অবসরপ্রাপ্ত নার্স থমাস ২২ বছর আগে স্বামীর সঙ্গে সুইডেনে পাড়ি জমান। তিন বছর আগে ক্যান্সারে তার স্বামীর মৃত্যু হয়। এরপরও তিনি সুইডেনেই বসবাস করে আসছিলেন। তবে যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর দেশটিতে থাকার অধিকার নিশ্চিত করতে যে আনুষ্ঠানিক আবেদন প্রয়োজন ছিল, সেটি সময়মতো করেননি তিনি।
এরপর সুইডিশ কর্তৃপক্ষ তাকে দেশ ছাড়ার বিষয়ে সতর্ক করে। বৈধভাবে সেখানে থাকার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য থমাস একাধিকবার আবেদন ও আপিল করলেও সেগুলো প্রত্যাখ্যাত হয়। স্বেচ্ছায় সুইডেন ছাড়ার জন্য দেওয়া তার সর্বশেষ সময়সীমা মঙ্গলবার শেষ হচ্ছে।
সুইডেনে নিজের বাড়ি থেকে বিবিসিকে থমাস বলেন, ‘এটা একেবারে অসহ্য পরিস্থিতি। আমি ঘুমাতে পারছি না, খেতে পারছি না। সকালে ঘুম থেকে উঠে বুঝতে পারি না, কী হতে যাচ্ছে।’
২০২০ সালের ৩১ জানুয়ারি যুক্তরাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে যায়। এর ফলে ব্রিটিশ নাগরিকরা আর ইইউর নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হননি। ব্রেক্সিটের আগে ব্রিটিশ নাগরিকদের সুইডেনসহ ইইউভুক্ত দেশগুলোতে বসবাসের বিশেষ অধিকার ছিল।
ব্রেক্সিটের পর সেই অধিকার পরিবর্তিত হলেও যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিচ্ছেদ চুক্তিতে আগে থেকেই ইইউভুক্ত কোনো দেশে বসবাসরত ব্রিটিশ নাগরিকদের জন্য একটি সুযোগ রাখা হয়েছিল। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আবেদন করে তারা বসবাসের অনুমতি নিতে পারতেন। এ আবেদনের শেষ সময় ছিল ২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর।
থমাস জানান, তিনি ও তার স্বামী এমন কোনো আবেদন করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি জানতেন না। ২০২৩ সালে সুইডেনে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করার সময় প্রথমবার তিনি এ নিয়মের কথা জানতে পারেন। এরপর নিজের অবস্থান বৈধ করার জন্য ধারাবাহিকভাবে আবেদন ও আপিল করেন। কিন্তু কোনোটিই অনুমোদন পায়নি।
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর সুইডেনের অভিবাসনবিষয়ক সরকারি সংস্থা মাইগ্রেশনসভেরকেট গত মাসে তাকে জানায়, তাকে স্বেচ্ছায় দেশ ছাড়তে হবে। ৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেশ ছাড়ার সময়সীমা দেওয়া হয়। তবে থমাসের আইনজীবীরা বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এখনো আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। এ বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি।
সুইডেন ছাড়ার অর্থ তার ছেলে, নাতি-নাতনি, বন্ধু এবং প্রয়াত স্বামীর কবর থেকে দূরে সরে যাওয়া—যা তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দিচ্ছে বলে জানান থমাস। তিনি বলেন, ‘আমি ক্লান্ত। সত্যিই আমি ক্লান্ত। আর আমি তো আর তরুণ নই। ২০ বছরের বেশি সময় ধরে এখানে বসবাস করছি। আমার বন্ধু আছে, পরিবার আছে। তাহলে সহানুভূতি কোথায়?’
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সুইডেন ২ হাজার ৪৯০ জন ব্রিটিশ নাগরিককে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে। ওই সময়ে ইইউর ২৭টি সদস্য দেশ থেকে দেশ ছাড়ার নির্দেশ পাওয়া ৭ হাজার ৫০০-এর বেশি ব্রিটিশ নাগরিকের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই সংখ্যা।
তবে বর্তমানে সুইডেনে কতজন ব্রিটিশ নাগরিক বহিষ্কারের ঝুঁকিতে রয়েছেন, সে বিষয়ে কোনো তথ্য দেয়নি মাইগ্রেশনসভেরকেট। সংস্থাটি জানিয়েছে, থমাসের অনুমতি ছাড়া তার ব্যক্তিগত ঘটনা নিয়ে তারা মন্তব্য করতে পারে না। তবে গত সপ্তাহে ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য গার্ডিয়ানকে সংস্থাটি জানিয়েছে, ব্রেক্সিটের পর থেকে ৪৫৮ জন ব্রিটিশ নাগরিককে সুইডেন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে অথবা জোর করে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
থমাসের মতো ঘটনা আরও রয়েছে। গত মাসে আরেকটি পরিবার বিবিসিকে জানায়, তাদের বাবাকেও সুইডেন থেকে সরিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে। ওই ব্যক্তি স্মৃতিভ্রংশ এবং রক্তনালিজনিত পারকিনসনিজমে আক্রান্ত। তিনি সুইডেনের একটি পরিচর্যা কেন্দ্রে থেকে সার্বক্ষণিক চিকিৎসা ও সেবা নিচ্ছেন। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশটিতে বসবাসের পরও তাকে সুইডেন ছাড়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে।
এ ধরনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্রেক্সিটের পর ইউরোপে বসবাসরত ব্রিটিশ নাগরিকদের অবস্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
সুইডেনের অভিবাসনমন্ত্রী ইয়োহান ফোরসেল জানিয়েছেন, ব্রেক্সিটের পর যেসব ব্রিটিশ নাগরিক জটিলতায় পড়েছেন, তাদের জন্য বর্তমান প্রক্রিয়া সহজ করার কোনো সুযোগ আছে কি না, তা সরকার পর্যালোচনা করছে। বিবিসিকে তিনি বলেন, বর্তমান নিয়মগুলো আগের সরকার চালু করেছিল এবং বিষয়টি সরকার ‘খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখবে’।
তিনি বলেন, নিয়মের কারণে সমস্যায় পড়া ব্যক্তিদের জন্য প্রক্রিয়াটি সহজ করতে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তা পরীক্ষা করা হবে। তবে থমাসের ঘটনা নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি তিনি।
ফোরসেল আরও বলেন, সরকারের অবস্থান হলো নিয়মগুলো উদারভাবে প্রয়োগ করা উচিত। যুক্তরাজ্য সুইডেনের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার এবং সুইডেনে বসবাস ও কাজ করা ব্রিটিশ নাগরিকরা যেন দেশটিতে থাকতে পারেন, সেটিই সুইডেনের প্রত্যাশা। কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব, তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সুইডিশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলেও জানান তিনি।
থমাসের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন সুইডেনের বিরোধী দল ভ্যানস্টারপারিয়েত বা বাম দলের আইনপ্রণেতা হোকান সভেনেলিং। তিনি সরকারের অভিবাসন নীতির সমালোচনা করে বলেন, এর কারণে দীর্ঘদিন ধরে সুইডেনে বসবাসরত অনেক ব্রিটিশ নাগরিক সমস্যায় পড়ছেন।
সভেনেলিং আশা করছেন, সুইডেনের নির্বাচন সরকারের পরিবর্তন আনতে পারে। তার মতে, বিরোধীরা সরকার গঠন করলে অভিবাসন নীতিতে পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে। এতে জয়েস থমাসের মতো সুইডেনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক থাকা ব্রিটিশ নাগরিকদের দেশটিতে থাকার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এদিকে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র, কমনওয়েলথ ও উন্নয়ন দপ্তরও বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। দপ্তরের এক মুখপাত্র বলেন, সুইডিশ কর্তৃপক্ষ বিষয়টি পর্যালোচনা করবে বলে যে বক্তব্য দিয়েছে, যুক্তরাজ্য তা স্বাগত জানায়। এ বিষয়ে সুইডেনকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে যুক্তরাজ্য প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।
নিউজ বাংলা চ্যানেল