ঢাকা | খ্রি.

নিজস্ব প্রতিবেদন: জে-১০সি কেনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষায় কতটা পরিবর্তন আসবে?

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Sep 5, 2026 ইং | Photo Card
নিজস্ব প্রতিবেদন: জে-১০সি কেনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষায় কতটা পরিবর্তন আসবে? ছবির ক্যাপশন: ছবি সংহগৃহীত
ad728

নিজেস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা আধুনিকায়নের আলোচনায় এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে চীনের জে-১০সি মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান। ১৯৭৭ সালে চীন থেকে এফ-৬ কেনার মধ্য দিয়ে যে প্রতিরক্ষা-সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল, কয়েক দশক পর সেই সম্পর্কই বাংলাদেশকে আরও আধুনিক প্রজন্মের যুদ্ধবিমান সংগ্রহের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

তবে ২০টি জে-১০সি হাতে পেলেই কি বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা আধুনিক হয়ে যাবে? সামরিক সক্ষমতার বাস্তব চিত্র বলছে, বিষয়টি এত সরল নয়। যুদ্ধবিমান একটি বড় উপাদান হলেও এর কার্যকারিতা নির্ভর করে রাডার, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত পাইলট, অস্ত্রভাণ্ডার, রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপদ বিমানঘাঁটি এবং কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল ব্যবস্থার ওপর।

বাংলাদেশের প্রথম যুদ্ধবিমান চীন থেকে নয়

চীন বাংলাদেশের প্রথম যুদ্ধবিমান সরবরাহকারী দেশ নয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩-৭৪ সালের দিকে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশকে মিগ-২১ যুদ্ধবিমান উপহার দেয়। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে সদ্য গড়ে ওঠা বিমানবাহিনীর জন্য এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতা।

এর কয়েক বছর পর, ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ চীন থেকে এফ-৬ যুদ্ধবিমান সংগ্রহ করে। পরবর্তী সময়ে চীনের এফ-৭ সিরিজও বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান বহরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।

১৯৯৯ সালে রাশিয়া থেকে আটটি মিগ-২৯ সংগ্রহের মাধ্যমে বাংলাদেশ আবারও তুলনামূলক আধুনিক যুদ্ধবিমান বহরে যুক্ত করে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে এসব প্ল্যাটফর্মের একটি বড় অংশ পুরোনো হয়ে গেছে। ফলে নতুন প্রজন্মের যুদ্ধবিমান সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে।

জে-১০সি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

জে-১০সি একটি একক ভূমিকার যুদ্ধবিমান নয়। এটি মাল্টিরোল প্ল্যাটফর্ম—অর্থাৎ আকাশযুদ্ধের পাশাপাশি স্থল ও সমুদ্রভিত্তিক বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধেও ব্যবহার করা যায়।

এর বড় সুবিধা হলো আধুনিক রাডার, উন্নত এভিওনিকস এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের সক্ষমতা। ফলে শুধু চোখে দেখা দূরত্বে যুদ্ধ নয়, Beyond Visual Range (BVR) সংঘাতেও বিমানটি কার্যকর হতে পারে।

২০২৫ সালের ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের পর জে-১০সি আন্তর্জাতিকভাবে নতুন করে আলোচনায় আসে। পাকিস্তান দাবি করেছিল, তাদের জে-১০সি ব্যবহার করে ভারতীয় রাফালসহ কয়েকটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করা হয়েছে। তবে এসব দাবির সবকিছু স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি। ফলে ওই সংঘাতকে জে-১০সির সক্ষমতার একমাত্র বা চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।

তবে ঘটনাটি একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—আধুনিক বিমানযুদ্ধে শুধু বিমানের গতি বা চালচলন নয়, রাডার, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, ডেটা-লিংক এবং BVR ক্ষেপণাস্ত্রের সমন্বিত ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যুদ্ধবিমান কেনাই কি যথেষ্ট?

না। বরং এখানেই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

একটি আধুনিক যুদ্ধবিমান কার্যকর করতে হলে প্রয়োজন—

  • উন্নত গ্রাউন্ড-বেজড রাডার ও আকাশ নজরদারি ব্যবস্থা
  • নিরাপদ কমান্ড, কন্ট্রোল ও যোগাযোগ ব্যবস্থা
  • আধুনিক BVR ও স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র
  • ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ও জ্যামিং সক্ষমতা
  • প্রশিক্ষিত পাইলট ও গ্রাউন্ড ক্রু
  • পর্যাপ্ত স্পেয়ার পার্টস ও রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা
  • নিরাপদ ও সুরক্ষিত বিমানঘাঁটি
  • বিকল্প রানওয়ে ও dispersal ব্যবস্থা
  • যুদ্ধকালীন দ্রুত মেরামত ও পুনরায় উড্ডয়নের সক্ষমতা

অর্থাৎ ২০টি জে-১০সি কেনা একটি aircraft acquisition programme; কিন্তু আধুনিক বিমানবাহিনী গড়ে তোলা একটি অনেক বড় air-power transformation programme

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা অবকাঠামো?

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিমানঘাঁটির নিরাপত্তা ও অবকাঠামো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আধুনিক যুদ্ধের প্রথম ধাক্কা সবসময় আকাশে আসবে এমন নয়। প্রতিপক্ষ যদি রানওয়ে, জ্বালানি মজুত, অস্ত্রাগার, রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র বা বিমান রাখার জায়গায় আঘাত করতে পারে, তাহলে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমানও মাটিতে অকার্যকর হয়ে যেতে পারে।

১৯৭১ সালের যুদ্ধের অভিজ্ঞতাই এর বড় উদাহরণ। তেজগাঁও বিমানবন্দরের রানওয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর পাকিস্তানি বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমানগুলো কার্যত আটকা পড়ে যায়।

তাই বাংলাদেশের জন্য শুধু নতুন বিমান কেনা নয়, হ্যাঙ্গার, শক্তিশালী বিমান-শেল্টার, বিকল্প রানওয়ে, দ্রুত রানওয়ে মেরামত এবং বিমান ছড়িয়ে রাখার সক্ষমতা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশিক্ষণও বড় প্রশ্ন

জে-১০সি পরিচালনা করা পুরোনো এফ-৭ বা মিগ-২৯ পরিচালনার মতো বিষয় নয়। নতুন প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে নতুন ধরনের প্রশিক্ষণ, মিশন পরিকল্পনা, সিমুলেটর, অস্ত্র ব্যবস্থাপনা এবং রক্ষণাবেক্ষণ সংস্কৃতি প্রয়োজন।

পাইলটকে শুধু বিমান ওড়ানো জানলেই হবে না। তাকে রাডার, ডেটা-লিংক, BVR অস্ত্র, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং অন্যান্য প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

একইভাবে গ্রাউন্ড ক্রুদেরও নতুন প্রযুক্তির বিমান রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ দরকার।

চীনের ওপর নির্ভরতা কেন বাড়ছে?

বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহে চীন বহু বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী। যুদ্ধবিমান ছাড়াও নৌবাহিনীর সাবমেরিন ও বিভিন্ন যুদ্ধজাহাজ, সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যান এবং বিভিন্ন আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ক্ষেত্রে চীনা প্রযুক্তির উপস্থিতি রয়েছে।

এর পেছনে কয়েকটি বাস্তব কারণ আছে।

প্রথমত, পশ্চিমা সমমানের অনেক প্ল্যাটফর্মের তুলনায় চীনা অস্ত্র সাধারণত কম দামে পাওয়া যায়। দ্বিতীয়ত, চীনের কাছ থেকে অস্ত্র কেনার ক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলোর মতো একই ধরনের রাজনৈতিক বা ব্যবহারের শর্ত অনেক সময় থাকে না। তৃতীয়ত, বাংলাদেশ ও চীনের দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে।

তবে একই উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকিও আছে। একটি দেশের বিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, রাডার ও অন্যান্য সামরিক ব্যবস্থা যত বেশি একই সরবরাহকারী দেশের প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করবে, সংকটকালে সরবরাহ, যন্ত্রাংশ ও আপগ্রেডের ক্ষেত্রে তত বেশি নির্ভরশীলতা তৈরি হতে পারে।

জে-১০সি বাংলাদেশের সক্ষমতা কতটা বাড়াবে?

২০টি জে-১০সি বাংলাদেশের বিমানবাহিনীর সক্ষমতায় গুরুত্বপূর্ণ গুণগত পরিবর্তন আনতে পারে—বিশেষ করে পুরোনো তৃতীয় প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের তুলনায়।

তবে সংখ্যার দিক থেকে এটি পুরো বিমানবাহিনীর চিত্র বদলে দেওয়ার মতো বড় বহর নয়। এর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে বিমানগুলোর সঙ্গে কী ধরনের রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থা, ডেটা-লিংক, প্রশিক্ষণ এবং রক্ষণাবেক্ষণ প্যাকেজ যুক্ত হচ্ছে তার ওপর।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—জে-১০সিকে আলাদা একটি যুদ্ধবিমান হিসেবে না দেখে একটি সমন্বিত air-defence network-এর অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

রাডার যদি আগে শত্রুকে শনাক্ত করে, কমান্ড সিস্টেম যদি সেই তথ্য দ্রুত যুদ্ধবিমানে পাঠাতে পারে, পাইলট যদি প্রশিক্ষিত থাকে, বিমান যদি নিরাপদ ঘাঁটি থেকে দ্রুত উড্ডয়ন করতে পারে এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেপণাস্ত্র ও জ্বালানি মজুত থাকে—তবেই আধুনিক যুদ্ধবিমানের পুরো সক্ষমতা কাজে লাগানো সম্ভব।

শেষ কথা

বাংলাদেশের জন্য জে-১০সি কেনার সিদ্ধান্তকে তাই শুধু নতুন যুদ্ধবিমান কেনা হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। এটি বাংলাদেশের বিমানবাহিনীকে পুরোনো প্ল্যাটফর্ম থেকে আধুনিক নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক যুদ্ধ সক্ষমতার দিকে নেওয়ার একটি সুযোগ।

কিন্তু সেই সুযোগ সফল করতে হলে একই সঙ্গে আকাশ প্রতিরক্ষা, রাডার, যোগাযোগ, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, প্রশিক্ষণ, অস্ত্র, রক্ষণাবেক্ষণ এবং বিমানঘাঁটির নিরাপত্তায় বিনিয়োগ করতে হবে।

শেষ পর্যন্ত আধুনিক যুদ্ধবিমান নিজে যুদ্ধ জেতে না—যে সমন্বিত ব্যবস্থা বিমানটিকে শনাক্ত করতে, সিদ্ধান্ত নিতে, আকাশে পাঠাতে এবং অস্ত্র ব্যবহার করতে সক্ষম করে, যুদ্ধের ফল নির্ধারণে সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : নিউজ বাংলা চ্যানেল

কমেন্ট বক্স
ভালুকায় মিছিলের প্রস্তুতি, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ৮ কর্মী আটক

ভালুকায় মিছিলের প্রস্তুতি, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ৮ কর্মী আটক