ঢাকা | খ্রি.

খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি ছাড়িয়ে ব্যাংক খাতে আস্থার সংকট

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 6, 2026 ইং | Photo Card
খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি ছাড়িয়ে ব্যাংক খাতে আস্থার সংকট ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক

খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। মূলধন ও সংরক্ষণ ঘাটতিতে দুর্বল হয়ে পড়েছে একাধিক ব্যাংক। অথচ একই সময়ে কোথাও কোথাও পড়ে আছে বিপুল উদ্বৃত্ত তারল্য। ব্যাংক খাতের এই বৈপরীত্য স্পষ্ট করে দিচ্ছে—সংকটটি শুধু অর্থের নয়; এর গভীরে রয়েছে আস্থা, সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা।

ব্যাংক খাতের নাজুক পরিস্থিতিতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক এখন আস্থা ফেরানো, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন, খেলাপি ঋণ আদায় এবং উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়ন বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ব্যাংক খাতে আস্থা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান গুরুত্ব দিচ্ছেন খেলাপি ঋণ আদায়, দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং কম খরচে প্রকৃত উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের ওপর।

অন্যদিকে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চের (সিএসইআর) বিশ্লেষণ বলছে, শুধু নতুন করে মূলধন জোগান দিলেই ব্যাংক খাতের সংকট কাটবে না। ব্যবস্থাপনা, ঋণ বিতরণের সংস্কৃতি, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ, তদারকি এবং খেলাপি ঋণ আদায়ের কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তন না এলে নতুন মূলধনও পুরোনো ক্ষতি সামাল দিতে গিয়ে দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে।

সিএসইআর চেয়ারম্যান ও ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, অর্থনীতিবিদ সাকিফ শামীমের মতে, ব্যাংক খাতে টেকসই সংস্কারের জন্য মূলধন জোগানের পাশাপাশি দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন এবং দ্রুত খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কারণ খেলাপি ঋণের বোঝা এখন আর ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়; এটি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, উৎপাদন এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

খেলাপি ঋণে নতুন উদ্বেগ

২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ঋণ এখন এমন অবস্থায় রয়েছে, যেখান থেকে স্বাভাবিকভাবে অর্থের পুনঃচক্রায়ন হচ্ছে না।

তবে এই পরিসংখ্যানের পেছনের বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ। ঋণ শ্রেণীকরণের নিয়ম কঠোর হওয়া, পুনঃতফসিলকৃত ঋণের পুনর্মূল্যায়ন এবং সম্পদের মান যাচাইয়ের কারণে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত ঝুঁকি আগের তুলনায় বেশি দৃশ্যমান হয়েছে।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণের অনুপাত ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে উঠেছিল। ডিসেম্বর মাসে তা ৩০ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে আসে। কিন্তু বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই পতনের বড় অংশ এসেছে পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনের মাধ্যমে; ঋণের প্রকৃত গুণগত উন্নতির কারণে নয়। ২০২৬ সালের মার্চে খেলাপি ঋণের অনুপাত আবার বেড়ে ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ এবং জুনে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে পৌঁছেছে।

ফলে এখন মূল প্রশ্ন শুধু খেলাপি ঋণের পরিমাণ কত—তা নয়। বরং প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এত বড় অঙ্কের ঋণ দীর্ঘ সময়েও আদায় করা গেল না; কেন ঋণ দেওয়ার সময় ঝুঁকি শনাক্ত করা হয়নি; কেন খেলাপি হওয়ার পর দ্রুত পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি এবং কেন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ কাঠামো সময়মতো ঝুঁকির সংকেত ধরতে পারেনি।

সংরক্ষণ ও মূলধনেও চাপ

খেলাপি ঋণের সঙ্গে বাড়ছে ব্যাংকগুলোর সংরক্ষণ ঘাটতিও। ২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যাংকিং খাতে সংরক্ষণ ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা। ছয় মাস আগে এ ঘাটতি ছিল প্রায় ১ লাখ ৯১ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ বছরের প্রথম ছয় মাসেই ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ৩০ হাজার ৯১৬ কোটি টাকা।

প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ না থাকলে ব্যাংকের প্রকৃত ক্ষতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। একই সঙ্গে দুর্বল হচ্ছে মূলধন ভিত্তিও।

বাংলাদেশ ব্যাংকের Financial Stability Report 2025 অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে পুরো ব্যাংকিং খাতের CRAR বা মূলধন ও ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের অনুপাত ছিল ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশ। অথচ Basel III কাঠামো অনুযায়ী মূলধন সংরক্ষণ বাফারসহ ন্যূনতম CRAR ১২ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকগুলোর ক্ষতি শোষণের সক্ষমতার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।

তারল্য আছে, কিন্তু আস্থা কোথায়?

ব্যাংক খাতের আরেকটি বড় বৈপরীত্য হলো—মূলধন ও সম্পদের মান নিয়ে সংকট থাকলেও পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থা এককথায় তারল্য সংকটে আছে, এমনটি বলা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের Monetary Policy Review অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় SLR-এর অতিরিক্ত তারল্য বেড়ে ৩ লাখ ৩২ হাজার ৯৪৪ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। আগের বছরের তুলনায় যা ৫৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ বেশি। একইভাবে Financial Stability Report-এ দেখা যায়, সামগ্রিকভাবে LCR ও NSFR নিয়ন্ত্রক সীমার ওপরে ছিল।

অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু টাকার মোট পরিমাণে নয়; টাকার অবস্থান, বণ্টন ও আস্থার সঙ্গেও জড়িত। কোনো কোনো ব্যাংকের হাতে উদ্বৃত্ত তারল্য থাকলেও দুর্বল ব্যাংকের প্রতি আন্তঃব্যাংক আস্থা কমে গেলে সেই অর্থ পুরো ব্যবস্থায় স্বাভাবিকভাবে প্রবাহিত হয় না।

ফলে ‘তারল্য আছে’ এবং ‘ব্যাংকিং ব্যবস্থা সুস্থ’—এই দুটি বিষয়কে এক করে দেখার সুযোগ নেই।

আস্থা ফেরানোই সরকারের অগ্রাধিকার

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ব্যাংক খাতে আস্থা ফেরানো, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠাকে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরছেন। তাঁর মতে, আমানতকারীর আস্থা নষ্ট হলে শুধু ব্যাংক নয়, পুরো অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সরকারের ব্যাংক সংস্কার পরিকল্পনায় তাই দুর্বল ব্যাংককে অনির্দিষ্টকাল টিকিয়ে রাখার পরিবর্তে প্রকৃত অবস্থা নির্ণয় করে প্রয়োজনীয় পুনর্গঠন ও সংকট-সমাধানের ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। একই সঙ্গে আমানতকারীর অর্থ সুরক্ষা এবং প্রকৃত উদ্যোক্তাদের জন্য বিনিয়োগের অর্থায়ন স্বাভাবিক রাখার ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে।

কারণ ব্যাংক সংস্কারের নামে যদি প্রকৃত উদ্যোক্তার ঋণপ্রাপ্তি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে উৎপাদন, ব্যবসা ও কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফলে সরকারের সামনে দ্বৈত চ্যালেঞ্জ—একদিকে দুর্বল ও অনিয়মগ্রস্ত ব্যাংক সংস্কার, অন্যদিকে প্রকৃত ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের জন্য ঋণের দরজা খোলা রাখা।

খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর হওয়ার বার্তা

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান ব্যাংক খাতের সংকট মোকাবিলায় খেলাপি ঋণ ও অর্থপাচার রোধে কঠোর পদক্ষেপের কথা জানিয়েছেন। ঋণ আদায় প্রক্রিয়া দ্রুত করতে ‘ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট’ এবং ‘মানি লোন কোর্ট অ্যাক্ট’ সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

লক্ষ্য হচ্ছে ব্যাংকের ব্যালান্সশিট থেকে দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদের চাপ কমানো এবং দীর্ঘদিন আটকে থাকা ঋণ পুনরুদ্ধারের কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি করা।

একই সঙ্গে ব্যবসা ও বিনিয়োগ বাড়াতে কম সুদের অর্থায়নের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ব্যাংকগুলোর নিষ্ক্রিয় আমানত ব্যবহার করে ৪ শতাংশ সুদে তহবিল সংগ্রহ করে এসএমই ও কৃষি খাতে ৭ থেকে ৮ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন গভর্নর। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য অনুদান ও তুলনামূলক কম সুদের ঋণের সমন্বয়ে নতুন তহবিল তৈরির উদ্যোগও রয়েছে।

সিএসইআরের বিশ্লেষণ

সিএসইআর চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ সাকিফ শামীমের গবেষণায় বলা হয়েছে, ব্যাংক কোনো সাধারণ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নয়। একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে তার প্রভাব নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান, শ্রমিক ও সরবরাহকারীদের মধ্যে সীমিত থাকতে পারে। কিন্তু একটি ব্যাংকের ব্যালান্সশিট দুর্বল হলে তার অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে আমানতকারী, উদ্যোক্তা, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে।

ব্যাংককে তাই অর্থনীতির রক্তসঞ্চালনব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। ঋণ থেকে বিনিয়োগ, বিনিয়োগ থেকে উৎপাদন, উৎপাদন থেকে আয় ও কর্মসংস্থান এবং আয় থেকে সঞ্চয়ের মাধ্যমে অর্থ আবার ব্যাংকে ফিরে আসে। এই চক্রের কোথাও বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটলে তার প্রভাব ব্যাংকের গণ্ডি পেরিয়ে পুরো অর্থনীতিতে পড়ে।

খেলাপি ঋণ বাড়লে ব্যাংকের মুনাফায় আঘাত আসে। এরপর বাড়ে প্রভিশনিংয়ের চাপ। মুনাফা ও আয় কমে গেলে মূলধন দুর্বল হয়। মূলধন দুর্বল হলে নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে যায়। এতে বিনিয়োগ ও ব্যবসার অর্থায়ন বাধাগ্রস্ত হয়। আবার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দুর্বল হলে ভালো ঋণও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এভাবেই খেলাপি ঋণ ও অর্থনৈতিক দুর্বলতা পরস্পরকে আরও তীব্র করে।

বিদেশের অভিজ্ঞতা কী বলছে

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যাংকিং সংকট মোকাবিলার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের পর ব্যাংকের প্রকৃত দুর্বলতা শনাক্ত করতে Stress Test চালু করা হয়। ২০০৯ সালে ১৯টি বড় ব্যাংকের ওপর ব্যাপক পরীক্ষা চালিয়ে সম্ভাব্য ক্ষতি ও মূলধন ঘাটতি নির্ণয় করা হয়। প্রয়োজনীয় মূলধন সংগ্রহে বাধ্য করা হয় দুর্বল ব্যাংকগুলোকে। পরবর্তী সময়ে Stress Test যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক তদারকির গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে ওঠে।

সুইডেনের ১৯৯০-এর দশকের ব্যাংকিং সংকটেও দেখা যায়, শুধু ব্যাংকে অর্থ ঢেলে সংকট মোকাবিলা করা হয়নি। ভালো ও খারাপ সম্পদ আলাদা করা, দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন এবং খারাপ সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য পৃথক প্রতিষ্ঠান তৈরির মাধ্যমে সংকট সামাল দেওয়া হয়।

ইউরোপীয় ইউনিয়নেও দীর্ঘদিনের NPL সমস্যা মোকাবিলায় ব্যাংকগুলোর জন্য ঋণ পুনরুদ্ধার, সম্পদ বিক্রি, সংরক্ষণ, ঋণপত্র বিক্রি এবং কার্যকর NPL ব্যবস্থাপনার কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। ফলে ইউরো অঞ্চলের বড় ব্যাংকগুলোর NPL অনুপাত ২০১৫ সালের ৭ শতাংশের বেশি থেকে ২০২৫ সালের শেষে ২ দশমিক ১৮ শতাংশে নেমে এসেছে।

এই অভিজ্ঞতাগুলোর মূল শিক্ষা একটাই—সংকট আড়াল না করে প্রকৃত ক্ষতি শনাক্ত করতে হবে, প্রয়োজনীয় মূলধন দিতে হবে, খারাপ সম্পদ আলাদা করতে হবে, দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন করতে হবে এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের সামনে সংস্কারের বড় সুযোগ

বাংলাদেশও এখন ব্যাংক খাত পুনর্গঠনের পথে এগোচ্ছে। Bank Resolution Act, 2026 কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সংকটাপন্ন ব্যাংকের পুনর্গঠন ও সংকট-সমাধানে আরও স্পষ্ট আইনি ক্ষমতা দিয়েছে। পুনর্মূলধনীকরণ, সম্পদ ও দায় হস্তান্তর, একীভূতকরণ, অধিগ্রহণ, বেইল-ইন, পুনর্গঠন কিংবা অবসানের মতো ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এ ছাড়া দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য পৃথক আইনের উদ্যোগও রয়েছে। এর মাধ্যমে খেলাপি ও অবলোপনকৃত সম্পদের দ্বিতীয় বাজার এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরির কথা ভাবা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সংকট-সমাধান প্রক্রিয়ায় গেছে। বড় মূলধন ঘাটতি, উচ্চ শ্রেণিকৃত সম্পদ, তারল্য চাহিদা পূরণে ব্যর্থতা, আয়ক্ষমতার অবনতি এবং আমানতকারী ও অন্যান্য পাওনাদারের দায় পরিশোধে অক্ষমতার মতো বিষয়গুলোকে সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

পুনঃতফসিল নয়, প্রয়োজন প্রকৃত পুনরুদ্ধার

ব্যাংক খাতের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা বলছে, পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠন কোনো ঋণ সমস্যাকে সাময়িকভাবে আড়াল করতে পারে, কিন্তু ঋণ পুনরুদ্ধারের নিশ্চয়তা দেয় না।

২০২৫ সালেই রেকর্ড ১ লাখ ৭০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল হয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তারপরও ২০২৬ সালের জুনে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

এই ব্যবধান নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় সতর্কবার্তা। ঋণের কাগুজে শ্রেণি পরিবর্তনের চেয়ে প্রকৃত অর্থ ফেরত আসছে কি না—সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

যে সংস্কার এখন জরুরি

বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক খাত পুনর্গঠনে কয়েকটি পদক্ষেপকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রথমত, প্রতিটি দুর্বল ব্যাংকের প্রকৃত সম্পদমান নির্ধারণে Asset Quality Review করতে হবে। দ্বিতীয়ত, টেকসই কিন্তু মূলধনস্বল্প ব্যাংককে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে মূলধন পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা দিতে হবে।

তৃতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদে অটেকসই ব্যাংকের ক্ষেত্রে একীভূতকরণ, সম্পদ-দায় হস্তান্তর, সেতু ব্যাংক, অধিগ্রহণ বা প্রয়োজন হলে সুশৃঙ্খল অবসানের পথ নিতে হবে। চতুর্থত, খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারকে আলাদা পেশাদার কার্যক্রম হিসেবে গড়ে তুলতে হবে এবং দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদের জন্য কার্যকর দ্বিতীয় বাজার তৈরি করতে হবে।

এর পাশাপাশি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার জবাবদিহি বাড়াতে হবে। ব্যাংকের সাফল্য শুধু মুনাফা দিয়ে মাপা যাবে না; সম্পদের মান, তারল্য, সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং ঋণ পুনরুদ্ধারের সক্ষমতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

আস্থা ফিরবে সংস্কারেই

ব্যাংক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দিয়েছে—সমস্যার সমাধান শুধু আরও টাকা দিয়ে সম্ভব নয়। মূলধন দিতে হবে, তারল্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, আমানতকারীর আস্থা রক্ষা করতে হবে। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো ব্যাংকের ভেতরের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো বদলানো।

খারাপ ঋণের পেছনে যদি ভুল প্রণোদনা থাকে, দুর্বল তদারকি থাকে এবং দায়বদ্ধতার ঘাটতি থাকে, তাহলে নতুন মূলধনও পুরোনো সমস্যার ওপর নতুন স্তর তৈরি করবে।

ব্যাংকের মূলধন ক্ষয় হলে রাষ্ট্রের অর্থনীতিও ঝুঁকিতে পড়ে। তারল্য কমলে ব্যবসার চলতি মূলধন সংকুচিত হয়। ব্যাংকের ঝুঁকি বাড়লে ঋণের খরচ বাড়ে। ঋণের খরচ বাড়লে বিনিয়োগ কমে। বিনিয়োগ কমলে কর্মসংস্থান কমে। আর কর্মসংস্থান কমলে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাও দুর্বল হতে পারে।

তাই ব্যাংক সংস্কার কোনো খাতভিত্তিক সংস্কার নয়; এটি সামগ্রিক অর্থনৈতিক সংস্কারের অন্যতম পূর্বশর্ত।

বাংলাদেশের সামনে এখন মূল সিদ্ধান্ত—খেলাপি ঋণের সংখ্যা কম দেখানো, নাকি সমস্যার প্রকৃত আকার স্বীকার করে সমাধানে যাওয়া। দুর্বল ব্যাংককে অনির্দিষ্টকাল বাঁচিয়ে রাখা, নাকি টেকসই প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করে অটেকসই প্রতিষ্ঠানকে সুশৃঙ্খল সংকট-সমাধানের পথে নেওয়া। শুধু তারল্য জোগানো, নাকি কোথায় এবং কেন তারল্য আটকে আছে, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা।

বিশ্বের অভিজ্ঞতা বলছে, ব্যাংক সংকটের স্থায়ী সমাধান হিসাবের খাতার শেষ লাইনে লেখা যায় না। এর শুরু সঠিক ঋণ সিদ্ধান্তে, শক্ত সুশাসনে, সময়মতো ঝুঁকি শনাক্তকরণে এবং সমস্যাকে আড়াল না করার সাহসে।

মূলধন ব্যাংককে টিকিয়ে রাখতে পারে, তারল্য ব্যাংককে চলতে সাহায্য করতে পারে; কিন্তু আস্থা, শৃঙ্খলা ও সুশাসনই ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করে।

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হলো সেই সত্যটিকে নীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসা। খেলাপি ঋণ কমাতে হবে, একই সঙ্গে নতুন খেলাপি ঋণ তৈরির কারণও বন্ধ করতে হবে। মূলধন ঘাটতি পূরণ করতে হবে, পাশাপাশি কেন মূলধন ক্ষয় হলো তার জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। দুর্বল ব্যাংককে সহায়তা দিতে হবে, তবে সেই সহায়তার সঙ্গে সংস্কার, জবাবদিহি ও সময়সীমা যুক্ত করতে হবে। তাহলেই ব্যাংক খাত আবার দেশের অর্থনীতির প্রকৃত চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারবে।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : নিউজ বাংলা চ্যানেল

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সৌদি আরব সফরের আমন্ত্রণ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সৌদি আরব সফরের আমন্ত্রণ