নিজস্ব প্রতিবেদক
চাঁদাবাজি, দখলবাজি, অবৈধ স্থাপনা ও ফুটপাত দখলসহ নানা অনিয়মে দীর্ঘদিনের ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছিল হতাশা ও ক্ষোভ। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক পরিচয়ে প্রভাব বিস্তার, চাঁদাবাজি ও দখলদারত্বের অভিযোগে জনজীবনে সৃষ্টি হয়েছিল অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। এমন প্রেক্ষাপটে অপরাধ ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান এবং ধারাবাহিক উচ্ছেদ অভিযানকে ঘিরে জনমনে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে। বিশেষ করে মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি কঠোর বার্তা দিয়েছেন। মন্ত্রী-এমপি থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মী—অপরাধে জড়িত কারও জন্য রাজনৈতিক পরিচয় যেন দায়মুক্তির ঢাল না হয়, এমন অবস্থানের প্রতিফলন দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারের এই অবস্থানের পাশাপাশি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করতে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অভিযানও নগরবাসীর মধ্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে হকার, ভাসমান দোকান ও অবৈধ স্থাপনার কারণে সংকুচিত হয়ে পড়া ফুটপাত উন্মুক্ত হওয়ায় পথচারীদের চলাচল সহজ হচ্ছে। তবে উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে হকারদের জীবিকা ও মানবাধিকার নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একদিকে নির্বিঘ্নে চলাচলের অধিকার, অন্যদিকে জীবিকার প্রশ্ন—দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় কীভাবে হবে, তা নিয়ে রয়েছে মতপার্থক্য। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের আশঙ্কা, অভিযান সাময়িকভাবে চলার পর আবারও যদি দখলদারত্ব, চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক প্রভাব ফিরে আসে, তাহলে বর্তমান স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
দেশজুড়ে সরকারি দলের পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, দখলবাজি, হামলা ও মব সন্ত্রাসের বিভিন্ন অভিযোগ জনমনে ক্ষোভ তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে এসব অপরাধের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক তৎপরতা এবং দলীয় সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণের ঘটনা সরকারের কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে। মিরপুরে ফুটপাতের অবৈধ দখল উচ্ছেদ করতে গিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রতিরোধের মুখে পড়তে হওয়ায় দখলদারদের প্রভাব ও সংঘবদ্ধ প্রতিরোধের বিষয়টিও সামনে এসেছে।
জানা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে দখল, চাঁদাবাজি, হামলা ও ভাঙচুরের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। কোথাও কোথাও এসব ঘটনায় রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে। গত ২৪ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে মিরপুরে মা ও শিশুস্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়। এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই পরদিন রাজধানীর ইসিবি এলাকায় নিউগিনি প্রপার্টিজের আবাসন প্রকল্পে হামলা এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ ওঠে। একই দিন ভোরে আদাবরের শ্যামলী হাউজিংয়ে একটি বহুতল ভবন দখলের চেষ্টার অভিযোগ সামনে আসে। এ ছাড়া মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যানে কয়েক শ লোক একটি প্লটে প্রবেশ করে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনায় স্থানীয় পর্যায়ের সরকারি দলের কিছু নেতাকর্মীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠলেও সুনির্দিষ্ট দায় নির্ধারণে তদন্তের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এদিকে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মহলে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সংস্থাকে ব্যবহার করে ষড়যন্ত্রের অভিযোগও সামনে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তদন্তের ফল প্রকাশের ওপরই প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণ নির্ভর করছে। সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুর শেখ নুর ইসলামের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চারটি কূটনৈতিক মদের গুদামে অভিযান ও সিলগালা করার ঘটনাকে ঘিরেও নানা বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে নিয়ম মেনে ব্যবসা পরিচালনার দাবি করা হলেও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে গত বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর বাংলামোটরে এক ওষুধ ব্যবসায়ীকে আগ্নেয়াস্ত্রের বাঁট দিয়ে আঘাত করে গুরুতর আহত করার অভিযোগ উঠেছে বহিষ্কৃত যুবদল নেতা ফেরদৌস আহমেদ সায়মনের বিরুদ্ধে। আহত ব্যবসায়ী মো. সোহান (৩৫) অভিযোগ করেন, ঘটনার রাতে ফেরদৌস কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে তাঁর পথরোধ করেন। এ নিয়ে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে পিস্তলের বাঁট দিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত করা হয়। এতে তাঁর মাথা ফেটে রক্তক্ষরণ হয়। পরে দুটি ফাঁকা গুলি ছুড়ে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
স্থানীয় লোকজন ধাওয়া করলে ফেরদৌস ও তাঁর সহযোগীরা একটি ভবনে আশ্রয় নেন। এ সময় ভবনটির সামনে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে। পরে ফেরদৌস আহমেদ ও তাঁর দুই সহযোগীকে আটক করে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় নেওয়া হয়। ফেরদৌসের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় চাঁদাবাজি ও চাঁদা না পেলে হামলার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের আইনগত নিষ্পত্তি তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হওয়া প্রয়োজন।
একই রাতে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে থানার সামনে এক পুলিশ সদস্যকে মারধরের অভিযোগ ওঠে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের সহসভাপতি মো. ইসমাইল হোসেনের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় তাঁকে আটক করে পুলিশ। পরে মুচলেকা নিয়ে বিএনপি নেতাদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। পরবর্তী সময়ে তাঁকে যুবদল থেকে বহিষ্কারের কথাও জানানো হয়।
অন্যদিকে বুধবার রাতে রাজধানীর চারটি বারে অভিযান চালায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। মোহাম্মদপুরের লালমাটিয়া এলাকার ‘কয়লা’ বারে অভিযান শেষে ঢাকা মেট্রো কার্যালয় (উত্তর)-এর উপপরিচালক মো. রাজিউর রহমান জানান, রাজধানীর বিভিন্ন বারে একযোগে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এর মধ্যে ফুয়াং ক্লাব, রুচিতা, ব্লেজার ক্লাউস ও কয়লা বারে অভিযান চালানো হয়। অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর এ ধরনের তৎপরতা অব্যাহত থাকলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির বিরুদ্ধে তদন্তের কথা গত বুধবার জানিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, নিরপেক্ষ তদন্ত চলছে এবং কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে ছাড় দেওয়া হবে না। সারা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তিনি আরও বলেন, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কার্যক্রম, মাদক, জুয়াসহ যেকোনো অপরাধে যারাই জড়িত থাকুক না কেন, তাদের দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এসআরবিয়ের পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী ইনকিলাবকে বলেন, জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা এবং ভীতিহীন, নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করাই তাঁদের মূল লক্ষ্য। অপরাধমুক্ত সমাজ গড়তে তাঁরা সর্বদা তৎপর রয়েছেন। জননিরাপত্তা রক্ষা ও নিরাপদ সমাজ প্রতিষ্ঠায় অপরাধ এবং চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে তাঁদের অবস্থান কঠোর ও আপসহীন। অপরাধীর রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনা হয় বলেও জানান তিনি।
এদিকে রাজধানীর ব্যস্ত সড়ক ও ফুটপাত দীর্ঘদিন ধরে হকার, ভাসমান দোকান, অস্থায়ী স্থাপনা ও বিভিন্ন ধরনের অবৈধ দখলের কারণে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এতে পথচারীদের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে মূল সড়ক দিয়ে হাঁটতে বাধ্য হচ্ছেন নগরবাসী। এমন পরিস্থিতিতে সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাত ও সড়কের অবৈধ দখল উচ্ছেদে অভিযান জোরদার করেছে। এসব অভিযানে অস্থায়ী দোকান, টংঘর, পণ্যের পসরা, অবৈধ স্থাপনা ও চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী বিভিন্ন সামগ্রী সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
দীর্ঘদিনের দখল ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের ফলে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ফুটপাত ফিরে পেতে শুরু করেছে স্বাভাবিক চেহারা। ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন অনেক নগরবাসী। পথচারীদের জন্য নির্ধারিত জায়গা উন্মুক্ত হওয়ায় তাঁদের চলাচল সহজ হচ্ছে। আগে যেখানে দোকানপাট ও বিভিন্ন স্থাপনার কারণে ফুটপাত দিয়ে হাঁটা কঠিন ছিল, সেখানে উচ্ছেদ অভিযানের পর হাঁটার জায়গা তৈরি হয়েছে। এতে সড়কে চলাচলের সময় ভোগান্তি কমার পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও হ্রাস পেতে পারে বলে মনে করছেন নগরবাসী।
মিরপুরের বাসিন্দা সাহাদাত হোসেন ইনকিলাবকে বলেন, রাজধানীর বেশির ভাগ ফুটপাত দোকানপাট দিয়ে দখল হয়ে যাওয়ায় পথচারীদের চলাচলের ক্ষেত্রে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। কোনো কোনো এলাকায় ফুটপাতের পুরো অংশই দখল হয়ে গেছে। ফলে তাঁদের মূল সড়ক দিয়ে হাঁটতে হয়, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা এ সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন।
একই এলাকার বাসিন্দা স্কুলশিক্ষক বেলাল হোসেন বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে সিটি করপোরেশনের অভিযানে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাত ও সড়কের অবৈধ দখল সরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত, সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় পরিচালিত এসব অভিযানের ফলে অনেক এলাকায় পথচারীদের চলাচল সহজ হয়েছে। বিশেষ করে আগে যেখানে ফুটপাত পুরোপুরি দখল হয়ে ছিল, সেখানে উচ্ছেদের পর হাঁটার জায়গা তৈরি হওয়ায় স্বস্তি ফিরেছে। তবে উচ্ছেদের পর নিয়মিত নজরদারি না থাকলে আবারও দখল ফিরে আসতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, ফুটপাত দখলমুক্ত করার চলমান অভিযান অব্যাহত থাকবে। উচ্ছেদের পর কেউ পুনরায় ফুটপাত দখল করলে দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে কঠোর অভিযান পরিচালনা করা হবে। জনগণের চলাচলের জন্য নির্ধারিত ফুটপাত উন্মুক্ত রাখা এবং পুনরায় দখল প্রতিরোধে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম ইনকিলাবকে বলেন, নগরীর স্বাভাবিক নাগরিক সুবিধা ও নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে কঠোর পদক্ষেপের বিকল্প নেই। পথচারীদের ভোগান্তিতে ফেলে মূল সড়ক কিংবা ফুটপাতে হকারদের ব্যবসা করতে দেওয়া হবে না। যত্রতত্র দোকান বসিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে তা বরদাশত করা হবে না। অবৈধ দোকান বসানো হলে তাৎক্ষণিক কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
তবে ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযানকে কেন্দ্র করে হকারদের জীবিকা ও মানবাধিকার নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। নগরীর ফুটপাত পথচারীদের চলাচলের জন্য নির্ধারিত হলেও অনেক হকারের জীবিকা এই ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। ফলে একদিকে পথচারীদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করা, অন্যদিকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া—দুই ক্ষেত্রেই সমন্বিত পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। মানবাধিকারের প্রশ্নে হকারদের জীবিকার অধিকার যেমন বিবেচ্য, তেমনি পথচারীদের নিরাপদে চলাচলের অধিকারও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে বিকল্প নির্ধারিত বাজার, পুনর্বাসন এবং সুশৃঙ্খল হকার ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ কার্যকর সমাধানের অংশ হতে পারে।
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ও নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান ইনকিলাবকে বলেন, নগর পরিবহন ব্যবস্থায় পথচারীদের জন্য নিরাপদ ও বাধাহীন ফুটপাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফুটপাত খালি করার পাশাপাশি সেখানে নিয়মিত তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নাগরিকদের অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। ঢাকার ফুটপাত ও সড়ক দখল সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে সিটি করপোরেশন, ট্রাফিক বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে সমন্বয় জরুরি। ফুটপাত দখলের সঙ্গে চাঁদাবাজি কিংবা প্রভাবশালীদের সংশ্লিষ্টতা থাকলে তা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
নগরবাসীর মতে, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা এবং চাঁদাবাজি ও দখলবাজি নিয়ন্ত্রণে শুধু সাময়িক অভিযান যথেষ্ট নয়। উচ্ছেদের পর নিয়মিত নজরদারি, পুনরায় দখল প্রতিরোধ, অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে হকারদের জন্য পরিকল্পিত বিকল্প কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগ তৈরি করা গেলে ফুটপাত দখলের সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সহজ হতে পারে।
সরকারের সাম্প্রতিক কঠোর অবস্থান ও ধারাবাহিক অভিযানে নগরবাসীর মধ্যে যে স্বস্তি তৈরি হয়েছে, তা ধরে রাখতে হলে আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি। রাজনৈতিক পরিচয়, প্রভাব কিংবা আর্থিক ক্ষমতা যেন অপরাধের ক্ষেত্রে কাউকে বিশেষ সুবিধা দিতে না পারে, সে বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপের পাশাপাশি নাগরিক অধিকার ও জীবিকার প্রশ্নেও ভারসাম্যপূর্ণ নীতি প্রয়োজন। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলো যেন সাময়িক অভিযানেই সীমাবদ্ধ না থেকে চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে স্থায়ী, দৃশ্যমান ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থায় রূপ নেয়।
নিউজ বাংলা চ্যানেল