ঢাকা | বঙ্গাব্দ

প্রতিদিনের আগুনে পুড়ছে দেশ ! সমাধান কোথায়? -মামুনার রশিদ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 27, 2025 ইং | Photo Card
প্রতিদিনের আগুনে পুড়ছে দেশ ! সমাধান কোথায়? -মামুনার রশিদ ছবির ক্যাপশন: ছবি : মো: মামুনার রশিদ, প্রবাসী সাংবাদিক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব
ad728
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ঘন ঘন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা জাতিকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। বাংলাদেশে এখন আগুন যেন প্রতিদিনের এক আতঙ্কের নাম। শহর থেকে গ্রাম -কোথাও আগুনের ভয় নেই এমন জায়গা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। দেশের গণমাধ্যমে আগুন যেন এখন এক নিয়মিত শিরোনাম। যেকোন অগ্নিকান্ড কেবল মানুষের জীবনই কেড়ে নিচ্ছে না, বরং রাষ্ট্রের অর্থনীতি ও নাগরিক নিরাপত্তাকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।
রাজধানী থেকে জেলা শহর, বাজার থেকে পোশাক কারখানা— কোথাও নিরাপত্তা নেই। একদিকে মানুষের অসাবধানতা ও অবহেলা, অন্যদিকে প্রশাসনিক দুর্বলতা, অবৈধ গুদাম, পুরনো বৈদ্যুতিক সংযোগ— সব মিলিয়ে অগ্নিকাণ্ড আজ এক নিঃশব্দ দুর্যোগে রূপ নিয়েছে। এই আগুন কেবল ভবন পুড়িয়ে দিচ্ছে না, পুড়িয়ে দিচ্ছে মানুষের স্বপ্ন, জীবিকা ও জাতীয় অর্থনীতির ভবিষ্যৎকেও।
রাজধানী ঢাকার বাণিজ্যিক ভবন, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের পোশাক কারখানা, চট্টগ্রামের গুদাম কিংবা পুরান ঢাকার আবাসিক এলাকা—আগুন লাগলেই শোক, ক্ষতি ও প্রাণহানির সংবাদে দেশ কেঁপে ওঠে। অথচ এই আগুনের অধিকাংশই ছিল প্রতিরোধযোগ্য, যদি আগে থেকেই যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হতো।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ঢাকার বাণিজ্যিক এলাকা,হযরত শাহজালাল আর্ন্তজাতিক বিমান বন্দর, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের শিল্পাঞ্চল, এমনকি হাসপাতালেও অগ্নিকাণ্ডের মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। অনেক সময় দেখা যায়, ভবনগুলোর ফায়ার এক্সিট বন্ধ, অ্যালার্ম অকেজো, পানির উৎস নেই, এমনকি ফায়ার সেফটি সনদও নবায়ন করা হয়নি। অথচ এসব অব্যবস্থাপনার পেছনে রয়েছে এক চরম উদাসীনতা— যা নিয়মিত তদারকি ও আইন প্রয়োগের অভাবে বেড়েই চলেছে।
বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, প্রতি বছর গড়ে ১৫,০০০–২০,০০০ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে প্রাণহানির পাশাপাশি ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় কয়েক হাজার কোটি টাকায়। রাজধানীর পুরান ঢাকার নন্দনকানন, চকবাজার, সদরঘাট বা কেরানীগঞ্জের গুদামঘরগুলো আজও আগুনের বারুদে ঘেরা।
শুধু রাজধানী ঢাকাতেই অগ্নি-ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা বাড়ছে প্রতিনিয়ত, যেখানে রাসায়নিক গুদাম, প্লাস্টিক সামগ্রী ও দাহ্য পণ্য সংরক্ষণ চলছে অনুমতি ছাড়াই— যা একেকটি সময় বোমার মতো।
এখন প্রশ্ন— আমরা কি কেবল আগুন লাগলে তা নেভানোর চেষ্টা করব, নাকি আগুন লাগা প্রতিরোধেই জোর দেব?
উন্নত দেশগুলোতে অগ্নি নিরাপত্তা মানে কেবল ফায়ার সার্ভিস নয়, বরং প্রতিরোধমূলক সংস্কৃতি। আমাদের দেশে সেই সংস্কৃতি এখনো গড়ে ওঠেনি।
অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে সরকারের প্রচেষ্টা থাকলেও তা যথেষ্ট নয়। ভবন নির্মাণে ফায়ার সেফটি সনদ বাধ্যতামূলক হলেও বাস্তবে তা অনেক ক্ষেত্রেই কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ। স্থানীয় প্রশাসন, সিটি করপোরেশন ও ফায়ার সার্ভিসের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব বড় একটি সমস্যা। পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতার ঘাটতি, অগ্নি প্রশিক্ষণের অভাব, এবং ব্যবসায়ীদের অবহেলাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধ এখন আর কেবল একটি প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি নাগরিক টিকে থাকার প্রশ্ন। তাই এখন প্রয়োজন সরকারের কঠোর তদারকি, স্থানীয় প্রশাসনের দক্ষতা, এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ।

এখন প্রয়োজন সমন্বিত টেকসই পরিকল্পনা।
প্রথমত, প্রতিটি বহুতল ভবন, মার্কেট ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বার্ষিক অগ্নি-নিরাপত্তা মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, পুরনো বৈদ্যুতিক তার ও সংযোগ ব্যবস্থা পর্যায়ক্রমে আধুনিকায়ন করতে হবে।
তৃতীয়ত, দাহ্য রাসায়নিক ও প্লাস্টিক সামগ্রীর গুদামগুলোকে আবাসিক এলাকা থেকে সরিয়ে নিতে হবে।
চতুর্থত, প্রতিটি ওয়ার্ডে ছোট পরিসরে ফায়ার স্টেশন স্থাপন ও প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করা যেতে পারে।
পঞ্চমত, স্কুল, অফিস ও কারখানায় মাসে অন্তত একবার করে অগ্নি মহড়া পরিচালনা করা উচিত।
একইসাথে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সচেতনতা সৃষ্টি, নাগরিক দায়িত্ববোধ জাগানো এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।
আমরা ভুলে যেতে পারি না— আগুন নিভিয়ে ফেলাই সমাধান নয়; আগুন লাগা বন্ধ করাই প্রকৃত প্রতিরোধ। প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডের পেছনে আছে অব্যবস্থাপনা ও অসচেতনতা, আর প্রতিটি প্রতিরোধের পেছনে দরকার দায়িত্ববোধ ও নীতির প্রতি শ্রদ্ধা।
বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের পথে দ্রুত এগিয়ে চলেছে। কিন্তু উন্নয়নের এ যাত্রা তখনই সফল হবে, যখন আমরা নিরাপত্তাকে উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখব।
প্রতিদিনের আগুনে যেন আর কোনো স্বপ্ন না পুড়ে যায়— এখনই সময় আগুন প্রতিরোধে জাতীয় অঙ্গীকার গড়ার।

লেখক: প্রবাসী সাংবাদিক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব

নিউজটি পোস্ট করেছেন : নিউজ বাংলা চ্যানেল

কমেন্ট বক্স
স্মৃতির পাশে দাঁড়াবে বলে জেমাইমা বিবিএল ছেড়ে দিল, একেই বলে

স্মৃতির পাশে দাঁড়াবে বলে জেমাইমা বিবিএল ছেড়ে দিল, একেই বলে