োগ এবং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর বিরুদ্ধে কুৎসা বা ব্যক্তিগত চরিত্রহননমূলক প্রচার নিষিদ্ধ থাকবে।
সরকারি সুযোগ-সুবিধা কাজে লাগিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সরকারি যানবাহন, মাইক কিংবা অন্য কোনো সরকারি সম্পদ প্রচারে ব্যবহার করা যাবে না। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
নির্বাচনের দিন ভোটারদের আনা-নেওয়ার জন্য কোনো ধরনের যানবাহন ভাড়া বা ব্যবহার করা যাবে না। নির্বাচনী প্রচারের সময় ক্যাম্প স্থাপন এবং মাইক ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত সীমা ও নিয়ম অনুসরণ করতে হবে।
আচরণবিধি বাস্তবায়নে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতাও বাড়ানো হয়েছে। কোনো প্রার্থী বা তার নির্বাচনী এজেন্ট বিধিমালা ভঙ্গ করেছেন বা ভঙ্গের চেষ্টা করছেন বলে মনে হলে ইসি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে এবং অপরাধ গুরুতর হিসেবে বিবেচিত হলে প্রার্থিতা বাতিলের সুযোগও থাকবে।
এ ছাড়া নির্ধারিত নির্বাচনী ব্যয়সীমা অতিক্রম করা, অর্থ বা পেশিশক্তি ব্যবহার করে ভোটারদের প্রভাবিত করা এবং সরকারি সম্পদের অপব্যবহার করে প্রচারণা চালানোকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে।
নতুন আচরণবিধির মাধ্যমে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও প্রতিযোগিতামূলক করার পাশাপাশি প্রার্থীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। বিশেষ করে পোস্টার, মিছিল ও শোডাউন নিষিদ্ধ করা এবং ডিজিটাল মাধ্যমে এআইনির্ভর বিভ্রান্তিকর প্রচারণা ঠেকানোর বিধান এবারের নির্বাচনী প্রচারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনবে।
নিউজ বাংলা চ্যানেল