ডিআরইপির তথ্য অনুযায়ী, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আবাসিক খাত। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের ৫৭ দশমিক ২ শতাংশ, অর্থাৎ ৫১ দশমিক ৯৪ টেরাওয়াট-ঘণ্টা (টিডব্লিউএইচ) বিদ্যুৎ এই খাতে ব্যবহৃত হয়েছে। দেশে থাকা ৪ কোটি ৩ লাখ পরিবারের মধ্যে নিজস্ব বাড়িতে বসবাস করে ৩ কোটি ৫৬ লাখ পরিবার, যা মোট পরিবারের ৮৮ দশমিক ৫ শতাংশ।
সীমিত পরিসরে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের একটি পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া হলে দেখা যায়, ১০ শতাংশ পরিবার যদি ১ থেকে ৫ কিলোওয়াট-পিক (কেডব্লিউপি) ক্ষমতার ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করে, তাহলে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে ৮ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট-পিক (এমডব্লিউপি) সক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব। এতে বছরে ১৩ হাজার ৯৩৭ গিগাওয়াট-ঘণ্টা (জিডব্লিউএইচ) বিদ্যুৎ উৎপাদন হতে পারে, যা দেশের বর্তমান মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১৫ শতাংশ পূরণ করতে সক্ষম।
মাঝারি মাত্রায় প্রযুক্তিটির বিস্তার ঘটলে সম্ভাবনা আরও বড় বলে জানিয়েছেন কোস্টাল লাইভলিহুড অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল অ্যাকশন নেটওয়ার্ক (ক্লিন)-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হাসান মেহেদী। তাঁর হিসাবে, এ ক্ষেত্রে ২১ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট সক্ষমতা অর্জন করা সম্ভব হবে। বছরে উৎপাদিত হতে পারে ৩৪ হাজার ৫১৮ গিগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ, যা জাতীয় চাহিদার ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত পূরণ করতে পারবে।
হাসান মেহেদী আরও বলেন, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের প্রতি এক মেগাওয়াট স্থাপিত সক্ষমতা থেকে প্রতিবছর জাতীয় কোষাগারের ৩ কোটি ১০ লাখ টাকা সাশ্রয় হতে পারে। পাশাপাশি আমদানিনির্ভর ফার্নেস অয়েলের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং প্রতি মেগাওয়াটে ৮ হাজার ১০০ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বর্তমানে একটি পূর্ণাঙ্গ আবাসিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা বা তারও বেশি খরচ হতে পারে।
ক্লিনের প্রধান নির্বাহী জানান, সম্ভাবনাময় এই বাজারকে কেন্দ্র করে ১০ ধরনের হার্ডওয়্যার ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জামের চাহিদা তৈরি হতে পারে। এর মধ্যে সৌর পিভি প্যানেল, ইনভার্টার এবং ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি স্থাপনকারী, প্রশিক্ষক ও উদ্যোক্তাসহ পাঁচটি প্রধান পেশাগত ক্ষেত্রেও কাজের সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
নির্ধারিত স্থাপন লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হলে সরঞ্জাম ও উপকরণের বাজারের আনুমানিক মূল্য ১ হাজার ৯৭৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলেও জানান হাসান মেহেদী। এর মধ্যে সৌর প্যানেলের বাজারমূল্য হতে পারে ৬২৮ মিলিয়ন ডলার এবং ইনভার্টারের ৩৩৫ মিলিয়ন ডলার।
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের প্রসারের সঙ্গে বড় ধরনের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫৪৩ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের মাধ্যমে প্রায় ১৩ লাখ ৭০ হাজার সবুজ কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছিল। অফ-গ্রিড সৌরবিদ্যুতের প্রতি ১ কিলোওয়াট সক্ষমতায় গড়ে ২ দশমিক ৫২টি সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। কর্মসংস্থান সৃষ্টির সক্ষমতা ৫০ শতাংশ হিসাব করলেও ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণ থেকে প্রায় ১৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে।
তবে এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে এই খাতের বর্তমান সক্ষমতা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। সিপিডির গবেষণা সহযোগী মো. মেহেদী হাসান শামীম জানান, দেশে বর্তমানে নেট মিটারিংয়ের আওতায় ৪ হাজার ৫৫১টি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা রয়েছে। এগুলোর মোট সক্ষমতা ২১৩ দশমিক ৩ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ৬০ দশমিক ৪ শতাংশ স্থাপনা রয়েছে ঢাকা বিভাগে।
তিনি জানান, সরকার ২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত নবায়নযোগ্য জ্বালানি কৌশলপত্রে (আরইএসপি) ২০৩০ সালের ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের লক্ষ্য ৩ হাজার মেগাওয়াট থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট করেছে। তবে ভোক্তা ও শিল্প—দুই পর্যায়েই এই খাতের সামনে উল্লেখযোগ্য বাধা রয়েছে।
ক্লিনের জরিপে দেখা গেছে, সৌরবিদ্যুৎ সম্পর্কে ৮৭ শতাংশ মানুষের সচেতনতা থাকলেও মাত্র ২১ শতাংশ মানুষ মনে করেন এটি অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক। আবার ২৮ শতাংশের ধারণা, সৌর প্যানেলের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নেই।
অ্যাকশনএইডের ব্যবস্থাপক আবুল আজাদ বলেন, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কিনতে উচ্চ প্রাথমিক ব্যয়, পরিবারের অনিয়মিত আয় এবং সহজে পাওয়া যায় এমন ঋণ সুবিধা সম্পর্কে সীমিত সচেতনতা প্রযুক্তিটির প্রসারে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিয়ন্ত্রক পর্যায়েও সমস্যা রয়েছে বলে জানান তিনি। তাঁর মতে, জটিল ঋণপ্রক্রিয়া, আমদানি করা উপকরণের ওপর উচ্চ অগ্রিম আয়কর (এআইটি) এবং বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার পরিদর্শন ও জাতীয় গ্রিডে সংযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণকে ধীর করে দিচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে আবাসিক গ্রাহকদের নেট মিটারিংয়ের যোগ্যতার শর্ত সহজ করার সুপারিশ করেছে সিপিডি। পাশাপাশি সব বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার জন্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল আবেদন প্ল্যাটফর্ম চালুর মাধ্যমে অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত করার কথাও বলা হয়েছে।
অর্থায়নের ক্ষেত্রেও বিশেষ ঋণ সুবিধা, আংশিক ঋণ নিশ্চয়তা এবং ‘পে-অ্যাজ-ইউ-সেভ’ বা সাশ্রয়ের অর্থ দিয়ে ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
মূলধনি ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে সিপিডি, বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ) এবং সোলশেয়ার পিভি প্যানেল ও লিথিয়াম আয়রন ফসফেট (এলএফপি) ব্যাটারির মতো গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম শূন্য শুল্কের আওতায় আনার প্রস্তাব দিয়েছে।
এ ছাড়া কম উৎপাদনশীল বা অকার্যকর ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা শনাক্ত, মূল্যায়ন ও পুনরুদ্ধারের জন্য জাতীয় পুনর্বাসন কর্মসূচি চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি ভোক্তাদের আস্থাও পুনর্গঠন করা সম্ভব হবে।
ছোট আকারের বিকেন্দ্রীভূত নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের আমদানিকৃত আনুষঙ্গিক সরঞ্জামে সম্পূর্ণ শুল্ক অব্যাহতি এবং পুরোনো সোলার হোম সিস্টেমকে হাইব্রিড ও গ্রিড-সংযুক্ত ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করে পুনরায় ব্যবহারের সুপারিশও রয়েছে। এর ফলে বিদ্যমান এসব সম্পদ অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকবে না।
নিউজ বাংলা চ্যানেল