নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের ইসলামী ব্যাংকিং খাতে আমানতের পরিমাণ বাড়লেও প্রবৃদ্ধির গতি প্রচলিত ব্যাংকের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্টে ইসলামী ব্যাংকগুলোতে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৭৫ হাজার ১২৩ কোটি টাকা। এক বছর আগে, ২০২৫ সালের আগস্টে এই পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৬২ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরে আমানত বেড়েছে ১২ হাজার ৮৩৯ কোটি টাকা বা ২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। একই সময়ে প্রচলিত ব্যাংকগুলোতে আমানত বেড়েছে ১৪ দশমিক ১৩ শতাংশ।
আমানত বৃদ্ধির এই ব্যবধান দেশের ব্যাংকিং খাতে ইসলামী ব্যাংকগুলোর প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে সামগ্রিক ইসলামী ব্যাংকিং খাতে আমানত বাড়লেও পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর আমানত কমে যাওয়ার চিত্র উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ইসলামী ও প্রচলিত ব্যাংকিং খাতের আমানত, বিনিয়োগ, সম্পদ, প্রবাসী আয়, রপ্তানি আয় ও আমদানি ব্যয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর ইসলামী ব্যাংকিং খাতে সৃষ্ট অস্থিতিশীলতা আমানতকারীদের আস্থা ও অর্থ জমা রাখার প্রবণতায় প্রভাব ফেলেছে। বিপরীতে আমানত সংগ্রহে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে প্রচলিত ব্যাংকগুলো।
আমানতে বড় ব্যবধান
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্টে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে প্রচলিত ব্যাংকগুলোর আমানত ১৮ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা, যা মোট আমানতের ৭৯ দশমিক ২৪ শতাংশ। অন্যদিকে ইসলামী ব্যাংকগুলোর আমানত ৪ লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি, যা মোট আমানতের ২০ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
প্রচলিত ব্যাংকগুলোতে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে আমানতের পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ৮১ হাজার কোটি টাকা। আগস্টে তা বেড়ে ১৮ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়ায়। এক মাসে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১ দশমিক ৮০ শতাংশ। ২০২৫ সালের আগস্টে এই আমানতের পরিমাণ ছিল ১৫ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে আমানত বেড়েছে প্রায় ১৪ দশমিক ১৩ শতাংশ।
অন্যদিকে ইসলামী ব্যাংকগুলোর আমানত ২০২৬ সালের জুলাইয়ের ৪ লাখ ৬৮ হাজার ৯০০ কোটি টাকা থেকে আগস্টে বেড়ে ৪ লাখ ৭৫ হাজার ১২৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এক মাসে আমানত বেড়েছে ৬ হাজার ২২৩ কোটি টাকা বা ১ দশমিক ৩১ শতাংশ।
অর্থাৎ মাসিক হিসাবে ইসলামী ব্যাংকিং খাতে আমানত বৃদ্ধির ইতিবাচক ধারা থাকলেও বার্ষিক প্রবৃদ্ধিতে প্রচলিত ব্যাংকগুলোর তুলনায় বড় ব্যবধান রয়েছে। এ ব্যবধান শুধু আমানতের পরিমাণে নয়, গ্রাহকদের আস্থা ও ব্যাংকগুলোর অর্থ সংগ্রহের সক্ষমতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকে আমানত কমেছে
প্রতিবেদনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, ইসলামী ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক আমানত বাড়লেও পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর আমানত এক বছরে কমেছে।
২০২৫ সালের আগস্টে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর আমানত ছিল ৩ লাখ ৯৮ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকা। ২০২৬ সালের আগস্টে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৯২ হাজার ৫০৬ কোটি টাকায়। এক বছরের ব্যবধানে আমানত কমেছে ৬ হাজার ২৮১ কোটি টাকা বা ১ দশমিক ৬৯ শতাংশ।
এর বিপরীতে প্রচলিত ব্যাংকের ইসলামী ব্যাংকিং শাখা ও উইন্ডোগুলোতে আমানত উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। প্রচলিত ব্যাংকের ইসলামী ব্যাংকিং শাখাগুলোতে আমানত ২০২৫ সালের আগস্টের ৩৮ হাজার ৯৮১ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০২৬ সালের আগস্টে ৫১ হাজার ৬৬১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এক বছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩২ দশমিক ৫৩ শতাংশ।
একই সময়ে প্রচলিত ব্যাংকের ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডোগুলোতে আমানত ২৪ হাজার ৫১৬ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৩১ হাজার ৪১২ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এতে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৮ দশমিক ১৩ শতাংশ।
এ পরিসংখ্যান বলছে, ইসলামী ব্যাংকিং সেবার আওতায় মোট আমানত বৃদ্ধির পেছনে প্রচলিত ব্যাংকের ইসলামী শাখা ও উইন্ডোগুলোর অবদান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিপরীতে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর আমানত কমে যাওয়ায় খাতটির সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির প্রকৃতি ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা নিয়ে আলাদা মূল্যায়নের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
আস্থা ফেরানোই বড় চ্যালেঞ্জ
খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, ইসলামী ব্যাংকিং খাতে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হলে আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, ব্যাংকিং সেবার মান উন্নত করা এবং আমানত উত্তোলন ও স্বাভাবিক লেনদেনের পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে আমানত কমে যাওয়ার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংকিং খাতে আমানত সংগ্রহের ক্ষেত্রে গ্রাহকের আস্থা, সেবার মান, অর্থ উত্তোলনের সক্ষমতা এবং আমানতের নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা বা সেবার সক্ষমতা নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হলে তা আমানত প্রবাহে প্রভাব ফেলতে পারে।
পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর আমানত কমে যাওয়ার বিষয়টি তাই সামগ্রিক ইসলামী ব্যাংকিং খাতের প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি পৃথকভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। প্রচলিত ব্যাংকের ইসলামী শাখা ও উইন্ডোগুলোতে আমানত দ্রুত বাড়লেও পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোতে বিপরীত প্রবণতা কেন দেখা যাচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আমানতকারীদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, গ্রাহকসেবার মান বাড়ানো এবং আমানত উত্তোলন ও লেনদেনে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা দূর করার মাধ্যমে এ খাতের প্রবৃদ্ধি জোরদার করা সম্ভব। অন্যথায় সামগ্রিক ইসলামী ব্যাংকিং খাতে আমানত বাড়লেও পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর আমানত সংগ্রহের সক্ষমতা ও বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যেতে পারে।
নিউজ বাংলা চ্যানেল