ঢাকা | খ্রি.

আইনশৃঙ্খলার অবনতিতে বাধাগ্রস্ত বিনিয়োগ, বাড়ছে জননিরাপত্তার উদ্বেগ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 19, 2026 ইং | Photo Card
আইনশৃঙ্খলার অবনতিতে বাধাগ্রস্ত বিনিয়োগ, বাড়ছে জননিরাপত্তার উদ্বেগ ছবির ক্যাপশন: ছবি সংগৃহীত
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরলেও নিয়ন্ত্রণে আসছে না আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। একের পর এক হত্যাকাণ্ড, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, অপহরণ ও সশস্ত্র হামলার ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে বাড়ছে নিরাপত্তাহীনতা। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকারের নানা উদ্যোগের মধ্যেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি বিনিয়োগকারীদের আস্থার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের সক্ষমতা, মনোবল ও চেইন অব কমান্ড নিয়ে প্রশ্নের পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর দপ্তর ও মাঠ প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয়হীনতার বিষয়টিও সামনে এসেছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে উপস্থাপিত তুলনামূলক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট ১ লাখ ৫১ হাজার ৫৯৬টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩৭ হাজার ৮০৬। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মামলা বেড়েছে ১৩ হাজার ৭৯০টি। তবে মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি মানেই সব ধরনের অপরাধের প্রকৃত সংখ্যা একই হারে বেড়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। মামলা না হওয়া অপরাধের ঘটনাও পরিস্থিতির সামগ্রিক মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতার প্রভাব পড়ছে জনজীবনের পাশাপাশি দেশের বিনিয়োগ পরিবেশেও। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছেন। বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতিও পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু বিনিয়োগের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি নিরাপদ ব্যবসায়িক পরিবেশ, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। এসব ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা থাকলে নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণে পিছিয়ে যেতে পারেন দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তারা।

অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে ঢাকায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলনে ৫২টি দেশের বিনিয়োগকারীরা ৩২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। তখন বিনিয়োগকারীরা নির্বাচিত সরকার গঠনের পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বিনিয়োগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রাজনৈতিক পরিবেশে ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি। ফলে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব বিনিয়োগে রূপান্তর করতে নিরাপদ ও স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতার বিষয়টি সরকারের পক্ষ থেকেও স্বীকার করা হয়েছে। গত ১৩ অক্টোবর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, পুলিশ বাহিনীর সক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস ও মনোবল এখনো পুরোপুরি কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। বিগত শাসনামলে পুলিশের ভূমিকা এবং তা নিয়ে জনঅসন্তোষ বাহিনীর ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও সংকট পুরোপুরি কাটেনি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সাম্প্রতিক কয়েকটি সহিংস ঘটনা পরিস্থিতির উদ্বেগজনক দিকটি সামনে এনেছে। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলায় একটি মুদিদোকানে ঢুকে জামায়াতকর্মী নিজামকে গুলি করার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। রোববার রাত ১০টার দিকে উপজেলার ১ নম্বর আমানউল্লাহপুর ইউনিয়নের জিনু মার্কেটে এ ঘটনা ঘটে। গুলিবিদ্ধ নিজাম ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের অলিনগর তিন রাস্তার মোড়সংলগ্ন সড়কে যুবদলকর্মী বাপ্পিকে মোটরসাইকেল থেকে টেনে নামিয়ে অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। শুক্রবার রাত পৌনে ১১টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। একই দিন কুমিল্লায় সালিসে যাওয়ার পথে যুবদল নেতা আবু কাউসারকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে নেত্রকোনার দুর্গাপুরে নিজ বাড়ির মাত্র ৫০ গজ দূরে একটি চায়ের দোকানে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরকে গুলি করে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে খুলনায় সশস্ত্র ছিনতাইকারীদের হামলায় এক পুলিশ পরিদর্শকের দুই হাতের কব্জি চাপাতির আঘাতে গুরুতর জখম হওয়ার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি চাঁদাবাজি, ছিনতাই, ডাকাতি, অপহরণ, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের অভিযোগও সামনে আসছে। এমনকি সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভের সময় পুলিশের ওপর হামলা কিংবা সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে। এতে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখার চ্যালেঞ্জ বাড়ছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ব্যস্ত সড়ক, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, আবাসিক এলাকা কিংবা নিজ বাসস্থানেও নিরাপত্তা নিয়ে মানুষের উদ্বেগ বাড়ছে। টার্গেট কিলিং, চুরি, ধর্ষণ, সাইবার অপরাধ, মারামারি ও চাঁদাবাজির মতো ঘটনায় কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি। অপরাধ সংঘটনের পর দ্রুত তদন্ত, অপরাধীদের শনাক্তকরণ এবং আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে দুর্বলতা থাকলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠার সুযোগ পায়।

অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বড় বাধা হতে পারে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর দপ্তর, মাঠ প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান এবং যৌথ কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পুলিশের চেইন অব কমান্ড কার্যকর রাখা, মাঠপর্যায়ে দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা এবং অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে নিয়মিত নজরদারি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও মাদকের অপব্যবহার, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং ও সংঘবদ্ধ অপরাধ প্রতিরোধে গৃহীত কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এসব অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অভিযান পরিচালনা কিংবা অপরাধ সংঘটনের পর মামলা নেওয়ার মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। অপরাধের আগাম তথ্য সংগ্রহ, গোয়েন্দা নজরদারি, নিয়মিত টহল, দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা এবং তদন্তের মান বাড়াতে হবে। পাশাপাশি অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের আইনি সহায়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে অর্থনীতিকে গতিশীল করা এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি অপরিহার্য। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। তাই পুলিশের সক্ষমতা ও মনোবল পুনরুদ্ধার, চেইন অব কমান্ড কার্যকর করা, গোয়েন্দা সংস্থাসহ সব আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : নিউজ বাংলা চ্যানেল

কমেন্ট বক্স
যুদ্ধবিরতির মধ্যেই গাজায় ইসরাইলি হামলা, একই পরিবারের ৪ জন নি

যুদ্ধবিরতির মধ্যেই গাজায় ইসরাইলি হামলা, একই পরিবারের ৪ জন নি