নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশের সামনে রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা। চীনের মতো বড় অর্থনৈতিক শক্তির বিনিয়োগে দেশের শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও রপ্তানি আয় বাড়ানোর সুযোগও রয়েছে ব্যাপক। ইতোমধ্যে বন্দর, অর্থনৈতিক অঞ্চল, জ্বালানি, সড়ক যোগাযোগ, আবাসন, কৃষি, ওষুধ ও উৎপাদনশিল্পসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো। কিন্তু প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা, বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়হীনতা, অনুমোদন প্রক্রিয়ার জটিলতা ও অবকাঠামোগত প্রস্তুতির ঘাটতিতে অনেক উদ্যোগ বাস্তবায়নে বিলম্ব হচ্ছে। ফলে বিনিয়োগের সম্ভাবনা থাকলেও তার প্রত্যাশিত সুফল মিলছে না।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে শুধু করছাড় কিংবা আর্থিক প্রণোদনা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সহজ, স্বচ্ছ, পূর্বানুমানযোগ্য ও হয়রানিমুক্ত ব্যবসায়িক পরিবেশ। বিনিয়োগ প্রস্তাব থেকে উৎপাদন শুরু পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ, কার্যকর ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের গতি বাড়তে পারে।
চীনা বিনিয়োগে নতুন সম্ভাবনা
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও উৎপাদনশিল্পে বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণে ভূমিকা রেখেছে চীন। পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, লাওস, ইথিওপিয়া ও কেনিয়াসহ বিভিন্ন দেশে চীনা অর্থায়ন ও অংশীদারত্বে গড়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান। তবে এসব বিনিয়োগের সুফলের পাশাপাশি কয়েকটি দেশে ঋণ পরিশোধের চাপ ও প্রকল্পের আর্থিক কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
বাংলাদেশেও চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো চীন থেকে যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্য আমদানি করে উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তৈরি পোশাক, ইলেকট্রনিকস, নির্মাণ, প্রকৌশল ও অন্যান্য শিল্পে এসব উপকরণের ব্যবহার রয়েছে। পাশাপাশি পদ্মা সেতু রেল সংযোগ, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রোরেল ও বিভিন্ন বিদ্যুৎ প্রকল্পে চীনা অর্থায়ন, সরঞ্জাম কিংবা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু ঋণনির্ভর প্রকল্পের পরিবর্তে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ ও যৌথ উদ্যোগ বাড়ানো গেলে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে বেশি সুফল পেতে পারে। এতে নতুন কারখানা স্থাপন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, স্থানীয় কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি, দেশীয় সরবরাহব্যবস্থার সম্প্রসারণ ও রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার ফাঁকে চীনের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠকের পর অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতায় ঋণনির্ভরতা কমিয়ে ধীরে ধীরে যৌথ ও সরাসরি বিনিয়োগের দিকে যেতে চায় বাংলাদেশ। উন্নয়ন প্রকল্পে শুধু ঋণ নেওয়ার পরিবর্তে বিনিয়োগকারী ও বাংলাদেশকে যৌথ অংশীদার করার মাধ্যমে নতুন অর্থায়ন কাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি আছে, বাস্তবায়নে ধীরগতি
ইনভেস্ট বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে চীন ২৭টি প্রকল্পের জন্য ২০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ ও সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এর মধ্যে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ১৩টি প্রকল্পে ৮ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, একই সময় পর্যন্ত ছাড় করা হয়েছে ৫ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে ১০টি প্রকল্পের বিপরীতে বাংলাদেশ ৪৮৩ মিলিয়ন ডলারের ঋণ পরিশোধ করেছে।
অর্থাৎ, প্রতিশ্রুত ২০ বিলিয়ন ডলারের বিপরীতে স্বাক্ষরিত ঋণচুক্তির পরিমাণ প্রায় ৪৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং অর্থ ছাড়ের পরিমাণ প্রায় ২৭ দশমিক ৭ শতাংশ। তবে ঋণ ও সহায়তার প্রতিশ্রুতি, চুক্তি এবং অর্থ ছাড়ের পরিমাণ এক নয়; প্রকল্পের প্রস্তুতি, শর্ত পূরণ ও বাস্তবায়নের অগ্রগতির ওপর অর্থ ছাড় নির্ভর করে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে চীনা বিনিয়োগের আগ্রহের কথাও জানা গেছে। পায়রা বন্দর শিল্পাঞ্চলে ই-বর্জ্য পুনর্ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা শিল্প স্থাপনে ১ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে। পুনর্ব্যবহারযোগ্য তুলা উৎপাদন, লিথিয়াম ব্যাটারি এবং ২০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে আরও ১৯০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া মোংলা বন্দর অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলতে ৬৫০ মিলিয়ন ডলার এবং সেখানে কোল্ড-চেইন লজিস্টিকস ও বন্ডেড ওয়্যারহাউস স্থাপনে ১৮০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের আগ্রহ রয়েছে। সম্প্রতি মোংলা বন্দর সম্প্রসারণে চীনা এক্সিম ব্যাংক ৩৩৫ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন ডলারের ঋণ দিয়েছে।
চীনের সিচুয়ান রোড অ্যান্ড ব্রিজ গ্রুপ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কভিত্তিক সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) প্রকল্পে ৪ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। রাজধানীর কড়াইল, সাততলা ও ভাষানটেক বস্তির উন্নয়নেও চীন ১০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে।
চায়না ফিউচার গ্রুপ হোল্ডিং লিমিটেড বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি—বাপেক্সের সঙ্গে অংশীদারত্বে ভোলার গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলনে ২৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে চায়। পাশাপাশি বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির (বিএমটিএফ) সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে রেলওয়ের রোলিং স্টক কারখানা স্থাপন, আধুনিক কৃষি, ঔষধি ভেষজ চাষ ও শিক্ষা খাতেও চীনা বিনিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে।
তবে এসব প্রস্তাবের সবকটিই চূড়ান্ত চুক্তি কিংবা বাস্তবায়নাধীন বিনিয়োগ নয়। প্রস্তাব থেকে চূড়ান্ত চুক্তি এবং চুক্তি থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত অগ্রগতি নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
আনোয়ারার অর্থনৈতিক অঞ্চল: সম্ভাবনা ও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০১৪ সালে। জমি প্রস্তুত, উন্নয়নকারী নির্বাচন, চুক্তি ও অবকাঠামো নির্মাণের বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পর্যায়ে এসেছে। ২০২২ সালে চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনকে উন্নয়নকারী হিসেবে যুক্ত করা হয়। ২০২৬ সালে শিল্পাঞ্চল-সংশ্লিষ্ট সহায়ক অবকাঠামোর জন্য ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন ও নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে ৩০টির বেশি চীনা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৫০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ-প্রতিশ্রুতির কথা রয়েছে। শিল্পাঞ্চলটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও রপ্তানি সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কিন্তু একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া এবং সেখানে উৎপাদন শুরু হওয়া এক বিষয় নয়। জমি বরাদ্দের পাশাপাশি সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বন্দর-সংযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে পরিবেশগত ছাড়পত্র, নির্মাণ অনুমোদন, অর্থায়ন এবং অন্যান্য প্রশাসনিক সিদ্ধান্তও সময়মতো সম্পন্ন করতে হয়।
সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, ব্যয় নির্ধারণ, দরপত্র, ঋণচুক্তি, জমির ইজারা ও উন্নয়ন চুক্তির মধ্যে অসামঞ্জস্য থাকলে দর-কষাকষি দীর্ঘায়িত হয়। বিভিন্ন দপ্তরের অনুমোদন ও সিদ্ধান্ত সমন্বিতভাবে না এলে একটি ধাপের বিলম্ব অন্য ধাপকেও আটকে দেয়। ফলে বিনিয়োগের ঘোষণা থাকলেও কারখানা নির্মাণ ও উৎপাদন শুরুর সময় পিছিয়ে যায়।
এক হাজারের বেশি চীনা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম
ইনভেস্ট বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে এক হাজারের বেশি চীনা প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৫৫ হাজারের বেশি কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। চীনা বিনিয়োগের ফলে উৎপাদন, রপ্তানি, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থায় অবদান রাখার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে সেখানে বিনিয়োগ প্রায় ১৩০ কোটি ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে এক লাখের বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য রয়েছে বলে ইনভেস্ট বাংলাদেশের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে হলে শুধু বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে জমি বরাদ্দ দিলেই হবে না। স্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযোগ, দক্ষ শ্রমিক তৈরি, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং দেশীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সরবরাহব্যবস্থায় যুক্ত করার উদ্যোগও প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রকল্পের আর্থিক কার্যকারিতা, পরিবেশগত প্রভাব, ঋণের দায় ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুফল মূল্যায়ন করতে হবে।
বিনিয়োগকারীরা কেন পিছিয়ে যাচ্ছেন
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সামনে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগের বহু বিকল্প রয়েছে। বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সেবা নির্ধারিত সময়ে পাওয়া না গেলে তারা অন্য দেশে চলে যেতে পারেন।
তিনি ইনকিলাবকে বলেন, বিনিয়োগ আকর্ষণে ওয়ান-স্টপ সার্ভিসসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার কথা বলা হলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে এক জায়গা থেকে নির্দিষ্ট সময়ে প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়া যায় না। ফলে নীতিগত সুযোগ-সুবিধার সুফল বিনিয়োগকারীরা পুরোপুরি পান না।
ভিয়েতনামের উদাহরণ তুলে ধরে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে বাস্তবমুখী বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করায় দেশটি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে এগিয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে কার্যকর বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের অভাবে বিনিয়োগের প্রত্যাশিত গতি তৈরি হচ্ছে না। এই বাধা শুধু বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নয়, দেশীয় উদ্যোক্তাদেরও সমস্যায় ফেলছে।
তার মতে, কাগজে-কলমে নীতি প্রণয়নের পাশাপাশি সেগুলোর বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
কার্যকর ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের তাগিদ
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা, সমন্বয়হীনতা ও স্বচ্ছতার অভাব ব্যবসার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং সম্ভাব্য বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে।
তিনি ইনকিলাবকে বলেন, এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কার্যকর ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু, বিধিবিধান সহজীকরণ, অনুমোদন প্রক্রিয়ার ডিজিটালাইজেশন এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেবা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
সেলিম রায়হানের মতে, শুধু করছাড় বা আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব নয়। জমি অধিগ্রহণ, পরিবেশগত ছাড়পত্র, পানি-বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ, কোম্পানি নিবন্ধন, কর, ভ্যাট ও কাস্টমস-সংক্রান্ত জটিলতা দূর করতে হবে। বিনিয়োগকারীদের জন্য সহজ, স্বচ্ছ, পূর্বানুমানযোগ্য ও হয়রানিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
দপ্তরগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে শুধু আকর্ষণীয় প্রণোদনা যথেষ্ট নয়; ব্যবসা শুরু ও পরিচালনার প্রক্রিয়াও সহজ করতে হবে।
তিনি ইনকিলাবকে বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ওয়ান-স্টপ সার্ভিস গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলেও শুধু অনলাইনে আবেদন করার সুযোগ থাকলেই হবে না। বিভিন্ন দপ্তরের অনুমোদন ও সেবা একই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করতে হবে, যাতে বিনিয়োগকারীকে আলাদাভাবে এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে যেতে না হয়।
ফাহমিদা খাতুনের মতে, আবেদন জমা দেওয়ার পর কোন দপ্তরে ফাইল রয়েছে, কী কারণে আটকে আছে এবং কত দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত হবে—এসব তথ্য জানার ব্যবস্থা থাকতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেবা দেওয়া না হলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, জমি, বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ, কর, শুল্ক ও পরিবেশগত অনুমোদনের প্রক্রিয়া সহজ ও স্পষ্ট করা প্রয়োজন। বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা এবং নিয়মিত সেবা মূল্যায়নও জরুরি। ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের সাফল্য নির্ভর করবে কতটি সেবা এর আওতায় রয়েছে, তার চেয়ে বেশি নির্ভর করবে বিনিয়োগকারীরা কত দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাচ্ছেন তার ওপর।
বিনিয়োগ বাস্তবায়নে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে উৎপাদনশিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিবহন, বন্দর, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে নতুন উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব। তবে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে রূপান্তর করতে হলে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সংস্কার জরুরি।
এ ক্ষেত্রে বিনিয়োগ-সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়, নির্দিষ্ট সময়সীমায় অনুমোদন, কার্যকর ডিজিটাল সেবা, জমি ও অবকাঠামো প্রস্তুত রাখা এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি বিনিয়োগ প্রস্তাবের আর্থিক বাস্তবতা, ঋণের ঝুঁকি, পরিবেশগত প্রভাব ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশকে শুধু সম্ভাবনার কথা বললে চলবে না; বিনিয়োগকারীদের কাছে বাস্তবে সহজ ও নির্ভরযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। চীনা বিনিয়োগসহ আন্তর্জাতিক পুঁজি কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা কমানো, জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা এবং ঘোষিত নীতির কার্যকর বাস্তবায়নই হতে পারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সম্প্রসারণের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
নিউজ বাংলা চ্যানেল