নড়াইল প্রতিনিধি (রেজাউল হক) : জীবনের গল্প কখনো কখনো উপন্যাসকেও হার মানায়। অভাবের সংসার, হাতে মিস্ত্রির যন্ত্রপাতি, শরীরে ক্লান্তি—তবু চোখে ছিল স্বপ্ন। নিজের জন্য নয়, সন্তানদের জন্য। সেই স্বপ্নকে বুকে ধারণ করে দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম করেছেন মোঃ বিল্লাল শেখ। আশির দশকে যিনি নড়াইল সদর উপজেলার সিংগাশোলপুর বাজার ও আশপাশের এলাকায় ‘বিল্লাল মিস্ত্রি’ নামে পরিচিত ছিলেন, আজ তিনি একজন গর্বিত পিতা—সন্তানদের সাফল্যে যার জীবনের সব কষ্ট যেন সার্থক হয়ে উঠেছে।
সময়টা ছিল আশির দশক। দেশে তখন চীন থেকে নতুন নতুন ডিজেল ইঞ্জিন আসতে শুরু করেছে। গ্রামবাংলায় এসব ইঞ্জিন পরিচিতি পায় ‘স্যালো মেশিন’ নামে। কৃষিতে তখন এক নতুন পরিবর্তনের হাওয়া। আউশ-আমননির্ভর চাষাবাদের জায়গায় ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে সেচনির্ভর ইরি ধানের চাষ। আর ইরি ধানের সঙ্গে বাড়তে থাকে স্যালো মেশিনের ব্যবহার।
কিন্তু মেশিন নষ্ট হলে কৃষকের দুশ্চিন্তার শেষ থাকত না। দক্ষ মিস্ত্রি পাওয়া ছিল অনেকটা ভাগ্যের ব্যাপার। কৃষকের প্রয়োজন আর মিস্ত্রির সংকটের সেই সময়ে অল্পবয়সী, পাতলা গড়নের, সদা হাস্যোজ্জ্বল এক যুবক যেন আশীর্বাদ হয়ে এলেন কৃষকদের পাশে। তিনি বিল্লাল মিস্ত্রি।
তখন তিনি সদ্য বিবাহিত। সংসারে অভাব, ঘরে ছোট ছোট সন্তান, মাথার ওপর পরিবারের দায়িত্ব। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার অবকাশ ছিল না। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত কখনো মাঠে, কখনো কৃষকের বাড়িতে, কখনো বাজারের ছোট্ট কর্মস্থলে—স্যালো মেশিনের নষ্ট যন্ত্রপাতি খুলে বসতেন। মেশিন ঠিক না হওয়া পর্যন্ত যেন তাঁর নিজেরও স্বস্তি ছিল না।
অনেক সময় হয়তো শরীর ক্লান্ত হয়েছে, অর্থকষ্ট এসেছে, সংসারে টান পড়েছে। কিন্তু থেমে যাননি বিল্লাল শেখ। কারণ তিনি জানতেন, তাঁর হাতে ধরা সেই রেঞ্চ-হাতুড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে সন্তানদের ভবিষ্যৎ।
স্যালো মেশিন মেরামতের পর তাঁর কাজের পরিধি আরও বাড়ে। বাইসাইকেল, ভ্যান, মোটরসাইকেল—যে যন্ত্রই সামনে এসেছে, আগ্রহ ও পরিশ্রম দিয়ে সেটিই আয়ত্ত করেছেন। কাজের প্রতি নিষ্ঠা, মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার এবং সততা তাঁকে ধীরে ধীরে মানুষের আস্থার মানুষে পরিণত করে।
তারপর কেটে গেছে কয়েক দশক।
সেই পাতলা-গড়নের তরুণ আজ বার্ধক্যে। শরীরে আগের মতো শক্তি নেই, হয়তো আগের মতো সারাদিন যন্ত্রপাতি নিয়ে ছুটে বেড়ানোর সামর্থ্যও নেই। কিন্তু তাঁর মুখে আজ অন্যরকম প্রশান্তি। কারণ জীবনের সবচেয়ে বড় কাজটি তিনি করে ফেলেছেন—সন্তানদের মানুষ করেছেন, প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে বড় ছেলেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে চাকরি দিয়েছেন। মেজো ছেলে আজ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। ছোট ছেলেকেও কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। যে বাবা একসময় সন্তানের মুখে দুবেলা খাবার তুলে দিতে, পড়াশোনার খরচ জোগাতে কিংবা ভবিষ্যতের চিন্তায় রাত কাটাতেন, সেই বাবার সংসার আজ সন্তানদের সাফল্যে সত্যিই ‘চাঁদের হাট’।
বিল্লাল শেখের এই অর্জনের পেছনে কোনো উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পদ ছিল না, ছিল না বড় কোনো পুঁজি। ছিল শুধু দুই হাতের শ্রম, বুকভরা সাহস আর সন্তানদের জন্য নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।
একজন বাবার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন হয়তো এটাই—সন্তান যেন তার চেয়ে ভালো থাকে। বিল্লাল শেখ সেই স্বপ্ন দেখেছিলেন। আর সেই স্বপ্ন পূরণ করতে নিজের যৌবন, শ্রম ও আরামকে বিসর্জন দিয়েছেন। আজ সন্তানদের প্রতিষ্ঠা তাঁর কাছে শুধু আনন্দের নয়, এটি তাঁর দীর্ঘ জীবনের সংগ্রামের সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি।
সিংগাশোলপুর বাজারের মানুষ তাঁকে শুধু একজন মিস্ত্রি হিসেবে দেখেন না। তাঁদের কাছে তিনি একজন পরিশ্রমী মানুষ, একজন সৎ কারিগর, একজন নিরহংকারী ব্যক্তি এবং সর্বোপরি একজন সফল পিতা।
জীবনের শুরুতে দারিদ্র্য তাঁকে অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত করলেও শেষ পর্যন্ত দারিদ্র্যকে জয় করেছেন তিনি। নিজের হাতে গড়া জীবনের দিকে ফিরে তাকালে হয়তো বিল্লাল শেখের মনে পড়ে যায় সেই তরুণ বয়সের দিনগুলো—স্যালো মেশিনের শব্দ, তেলমাখা হাত, ক্লান্ত শরীর আর সন্তানদের মুখ।
সেই দিনগুলো আজ স্মৃতি। আর সেই স্মৃতির সবচেয়ে সুন্দর উত্তর—তাঁর সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত জীবন।
এমন বাবাদের গল্প হয়তো বড় শহরের আলোঝলমলে জীবনে খুব বেশি আলোচিত হয় না। কিন্তু গ্রামের মাটিতে, সাধারণ মানুষের জীবনে তাঁরাই নীরব নায়ক। তাঁরা নিজেদের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে সন্তানের স্বপ্ন গড়ে দেন। কোনো পুরস্কারের প্রত্যাশা না করে জীবনভর দায়িত্ব পালন করেন।
মোঃ বিল্লাল শেখ সেই নীরব নায়কদেরই একজন।
জীবনযুদ্ধে জয়ী এই গর্বিত পিতার প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা। তাঁর জীবনের সংগ্রাম নতুন প্রজন্মকে শেখাক—দারিদ্র্য মানুষকে থামাতে পারে, কিন্তু অদম্য পরিশ্রম, সততা ও সন্তানের প্রতি ভালোবাসাকে পরাজিত করতে পারে না।
প্রিয় বিল্লাল শেখের সুস্বাস্থ্য, শান্তিময় জীবন ও দীর্ঘায়ু কামনা করেন সম্পাদক ও প্রকাশক সৈয়দ এম এ জিন্নাহ্।
নিউজ বাংলা চ্যানেল