নিজস্ব প্রতিবেদক
২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। এ লক্ষ্য অর্জনে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণ, দেশীয় শিল্পের বিকাশ, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রচলিত কূটনৈতিক বলয়ের বাইরে গিয়ে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির প্রতিফলন ঘটিয়ে বহুমুখী আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নকে অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে কার্যকর বাণিজ্যিক সংযোগ প্রতিষ্ঠা করতে পারলে আঞ্চলিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।
দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অনিয়ম, আর্থিক খাতের দুর্বলতা, বিনিয়োগে স্থবিরতা ও পুঁজি পাচারের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে দেশের অর্থনীতিকে পুনর্গঠন করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যেই ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলার পাশাপাশি ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত এবং অন্তত এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব লক্ষ্য অর্জনে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন, অবকাঠামোগত সক্ষমতা সম্প্রসারণ এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ ও উন্নয়ন বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে প্রচলিত রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি নতুন বাজার সৃষ্টি এবং আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে পূর্বমুখী অর্থনৈতিক কৌশল বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও ইস্ট ডেল্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মদ সিকান্দার খান মনে করেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণের বিকল্প নেই। তাঁর মতে, এসব দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানো গেলে একদিকে যেমন ভারতের ওপর অতিনির্ভরতা কমবে, অন্যদিকে শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও কৃষিপণ্য আমদানিতে নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজার পশ্চিমা বিশ্বে হলেও শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি আমদানিতে পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব জোরদার করা গেলে বাংলাদেশি পণ্য, সেবা ও দক্ষ জনশক্তির জন্য নতুন বাজার তৈরি হতে পারে। এসব দেশের সঙ্গে সম্পর্কের পরিধি যত বাড়বে, ততই বাংলাদেশের অর্থনীতির বহুমুখীকরণের সুযোগ সম্প্রসারিত হবে।
অন্যদিকে, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম মনে করেন, পূর্বমুখী নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক করিডোর প্রতিষ্ঠা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, চীন ও মিয়ানমারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক বাণিজ্য ও পরিবহনব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য সুবিধা অর্জন করতে পারে।
তিনি বলেন, চীনের সহায়তায় মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে আঞ্চলিক যোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে ওঠার যে উদ্যোগ রয়েছে, তাতে বাংলাদেশ যুক্ত হতে পারলে তা দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করবে। এ ক্ষেত্রে করিডোরভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থা শুধু পণ্য পরিবহনেই নয়, বরং বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও আঞ্চলিক সহযোগিতা সম্প্রসারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল। বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে সমুদ্রবাণিজ্য, আঞ্চলিক যোগাযোগ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ভূকৌশলগত স্বার্থে বাংলাদেশের অবস্থান বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এ অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে আঞ্চলিক অর্থনীতির সঙ্গে আরও গভীরভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে দেশের সামনে।
সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময়কার পররাষ্ট্রনীতিতে এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান সরকারের পূর্বমুখী নীতিকে সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, অর্থনৈতিক কূটনীতি, বহুমুখী আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারে।
এ ক্ষেত্রে চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ সংযোগ করিডোরকে সম্ভাবনাময় উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠকে আঞ্চলিক যোগাযোগ ও করিডোরের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর, সড়ক ও রেল যোগাযোগের মাধ্যমে আঞ্চলিক বাণিজ্যের নতুন পথ তৈরি হতে পারে। তবে এ ধরনের করিডোর বাস্তবায়নে কূটনৈতিক সমন্বয়, অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাই, নিরাপত্তা এবং সার্বভৌমত্বের বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলকে কেন্দ্র করে যোগাযোগ অবকাঠামোর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন হয়েছে। কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম-দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ, কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশন এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প এ অঞ্চলের যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি কক্সবাজার বিমানবন্দরের উন্নয়ন এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক সম্প্রসারণের উদ্যোগ আঞ্চলিক যোগাযোগের সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব অবকাঠামোর কার্যকর সমন্বয় ঘটানো গেলে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলকে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সংযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব। বিশেষ করে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহন, আমদানি-রপ্তানি এবং আঞ্চলিক লজিস্টিকস খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
এদিকে, পূর্বমুখী অর্থনৈতিক কৌশলের আওতায় জ্বালানি, কৃষি, ওষুধ, তৈরি পোশাক, চামড়াশিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জাহাজ নির্মাণ, পর্যটন, স্বাস্থ্যসেবা ও কারিগরি শিক্ষাসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, কম্বোডিয়া, লাওস ও ব্রুনেইয়ের মতো দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করা গেলে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি প্রযুক্তি ও দক্ষতা বিনিময়ের সুযোগও বাড়বে।
বিশেষ করে ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার শিল্পায়ন অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। রপ্তানিমুখী শিল্প, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে এসব দেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো গেলে বাংলাদেশের শিল্প খাত আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠতে পারে।
বিশিষ্ট যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. মো. সামছুল হকের মতে, চীনসহ পূর্বমুখী দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং আঞ্চলিক করিডোর প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশ তার ভূকৌশলগত সক্ষমতা বাড়াতে পারে। এতে জ্বালানি, প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হওয়ার পাশাপাশি আঞ্চলিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়বে।
তবে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্যে পৌঁছাতে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণই যথেষ্ট নয়। এর জন্য আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়ন, নীতির ধারাবাহিকতা এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ওপরও জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও কূটনীতিতে ভারসাম্য বজায় রেখে সব অংশীদার দেশের সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তোলা জরুরি।
বিশ্লেষকদের মতে, পূর্বমুখী নীতি পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিকল্প নয়; বরং এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রকে আরও বহুমুখী করার একটি কৌশল। পশ্চিমা বাজারে রপ্তানি অব্যাহত রাখার পাশাপাশি পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো থেকে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও শিল্পায়ন সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে দেশের অর্থনীতির ভিত্তি আরও মজবুত হতে পারে।
সব মিলিয়ে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশের জন্য পূর্বমুখী অর্থনৈতিক কৌশল একটি সম্ভাবনাময় পথ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের সাফল্য নির্ভর করবে পরিকল্পনার কার্যকর বাস্তবায়ন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, আঞ্চলিক সহযোগিতা, অর্থনৈতিক সুশাসন এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি পরিচালনার ওপর। এসব ক্ষেত্রে সমন্বিত অগ্রগতি নিশ্চিত করা গেলে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান আরও সুদৃঢ় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
নিউজ বাংলা চ্যানেল