নিজস্ব প্রতিবেদক
কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলার লেমশীখালী এলাকায় ১৯৬১ সাল থেকে লবণ চাষের কাজে ব্যবহৃত ১১৩ দশমিক ৫৬ একর সরকারি জমি বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) অনুকূলে নামমাত্র বা প্রতীকী মূল্যে হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জমিটি স্থায়ীভাবে বিসিকের অধীনে এলে সেখানে আধুনিক লবণ প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, প্রশিক্ষণ ও গবেষণার সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ লক্ষ্যে বিসিক চেয়ারম্যান বেনজীর আহমেদ গত ৬ আগস্ট শিল্প সচিবের কাছে চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে ভূমি মন্ত্রণালয়ে প্রয়োজনীয় সুপারিশ পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বিসিকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আয়োডিনযুক্ত লবণ আইন, ২০২১ এবং জাতীয় লবণনীতি, ২০২২-এর আলোকে দেশের লবণ শিল্পের টেকসই উন্নয়ন, আধুনিকায়ন এবং লবণচাষিদের স্বার্থ সুরক্ষায় জমিটি বিসিকের অনুকূলে স্থায়ীভাবে হস্তান্তর করা প্রয়োজন।
চিঠির তথ্য অনুযায়ী, কুতুবদিয়ার লেমশীখালী এলাকায় লবণ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য ১৯৬১ সালে জমি অধিগ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে ওই জমি লবণ চাষের কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিসিকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, জমিটিতে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর লবণ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ সুবিধার পাশাপাশি প্রশিক্ষণ ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
বর্তমানে বিসিকের লবণ শিল্প উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় ১২টি লবণ কেন্দ্রের মাধ্যমে কক্সবাজারের সব উপজেলা এবং চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার লবণচাষিদের প্রযুক্তিগতসহ বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
বিসিক জানায়, বিএস জরিপের সময় করপোরেশনের নিজস্ব ক্রয়কৃত ২ দশমিক ৯০ একর জমির সঙ্গে সরকার থেকে লিজ নেওয়া ১১৩ দশমিক ৫৬ একর জমির মধ্যে ১০৬ দশমিক ৫৭ একরসহ মোট ১০৯ দশমিক ৫৭ একর জমি বিসিকের নামে বিএস রেকর্ডভুক্ত হয়। তবে জমিটি সরকারি লিজের আওতায় থাকায় প্রতি ১০ বছর পরপর লিজ নবায়নের প্রয়োজন হয়।
এতে জটিলতাও তৈরি হয়েছে। ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সময়মতো লিজ নবায়ন না হওয়ায় প্রান্তিক লবণচাষিদের কাছে নির্ধারিত সময়ে জমি বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে ওই সময় লবণ উৎপাদনও কমে যায় বলে বিসিকের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে জমিটি খাসজমি হওয়ায় স্থানীয় প্রভাবশালীদের একটি অংশ বিভিন্নভাবে তা দখলের চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ করেছে বিসিক। এ নিয়ে একাধিক মামলা বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
বিসিকের দাবি, জমিটি স্থায়ীভাবে করপোরেশনের অনুকূলে হস্তান্তর করা হলে লবণের গুণগত মান উন্নয়ন, উৎপাদনোত্তর ক্ষতি হ্রাস, সংরক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বাজারজাতকরণ ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে লবণচাষিদের দক্ষতা বাড়ানো এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে।
বিসিক চেয়ারম্যান বেনজীর আহমেদ বলেন, গত কয়েক বছরে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বাজারমূল্যের ওঠানামা ও সংরক্ষণ সংকটসহ নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন লবণচাষিরা। এসব সমস্যা মোকাবিলায় আধুনিক অবকাঠামো ও প্রযুক্তিনির্ভর লবণ শিল্প গড়ে তোলার বিকল্প নেই।
তিনি জানান, লবণচাষিদের উন্নত পদ্ধতিতে সাদা, দানাদার ও পরিপক্ব লবণ উৎপাদনের বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রায় ১০ হাজার দক্ষ লবণচাষি তৈরি করা হয়েছে। কম জমিতে অধিক মানসম্পন্ন লবণ উৎপাদনের জন্য পলিথিন পদ্ধতিও উদ্ভাবন করা হয়েছে। এ পদ্ধতিতে কালো লবণের উৎপাদন প্রায় বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
বিসিক চেয়ারম্যান আরও বলেন, গবেষণা ও প্রদর্শনী কার্যক্রমের মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর লবণ চাষ সম্প্রসারণ করা সম্ভব হয়েছে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চাষিদের উৎপাদন ব্যয় কমার পাশাপাশি লবণের গুণগত মানও উন্নত হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে লবণ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এবং আমদানি-নির্ভরতা কমাতেও এ কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তিনি বলেন, ১৯৬১ সাল থেকে লবণ চাষে ব্যবহৃত ঐতিহাসিক এ জমি বিসিকের অনুকূলে স্থায়ীভাবে হস্তান্তর করা হলে কুতুবদিয়াকে দেশের অন্যতম আধুনিক লবণ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে জাতীয় লবণ শিল্পের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে এ খাতের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা যাবে।
তবে জমি হস্তান্তরের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (যুগ্ম সচিব) প্রতাপ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, জমিটি বিসিকের অনুকূলে হস্তান্তরের বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানোর ব্যাপারে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে। আইনগত দিকগুলো পর্যালোচনা শেষে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
নিউজ বাংলা চ্যানেল