রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাজারে বিক্রি শুরু হয়েছে অ্যাপলের নতুন ফোন ‘আইফোন ডুয়ো’র। সিঙ্গাপুর, সাংহাই, লন্ডন ও সান ফ্রান্সিসকোর মতো শহরে ফোনটি নিয়ে ক্রেতাদের আগ্রহ লক্ষ করা গেছে। তবে আগের আইফোন বাজারে আসার সময় দোকানের সামনে দীর্ঘ সারি কিংবা রাতভর অপেক্ষার যে চিত্র দেখা যেত, এবার তা তুলনামূলকভাবে কম ছিল। সীমিত সরবরাহের কারণে বিক্রির ক্ষেত্রে অ্যাপলের আরোপ করা বিধিনিষেধ এর অন্যতম কারণ।
গত সপ্তাহে আগাম অর্ডার শুরু হওয়ার মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাদের জন্য ফোনটির সম্ভাব্য সরবরাহের সময় জানুয়ারির শেষ ভাগে পিছিয়ে যায়। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স। একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ দুটি ফোন আগাম অর্ডার করতে পারবেন বলে সীমা বেঁধে দিয়েছে অ্যাপল। আবার কিছু দেশে অনলাইনে আগাম অর্ডার দেওয়া গ্রাহকেরাই ফোনটি কেনার সুযোগ পেয়েছেন। ফলে আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও অনেক ক্রেতার জন্য ডিভাইসটি সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে উঠেছে।
দাম প্রায় ২ লাখ ৪৪ হাজার টাকা
আইফোন ডুয়োর মূল্য প্রায় ২ হাজার মার্কিন ডলার। প্রতি ডলারের আনুমানিক বিনিময়মূল্য ১২২ টাকা ধরে বাংলাদেশি মুদ্রায় ফোনটির দাম দাঁড়ায় প্রায় ২ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। তবে বাংলাদেশে এর আনুষ্ঠানিক মূল্য ও বাজারে আসার বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়। আমদানি শুল্ক, কর এবং বিক্রেতাদের মুনাফার কারণে স্থানীয় বাজারে দাম আরও বেশি হতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে ফোনটি কিনতে যাওয়া ৪৮ বছর বয়সী প্রকৌশলী সাইমন কৃষ্ণন রয়টার্সকে জানান, উচ্চমূল্যের কারণে তাঁর কাছে ফোনটি বিলাসী পণ্য। তারপরও জীবনের স্বল্পতা বিবেচনা করে তিনি এটি কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ৫১২ গিগাবাইট ধারণক্ষমতার ফোনটির জন্য তাঁকে ব্যয় করতে হয়েছে ৩ হাজার ৮৯৯ অস্ট্রেলীয় ডলার।
যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোর বাসিন্দা মোহিত চান্দেল তাঁর বাবার অবসর উপলক্ষে আইফোন ডুয়ো উপহার দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু আগাম অর্ডার দেওয়ার কথা ভুলে যাওয়ায় ফোনটি পেতে তাঁকে দোকানের সামনে রাতভর অপেক্ষা করতে হয়েছে। অন্যদিকে, হংকংয়ের কিছু ক্রেতা পরে বেশি দামে বিক্রির মাধ্যমে মুনাফা করার উদ্দেশ্যে ফোনটি কিনেছেন।
নকশায় ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া, ক্যামেরায় সীমাবদ্ধতা
প্রাথমিক পর্যালোচনায় ফোনটির নকশা এবং ভাঁজ করার কবজার প্রশংসা করেছেন পর্যালোচকেরা। ফোল্ডেবল ফোনের পর্দায় ভাঁজের দাগ স্পষ্ট হয়ে ওঠা এ ধরনের ডিভাইসের দীর্ঘদিনের একটি সীমাবদ্ধতা। পর্যালোচকদের অনেকে জানিয়েছেন, আইফোন ডুয়োতে এই দাগ তুলনামূলকভাবে কম চোখে পড়ে।
তবে ক্যামেরা নিয়ে কিছু সমালোচনাও রয়েছে। ফোনটিতে টেলিফটো লেন্স রাখা হয়নি। এ ছাড়া নতুন পর্দার আকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য আনতে কিছু থার্ড-পার্টি অ্যাপে পরিবর্তন প্রয়োজন হতে পারে। ভাঁজ করা অবস্থায় দ্রুত দৈনন্দিন কাজ করার ক্ষেত্রেও কিছু ব্যবহারকারীর কাছে ফোনটি কম সুবিধাজনক মনে হতে পারে।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, যাঁরা মূলত বার্তা আদান-প্রদান ও ইন্টারনেট ব্রাউজ করার মতো সাধারণ কাজে ফোন ব্যবহার করেন, তাঁদের সবার জন্য এত ব্যয়বহুল ফোল্ডেবল ডিভাইস প্রয়োজনীয় নয়। তবে একই যন্ত্রে স্মার্টফোন ও ট্যাবলেটের সুবিধা পাওয়ার বিষয়টি কিছু ক্রেতাকে আকৃষ্ট করছে।
ফোল্ডেবল ফোনের বাজারে অ্যাপলের সম্ভাবনা
স্যামসাং ইলেকট্রনিকস ও হুয়াওয়ের মতো প্রতিষ্ঠান বেশ কয়েক বছর ধরে প্রিমিয়াম ফোল্ডেবল ফোন বিক্রি করছে। এই বাজারে অ্যাপলের প্রবেশের ফলে ভাঁজ করা স্মার্টফোন আরও বেশি ক্রেতার কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকেরা।
বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইডিসির পূর্বাভাস বলছে, ২০২৬ সালে ফোল্ডেবল ফোনের বাজারমূল্যের ৪৪ শতাংশ অ্যাপলের দখলে যেতে পারে। তবে মোট ইউনিট বিক্রিতে প্রতিষ্ঠানটির অংশ হতে পারে ৩১ শতাংশ। আইডিসির ধারণা, ২০২৭ সালে বাজারমূল্য এবং বিক্রির সংখ্যার—উভয় ক্ষেত্রেই শীর্ষ অবস্থানে পৌঁছাতে পারে অ্যাপল।
তবে ক্রেতাদের আগ্রহ তৈরি করাই প্রতিষ্ঠানটির জন্য একমাত্র কাজ নয়। পর্যাপ্ত ফোন সরবরাহ, সময়মতো ক্রেতাদের হাতে ডিভাইস পৌঁছে দেওয়া এবং দীর্ঘ মেয়াদে ব্যবহারকারীদের আস্থা অর্জনও গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।
অ্যাপলের প্রথম ফোল্ডেবল আইফোনের বাজারে আত্মপ্রকাশ তাই নতুন একটি পণ্য উন্মোচনের পাশাপাশি ভাঁজ করা স্মার্টফোনের বাজারে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান তৈরির পরীক্ষাও। প্রাথমিক আগ্রহ শেষ পর্যন্ত কতটা স্থায়ী চাহিদায় রূপ নেয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
নিউজ বাংলা চ্যানেল