ঢাকা | খ্রি.

ঢাকা-গাজীপুর-সাভারে বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও ভাঙচুর, অন্তত ৩০০ কারখানায় ছুটি

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Nov 2, 2026 ইং | Photo Card
ঢাকা-গাজীপুর-সাভারে বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও ভাঙচুর, অন্তত ৩০০ কারখানায় ছুটি ছবির ক্যাপশন: ছবি সংগৃহীত
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক

ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে দেশের তৈরি পোশাকশিল্পাঞ্চল। রাজধানী ঢাকা, গাজীপুর ও সাভার-আশুলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ, কর্মবিরতি ও সড়ক অবরোধে ব্যাহত হয়েছে স্বাভাবিক জনজীবন। গাজীপুরে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কায় সাভার-আশুলিয়া ও গাজীপুরের অন্তত ৩০০ পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে শিল্প পুলিশ।

গতকাল রোববার সকাল থেকে গাজীপুরের কালিয়াকৈরের চন্দ্রা, পল্লীবিদ্যুৎ, সফিপুর, মৌচাক ও কোনাবাড়ীসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে শ্রমিকেরা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেন। এতে মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। আটকা পড়ে দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী ট্রাকসহ অসংখ্য যানবাহন। চরম ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রী ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

গাজীপুরে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ

গাজীপুরের কালিয়াকৈরে শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। চন্দ্রা পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় ট্রপিক্যাল নিটেক্স লিমিটেডের ঝুটগুদামে আগুন দেওয়া হয়। এ ছাড়া কোনাবাড়ী ফ্লাইওভারের নিচে পুলিশ বক্সে অগ্নিসংযোগ, মৌচাক কাটার এলাকায় পুলিশ বক্স ভাঙচুর, আনসার একাডেমির সামনে পুলিশের গাড়িতে আগুন এবং পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় যমুনা ব্যাংক ও কয়েকটি পোশাক কারখানার গেটে ভাঙচুরের খবর পাওয়া গেছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিপেটার পাশাপাশি কাঁদানে গ্যাস, জলকামান ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে। মহাসড়কে অবরোধের কারণে চন্দ্রা থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা এবং কালিয়াকৈর ফায়ার সার্ভিস এলাকা থেকে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর পর্যন্ত বিভিন্ন অংশে তীব্র যানজট দেখা দেয়।

কালিয়াকৈর ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার তারেকুল ইসলাম জানান, ট্রপিক্যাল নিটেক্স লিমিটেডের ঝুটগুদামে আগুন লাগার খবর পেয়ে দুটি ইউনিট পাঠানো হয়। তবে সড়কে যান চলাচল বন্ধ ও যানজটের কারণে প্রথমে ঘটনাস্থলে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। পরে বিজিবির সহায়তায় উল্টো পথে গাড়ি দুটি ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা হয়।

কোনাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইফতেখার হোসেন জানান, শ্রমিকেরা মহাসড়ক অবরোধ করে কোনাবাড়ী ফ্লাইওভারের নিচে থাকা একটি পুলিশ বক্সে আগুন দিয়েছেন। গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. নুরুল করিম ভূঁইয়া জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পাঁচ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। তারা এক সপ্তাহ দায়িত্ব পালন করবে।

আশুলিয়া-সাভারেও শ্রমিক বিক্ষোভ

সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলেও শ্রমিকদের বিক্ষোভ, কর্মবিরতি ও সড়কে অবস্থানের ঘটনা ঘটেছে। ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, ব্ল্যাকলিস্টিং বন্ধসহ বিভিন্ন দাবিতে শ্রমিকেরা আন্দোলনে নামেন। সকালে কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ রেখে কারখানার ভেতরে অবস্থান করেন। পরে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা সড়কে নেমে বিক্ষোভ শুরু করেন।

নিশ্চিন্তপুর এলাকার আল-মুসলিম অ্যাপারেলস, নিউএইজ গ্রুপের একটি কারখানা এবং ট্রাউজার লাইন লিমিটেডের শ্রমিকদের কর্মবিরতির খবর পাওয়া গেছে। বেলা পৌনে ১১টার দিকে নরসিংহপুর এলাকায় শারমিন গ্রুপের কারখানার সামনে আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কে অবস্থান নেন কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা। তাঁরা বেতন বৃদ্ধি ও অন্যান্য দাবিতে স্লোগান দেন।

শ্রমিকদের শান্ত রাখতে আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১ মাইকিং করে। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি ও অধিকার আদায়ের বিষয়ে তারা আন্তরিক এবং শিল্পাঞ্চলের শান্তিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দায়িত্ব পালন করছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

সরকারবিরোধী চক্রের সম্পৃক্ততার আশঙ্কা পুলিশের

শ্রমিকদের চলমান আন্দোলনে সরকারবিরোধী বা রাষ্ট্রবিরোধী কোনো চক্র যুক্ত হয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে পুলিশ। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার মহিদুল ইসলাম বলেন, আন্দোলনকারী শ্রমিকদের সঙ্গে সরকারবিরোধী বা রাষ্ট্রবিরোধী কোনো চক্র যুক্ত হয়ে পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করছে কি না, সে বিষয়ে পুলিশের নজরদারি রয়েছে। তবে এ ধরনের সম্পৃক্ততার বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে তদন্ত ও যাচাই প্রয়োজন।

মজুরি নির্ধারণে ছয় সদস্যের বোর্ড

এদিকে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনের মধ্যে নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার। গতকাল সচিবালয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এ ঘোষণা দেন। তবে তাৎক্ষণিকভাবে বেতন বাড়ানোর কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বোর্ড বিভিন্ন পক্ষের মতামত, শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়, দ্রব্যমূল্য ও শিল্পের সক্ষমতা পর্যালোচনা করে নতুন মজুরি কাঠামোর সুপারিশ করবে।

এর আগে শনিবার রাজধানীর বিজয়নগরে শ্রম ভবনে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন শ্রমমন্ত্রী। শ্রমিক নেতাদের সঙ্গেও কয়েক দফা আলোচনা হয়েছে। বোর্ডে মালিক ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি, সরকারি প্রতিনিধি এবং নিরপেক্ষ সদস্য থাকবেন। বোর্ডের সুপারিশ ও পরবর্তী সরকারি সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারিত হবে।

বর্তমানে তৈরি পোশাকশ্রমিকদের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। ২০২৩ সালে আগের ৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এ মজুরি নির্ধারণ করা হয়, যা ওই বছরের ১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়।

আগের দিনের অবরোধের পর ফের উত্তেজনা

এর আগের দিন শনিবারও গাজীপুরের কালিয়াকৈরের চন্দ্রা পল্লীবিদ্যুৎ ও আনসার একাডেমির ৩ নম্বর ফটক এলাকায় শ্রমিকেরা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেন। দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত চলা ওই অবরোধে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। ওই দিন অন্তত ২০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল বলে শিল্প পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়। রাতে শ্রমিকেরা সড়ক ছেড়ে দিলেও রোববার সকালে আবারও অবরোধ শুরু হয়।

শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি, শিল্পাঞ্চলে সংঘাত এবং উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ঘটনায় তৈরি পোশাক খাতে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। একদিকে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় মজুরি বৃদ্ধির দাবি, অন্যদিকে শিল্পের উৎপাদন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার চ্যালেঞ্জ—দুই দিক সামাল দিতে সরকারের সামনে এখন বড় পরীক্ষা।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : নিউজ বাংলা চ্যানেল

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
১০০০ গোলের মাইলফলক থেকে আর মাত্র ১৯ গোল দূরে রোনালদো

১০০০ গোলের মাইলফলক থেকে আর মাত্র ১৯ গোল দূরে রোনালদো