নিজস্ব প্রতিবেদক
দিল্লিতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘ডিসেম্বরে দেশে ফেরার’ ঘোষণাকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন মাঠের রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় থাকা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের একাংশও এ ঘোষণাকে ঘিরে নড়েচড়ে বসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। তবে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টি রাজনৈতিক ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বাস্তবে তিনি দেশে ফিরবেন—তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগের কথাও সামনে এসেছে। একই সঙ্গে তার দেশে ফেরাকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক তৎপরতা ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে।
গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে ভার্চ্যুয়াল বক্তব্যে শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফেরার কথা জানান। তার এ ঘোষণার পর আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের মধ্যে নতুন করে সক্রিয়তার আলোচনা শুরু হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলীয় প্রচারণা, অনলাইন সভা এবং সাংগঠনিক যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা রাজনৈতিকভাবে দলীয় নেতা-কর্মীদের চাঙ্গা করার কৌশলও হতে পারে। কারণ বর্তমানে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে এবং শেখ হাসিনা নিজেও একটি মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত। ফলে তার প্রত্যাবর্তন কেবল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়াও।
প্রত্যর্পণ নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা
শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে ভারতকে একাধিকবার অনুরোধ করা হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় বিষয়টি বিবেচনার কথাও বিভিন্ন সময়ে উঠে এসেছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে। তবে বিদেশ থেকে বৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় ভ্রমণ নথি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তার পাসপোর্ট বা বৈধ ট্রাভেল ডকুমেন্ট না থাকলে বাংলাদেশি মিশনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় নথি ইস্যুর বিষয়টি সামনে আসতে পারে।
ফলে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ক্ষেত্রে তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের পাশাপাশি ভারতীয় কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ সরকার এবং সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মাঠে নামার প্রস্তুতির অভিযোগ
শেখ হাসিনার ঘোষণার পর আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের একটি অংশ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণার পাশাপাশি রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কর্মসূচি পালনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, সম্প্রতি রাজধানীতে বাসে অগ্নিসংযোগ, ককটেল বিস্ফোরণ, মশাল মিছিল ও ঝটিকা মিছিলের মতো কয়েকটি ঘটনায় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এসব ঘটনার সঙ্গে আওয়ামী লীগ বা সহযোগী সংগঠনের কারও সম্পৃক্ততা থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার সঙ্গে দলটির সম্পৃক্ততার অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে কি না, তা পৃথকভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তের বিষয়।
‘কঠোর অবস্থানে’ পুলিশ
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাবনা এবং আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য কর্মসূচি প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান ও অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বলেছেন, আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করতে দেওয়া হবে না।
সম্প্রতি ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে এক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, আইন দ্বারা নিষিদ্ধ কোনো কার্যক্রম দেশে চালাতে দেওয়া হবে না। এ বিষয়ে পুলিশ অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে ক্যান্টনমেন্ট থানার সাবেক ওসি রাকিবুলের কথিত ভাইরাল অডিও নিয়েও পুলিশের পক্ষ থেকে বক্তব্য এসেছে। অডিওটির সত্যতা যাচাইয়ের কথা জানানো হয়েছে। ঘটনাটি সত্য হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও দায়িত্বশীলতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন নিয়ে ঐকমত্য
শেখ হাসিনার দেশে ফেরা এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে মতপার্থক্য থাকলেও আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের প্রশ্নে দলগুলোর অবস্থান অনেকাংশে অভিন্ন বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে।
এনসিপির একাধিক নেতার বক্তব্য, আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকেও অভিযোগ করা হয়েছে, আওয়ামী লীগের একটি অংশ দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে।
সরকারের রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খান অভিযোগ করেছেন, আসন্ন শারদীয় দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ষড়যন্ত্র করা হতে পারে এবং এ বিষয়ে সরকারের কাছে তথ্য রয়েছে।
দিল্লির অবস্থানেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত
শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার পর থেকে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে আছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দিল্লির অবস্থানে কিছুটা পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে বলে কূটনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক ও আরও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে ভারতের আগ্রহ বাড়ছে—এমন ধারণাও রয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলে। একই সঙ্গে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নে আইনি প্রক্রিয়া চলমান থাকার বক্তব্যও ভারতীয় পক্ষ থেকে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতকেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার অবস্থান নিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
সামনে রাজনৈতিক পরীক্ষার ডিসেম্বর
সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার ‘ডিসেম্বরে দেশে ফেরার’ ঘোষণা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে তার প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে; অন্যদিকে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সম্ভাব্য নাশকতা ও অরাজকতা ঠেকাতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
তবে রাজনৈতিক ঘোষণা আর বাস্তব প্রত্যাবর্তনের মধ্যে রয়েছে দীর্ঘ আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া। ফলে শেখ হাসিনা আদৌ ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন কি না, ফিরলে কোন প্রক্রিয়ায় ফিরবেন এবং দেশে প্রবেশের পর তার বিরুদ্ধে চলমান আইনি কার্যক্রম কীভাবে এগোবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—এ ঘোষণাকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা যেন কোনোভাবেই বিঘ্নিত না হয়। ডিসেম্বর যত ঘনিয়ে আসবে, ততই এই ইস্যুতে সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান আরও স্পষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
নিউজ বাংলা চ্যানেল