তার মতে, নিষেধাজ্ঞা ও বিদেশি চাপের মুখে ইরানকে আরও স্বনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে। এ লক্ষ্যেই দেশের উৎপাদন খাতকে শক্তিশালী করে ‘প্রতিরোধ অর্থনীতি’ প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে খামেনি বলেন, অর্থনৈতিক শক্তি অর্জন শুধু সরকারের নীতিগত বিষয় নয়; বরং বিদেশি আর্থিক চাপ মোকাবিলা এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য এটি জাতীয় প্রয়োজন।
তিনি বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে উৎপাদন বাড়াতে হবে এবং গুরুত্বপূর্ণ লেনদেনে ধাপে ধাপে মার্কিন ডলারের ব্যবহার কমিয়ে আনতে হবে। শেষ পর্যন্ত দেশের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি হিসেবে ‘প্রতিরোধ অর্থনীতি’ গড়ে তুলতে হবে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম প্রেস টিভিতে প্রকাশিত বিস্তারিত বক্তব্যে খামেনি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো যতটা সম্ভব অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ওপর নির্ভর করা।
তবে দেশের ভেতরে কোনো পণ্যের পর্যাপ্ত উৎপাদন সম্ভব না হলে প্রয়োজন অনুযায়ী তা আমদানি করতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এ ক্ষেত্রে আমদানির সিদ্ধান্ত ‘সঠিকভাবে ও বিচক্ষণতার সঙ্গে’ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন খামেনি।
অর্থনীতির উন্নয়নে মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, পণ্য ও সেবার মূল্য এবং বাজার ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলোতে নিয়মিত নজরদারির প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি। পাশাপাশি বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দিলেও সেই অর্থ উৎপাদনশীল ও প্রয়োজনীয় খাতে ব্যবহার করতে হবে বলে উল্লেখ করেন।
খামেনি অর্থনীতিতে মার্কিন ডলারের ব্যবহার কমানোর বিষয়টিকেও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক লেনদেনে ডলারের ভূমিকা ধীরে ধীরে সীমিত করার পাশাপাশি উৎপাদন ও প্রয়োজনীয় খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে বিদেশি চাপের ওপর কম নির্ভরশীল একটি অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চাপের কথাও উল্লেখ করেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা। তিনি বলেন, ইরানের শত্রুরা দেশটির জনগণকে বোঝানোর চেষ্টা করে যে, তাদের দাবি মেনে নিলেই অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথ তৈরি হবে। তবে ইসলামী বিপ্লবের আগে ও পরে ইরান এবং দেশটির সম্পদের প্রতি ওই দেশগুলোর আচরণ দেখলে ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়।
খামেনির এ বক্তব্য এমন সময়ে এসেছে, যখন ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নামে একটি অভিযান শুরু করেছে, যার লক্ষ্য ইরানের আন্তর্জাতিক আর্থিক যোগাযোগ দুর্বল করা এবং দেশটির সরকারের অর্থের উৎস সীমিত করা।
খামেনির বক্তব্য প্রকাশের কিছুক্ষণ আগে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানায়, অভিযানটি পুরো শক্তিতে পরিচালিত হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ব্যাংক মেল্লির দুবাই শাখার ব্যবস্থাপক রেজা মোহাম্মদ তাইয়েদি এবং হংকংভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দাবি, হংকংভিত্তিক ওই প্রতিষ্ঠানটি ইরানের নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশের সুযোগ করে দিতে সহায়তা করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যাংক মেল্লি ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা রেখেছে। এর মধ্যে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের কুদস ফোর্স এবং ইরানের প্রতিরক্ষা ও সশস্ত্র বাহিনীর রসদ মন্ত্রণালয় রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান এর আগেই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় এসেছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরানের হয়ে আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনে সহায়তাকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক অপরাধ দমন নেটওয়ার্ক একটি নতুন নিয়মের প্রস্তাব করেছে। এর মাধ্যমে ব্যাংক মিসর ইউএইর সঙ্গে মার্কিন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ব্যাংকিং সুবিধা বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরান সরকারের মার্কিন ডলার ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যাংক মিসর ইউএই গুরুত্বপূর্ণ একটি কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট বলেন, ইরান সরকার জনগণের প্রয়োজনের চেয়ে নিজেদের কর্মকাণ্ডকে বেশি গুরুত্ব দিলে ওয়াশিংটন তাদের অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকার পথগুলো বন্ধ করার চেষ্টা করবে।
তিনি আরও বলেন, ইরান সরকারের হয়ে অবৈধ আর্থিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিদেশে ইরানি ব্যাংকের পক্ষে কাজ করা ব্যক্তিরাও এর আওতায় থাকবেন।
এর আগে গত ২৪ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ শুরুর ঘোষণা দেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই অভিযানের প্রধান উদ্দেশ্য বিশ্বজুড়ে ইরানের আর্থিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং ইরান সরকারকে সহায়তাকারী অর্থের উৎস বন্ধ করে দেওয়া।
নিউজ বাংলা চ্যানেল