নিজস্ব প্রতিবেদন
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ করতে গিয়ে পুলিশের হাতে আটক হয়েছেন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র শীর্ষ নেতাসহ অন্তত ২০ জন। পুলিশের জারি করা নিষেধাজ্ঞা ও নিরাপত্তা ব্যারিকেড অতিক্রম করে বিক্ষোভস্থলে প্রবেশের চেষ্টা করলে তাঁদের আটক করা হয়। বিতর্কিত ভোটার তালিকা সংশোধন এবং বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার প্রতিবাদে চলমান আন্দোলনের মধ্যে এ ঘটনা ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানা গেছে, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে সিজেপির নেতা আশুতোষ রাঙ্কা, সৌরভ দাস ও অজিঙ্ক শিন্ডে রয়েছেন। এর আগে দিল্লি পুলিশ জানায়, কেন্দ্রীয় দিল্লিতে অবস্থিত ঐতিহাসিক যন্তর মন্তরকে আর আনুষ্ঠানিক বিক্ষোভের স্থান হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। তবে পুলিশের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে আন্দোলনকারীরা সেখানে প্রবেশের চেষ্টা করেন। নেতাদের আটকের পর সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, ‘প্রতিরোধের চেতনাকে কখনো বাতিল করা যায় না।’
ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক, বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তাপ
ভোটার তালিকা সংশোধনকে কেন্দ্র করে চলতি মাসজুড়ে বিক্ষোভ চালিয়ে আসছে সিজেপি ও বিরোধী দলগুলো। বিরোধীদের অভিযোগ, সংশোধনের নামে প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার ঘটনায় প্রকৃত ভোটারদের ভোটাধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু মুসলিম ভোটারদের অন্যায্যভাবে তালিকা থেকে বাদ দিয়ে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) নির্বাচনি সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন তাঁরা।
তবে নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের বক্তব্য, ভুলবশত যাঁদের নাম বাদ পড়েছে, তাঁরা নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় পুনরায় ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করতে পারবেন।
এদিকে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ও কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর চাপ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। আন্দোলনের পরবর্তী কৌশল নির্ধারণে গতকাল বিকেলে বিরোধী সংসদ সদস্যদের নিয়ে চা-চক্রের আয়োজন করেন লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী। বৈঠক শেষে তিনি বলেন, দেশের গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলন থামবে না; বরং তা আরও গতিশীল হবে।
বৈঠকে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গে, সোনিয়া গান্ধী, কে সি ভেনুগোপাল, জয়রাম রমেশসহ বিভিন্ন বিরোধী দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। আরও ছিলেন রাষ্ট্রীয় জনতা দলের (আরজেডি) তেজস্বী যাদব ও মনোজ ঝা, ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার মহুয়া মাজি, সিপিআইয়ের ডি রাজা, সিপিএমের এম এ বেবিসহ অন্য নেতারা।
‘ভোট চুরি’র অভিযোগ বিরোধীদের
বৈঠক শেষে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করেন আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদব। তাঁর অভিযোগ, আন্দোলনকারীদের চাপে রাখতেই প্রশাসন যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। গণতন্ত্র রক্ষায় যেকোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকার কথা জানিয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ‘ভোট চুরি’ ও স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অভিযোগ তোলেন।
এনসিপি (এসপি) সংসদ সদস্য সুপ্রিয়া সুলে আন্দোলনকে জাতীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তাঁর ভাষ্য, সংবিধান ও সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষায় রাজধানী থেকে পঞ্চায়েত পর্যায় পর্যন্ত প্রতিবাদ অব্যাহত রাখা হবে।
কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গের দাবি, গত কয়েক দিনে সাধারণ মানুষ ও তরুণদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে, ভোটার তালিকা নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলো জনমনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার সদস্য সাগরিকা ঘোষ নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর অভিযোগ, বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অধীনে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিয়ে গুরুতর সংশয় তৈরি হয়েছে। হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারে নির্বাচনি অনিয়মের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণ এবং তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ না করা পর্যন্ত বিরোধীদের যৌথ আন্দোলন চলবে।
আটক নিয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ
সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপ দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে আটকপ্রক্রিয়ায় আইন ও বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ করেছেন। তাঁর দাবি, দলের নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে যথাযথ নিয়ম অনুসরণ না করেই আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া বৈধ জব্দতালিকা ছাড়াই তাঁদের ফোন নিয়ে নেওয়া এবং ডিভাইসের তথ্য নকল করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগও তুলেছেন তিনি।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের বক্তব্য এখানে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সিইসিকে অপসারণে অভিশংসনের দাবি
জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবির মধ্যে তাঁকে পদ থেকে অপসারণের আইনি পথ নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। কংগ্রেস নেতা ও সংসদ সদস্য শশী থারুরের বক্তব্য, প্রধান নির্বাচন কমিশনার স্বেচ্ছায় পদত্যাগ না করলে তাঁর অপসারণের জন্য সংসদে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
ভারতের সংবিধান অনুযায়ী, প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির মতো একই পদ্ধতি ও একই কারণে অপসারণ করা যায়। এ ক্ষেত্রে সংসদের উভয় কক্ষে নির্ধারিত বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় প্রস্তাব পাসের সাংবিধানিক বিধান রয়েছে। ফলে বিষয়টি কেবল রাজনৈতিক দাবি নয়, বরং সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
সব মিলিয়ে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিরোধীদের আন্দোলন, যন্তর মন্তরে বিক্ষোভে নিষেধাজ্ঞা এবং শীর্ষ নেতাদের আটকের ঘটনায় ভারতের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বিরোধী জোট আন্দোলন আরও বিস্তৃত করার ঘোষণা দিলেও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের দাবির পরিণতি কোন দিকে যায়, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।
নিউজ বাংলা চ্যানেল