ভারতীয় সংবাদসংস্থা এএনআই নিউজ জানিয়েছে, প্রস্তাবিত কারখানাটি হবে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ইস্পাত উৎপাদন কেন্দ্র। ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি চালু হলে বছরে ১ কোটি টন ইস্পাত উৎপাদনের সক্ষমতা থাকবে। আইওয়ায় এমন একটি প্রকল্পের ঘোষণা দিতে পেরে তিনি আনন্দিত বলেও জানান। তাঁর দাবি, কারখানাটি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ স্থাপনাই হবে না, বিশ্বের বড় ইস্পাত কারখানাগুলোর একটি হিসেবেও বিবেচিত হবে।
মেসাবি মেটালিকসের চেয়ারম্যান রেওয়ান্ত রুইয়া যুক্তরাষ্ট্রে স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের প্রশংসা করেন। যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য উৎপাদনের গুরুত্ব ফিরিয়ে আনার উদ্যোগের জন্য ট্রাম্পের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। রুইয়া বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে এই বিনিয়োগ তাঁর কাছে ‘নিজের ঘরে ফিরে আসার মতো’।
তিনি জানান, ভারতে জন্ম নেওয়ার পর নিউইয়র্ক, বোস্টন ও ক্যালিফোর্নিয়ায় পড়াশোনা করেছেন এবং জীবনের প্রায় অর্ধেক সময় যুক্তরাষ্ট্রে কাটিয়েছেন।
নতুন ইস্পাত কারখানার কাঁচামালের অন্যতম উৎস হবে মিনেসোটায় মেসাবি মেটালিকসের নতুন লৌহ আকরিক খনি। রেওয়ান্ত রুইয়ার তথ্য অনুযায়ী, তাঁর পরিবার মিনেসোটার ওই খনিতে ৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। তাঁর দাবি, প্রায় ৫০ বছর পর এটিই যুক্তরাষ্ট্রে চালু হতে যাওয়া প্রথম নতুন লৌহ আকরিক খনি।
খনি থেকে আকরিক উত্তোলন করে আইওয়ার কারখানায় ইস্পাত উৎপাদন পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। ট্রাম্পও অনুষ্ঠানে বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কয়েক দশক পর যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি হতে যাওয়া নতুন লৌহ আকরিক খনিগুলোর একটি হবে মিনেসোটার খনিটি এবং সেখানকার আকরিকের মানও ভালো।
ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, এর ফলে লৌহ আকরিক যুক্তরাষ্ট্রেই উত্তোলন হবে, দেশটিতেই ইস্পাত উৎপাদিত হবে এবং সেই ইস্পাত অভ্যন্তরীণ বাজারে ব্যবহারের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি করা যাবে।
তবে পুরো প্রকল্পের বিনিয়োগের পরিমাণ নিয়ে অনুষ্ঠানে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। মেসাবি মেটালিকসের মালিকপক্ষ বিনিয়োগের অঙ্ক প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার বলে জানিয়েছে। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী, প্রতি ডলার প্রায় ১২৩ দশমিক ১৩ টাকা ধরে এর পরিমাণ প্রায় ২ লাখ ২১ হাজার ৬৩৪ কোটি বাংলাদেশি টাকা। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লাটনিক খনি ও ইস্পাত কারখানা মিলিয়ে মোট বিনিয়োগ ১৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বলে জানিয়েছেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন কারখানায় বছরে ১ কোটি টন ইস্পাত উৎপাদন করা যাবে এবং ২০৩০ সালের দিকে সেখানে উৎপাদন শুরুর কথা রয়েছে।
প্রকল্পটির কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রভাবের কথাও তুলে ধরেছেন ট্রাম্প। তাঁর দাবি, নির্মাণকাজ ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো তৈরির সময় সর্বোচ্চ ৬ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। কারখানা ও খনিতে স্থায়ীভাবে প্রায় ২ হাজার মানুষের চাকরি তৈরি হবে।
ট্রাম্প আরও দাবি করেন, পুরো প্রকল্পের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে প্রায় ৯৫ বিলিয়ন ডলার যোগ হবে। তাঁর মতে, এই প্রকল্পে অঙ্গরাজ্য সরকারের কোনো কর ছাড় রাখা হয়নি। পাশাপাশি সরকার পরিবর্তন হলেও কার্যকর থাকবে—এমন কিছু নিশ্চয়তা কম্পানিটি পেয়েছে বলেও জানান তিনি।
ট্রাম্প বলেন, আগামী ১০ বছরে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে কারখানাটি নির্মাণ করা হবে। সেখানে উন্নতমানের এবং তুলনামূলক কম খরচে ইস্পাত উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি ইস্পাতের ওপর আরোপিত ৫০ শতাংশ শুল্কের বিষয়টিও উঠে আসে। ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলেন, এই শুল্ক বিদেশি কম্পানিগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে কারখানা স্থাপনে উৎসাহিত করছে। বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লাটনিক বলেন, এই শুল্ক না থাকলে মিনেসোটায় লৌহ আকরিকের খনি এবং আইওয়ায় ইস্পাত কারখানা তৈরি হতো না।
ট্রাম্পের ভাষ্য, কম্পানিগুলো শুল্ক এড়াতে যুক্তরাষ্ট্রেই কারখানা স্থাপন করছে। তবে এই শুল্ক বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ইস্পাত রপ্তানিকারকদের ওপরও প্রভাব ফেলেছে, যার মধ্যে ভারতও রয়েছে। ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় ইস্পাত উৎপাদক দেশ।
মেসাবি মেটালিকসের এই প্রকল্পের ফলে ভারতে উৎপাদিত ইস্পাত যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়ে শুল্ক দেওয়ার পরিবর্তে সেখানেই ইস্পাত উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে। নতুন ইস্পাত কারখানাটি বেসরকারি অর্থায়নে নির্মাণ করা হবে। তবে মিনেসোটার লৌহ আকরিক খনির অর্থায়নে যুক্তরাষ্ট্রের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক সহায়তা করেছে।
মেসাবি মেটালিকস ভারতের এসার গ্রুপের যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক শাখা। শশী রুইয়া ও রবি রুইয়া দুই ভাই মিলে এসার গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসার ইতিহাস প্রায় পাঁচ দশকের। ২০০৭ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটায় এসারের কার্যক্রম রয়েছে। ওই বছর প্রতিষ্ঠানটি মিনেসোটা স্টিল কিনে নেয়।
কম্পানিটির নিয়ন্ত্রণে ১৪০ কোটি টনের বেশি লৌহ আকরিকের মজুত রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। ভারতে এসার গ্রুপের বড় শিল্পপ্রকল্পগুলোর মধ্যে গুজরাটের হাজিরায় একটি বড় ইস্পাত কারখানা রয়েছে, যার বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা ১ কোটি টন।
এ ছাড়া গুজরাটের ভাদিনারে এসারের একটি বড় তেল শোধনাগার রয়েছে। যুক্তরাজ্যে শেল কম্পানির স্ট্যানলো শোধনাগারও কিনেছে এসার। বিদেশে সৌদি আরবে কম কার্বন নিঃসরণকারী ইস্পাত কারখানা নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের চার সপ্তাহেরও কম সময় আগে নতুন এই বিনিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হলো। অনুষ্ঠানে আইওয়ার কয়েকজন রিপাবলিকান প্রার্থীর প্রশংসা করেন ট্রাম্প। সাম্প্রতিক কিছু জনমত জরিপ নিয়েও মন্তব্য করেন তিনি এবং কাছাকাছি ব্যবধানের এসব জরিপকে ‘ভুয়া’ বলে উল্লেখ করেন।
এ সময় কানাডা, ইরান ও চীন নিয়েও সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ‘খুব শিগগিরই’ যুদ্ধে জয়ী হবে। একই সঙ্গে কানাডার সঙ্গে একটি ন্যায্য বাণিজ্য চুক্তি হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নতুন ইস্পাত কারখানা নির্মাণের এই প্রকল্পকে যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দেশটির শিল্প উৎপাদন বাড়ানোর নীতির অংশ হিসেবে তুলে ধরেছে ট্রাম্প প্রশাসন। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে লৌহ আকরিক উত্তোলন থেকে ইস্পাত উৎপাদন পর্যন্ত একটি বড় সরবরাহ ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেই গড়ে উঠবে।
নিউজ বাংলা চ্যানেল