নিজস্ব প্রতিবেদক
দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় জামায়াত থেকে বহিষ্কৃত সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামের প্রথম দিনের জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে নজরুল ইসলাম অধিকাংশ প্রশ্নের উত্তর না দিলেও মাকছুদা বিভিন্ন বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তাদের তথ্য দিয়েছেন বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
শেরেবাংলা নগর থানায় করা মামলাটি ইতোমধ্যে ডিবিতে স্থানান্তর করা হয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, মরিয়মকে নির্যাতন ও মানসিক নিপীড়নের অভিযোগ, তার সঙ্গে নজরুলের সম্পর্ক ও বিয়ে এবং মৃত্যুর সময় বাসায় কারা উপস্থিত ছিলেন—এসব বিষয়ে দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
ডিবি সূত্র জানায়, জিজ্ঞাসাবাদের সময় নজরুল ইসলাম বেশিরভাগ প্রশ্নে নীরব ছিলেন। অন্যদিকে মাকছুদা বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পাশাপাশি কয়েক দফা কান্নায় ভেঙে পড়েন। তবে তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
মঙ্গলবার প্রথম দিনের রিমান্ড শেষে মাকছুদা ইসলামকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন ডিবির তদন্ত কর্মকর্তা। এর আগে সোমবার আদালত মাকছুদাকে এক দিন এবং গাজী নজরুল ইসলামকে চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
মাকছুদাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদনে ডিবির তেজগাঁও জোনাল টিমের পরিদর্শক মোহাম্মদ সালাউদ্দিন উল্লেখ করেন, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে মামলাসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে, যা তদন্তে সহায়ক হবে।
ডিবির তেজগাঁও বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, মরিয়মের মৃত্যুর সময় বাসায় কারা ছিলেন, কে কোথায় অবস্থান করছিলেন, বিয়ের পর মরিয়মের সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করা হয়েছে, নির্যাতনের অভিযোগের সত্যতা এবং ঘটনায় অন্য কারও প্রভাব ছিল কি না—এসব বিষয় নজরুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, দুজনকে আলাদাভাবে জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি কয়েকটি বিষয়ে মুখোমুখি করা হয়। মরিয়মের সঙ্গে নজরুলের পরিচয়, সম্পর্ক এবং বিয়ের বিষয়েও তাদের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে।
ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, তদন্ত এখনো চলমান। দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে এবং তিনি নিজেও তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তদন্ত শেষ হওয়ার পর কীভাবে ঘটনাটি ঘটেছে এবং এ ঘটনায় কারও দায় রয়েছে কি না, সে বিষয়ে বলা যাবে।
যেভাবে মরিয়মের মৃত্যু
রোববার সন্ধ্যায় সংসদ ভবনের বিপরীতে ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
ওই রাতেই সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদাকে আটক করা হয়। পরে মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহ আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে গাজী নজরুল ইসলাম, মাকছুদা ইসলাম এবং মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
মামলার পর থেকে ওবায়দুর রহমান পলাতক রয়েছেন। তাকে গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে ডিবি।
এর আগে গত জুলাইয়ে নজরুল ইসলাম ও মরিয়মের একটি অন্তরঙ্গ ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে নজরুল জানান, ওই তরুণী তার দ্বিতীয় স্ত্রী। তার দাবি, প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতেই চলতি বছরের ১৭ জুন তাদের বিয়ে হয়।
নজরুলের সংসদ সদস্যপদ নিয়ে টিআইবির প্রশ্ন
এদিকে মরিয়ম খাতুনের সঙ্গে সম্পর্ক, তাকে সংসদে চাকরি দেওয়ার এবং তার বাবাকে ঠিকাদারি লাইসেন্স করে দেওয়ার প্রলোভনের অভিযোগসহ বিভিন্ন বিষয় উল্লেখ করে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্যপদ বহাল থাকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে সংস্থাটি মরিয়মের মৃত্যু এবং এর আগে ওঠা যৌন ব্ল্যাকমেল বা ‘সেক্সটরশন’-এর অভিযোগের নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত তদন্তের দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে জনপ্রতিনিধিদের জন্য বিশেষায়িত ও বাধ্যতামূলক নৈতিক আচরণবিধি দ্রুত প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছে তারা।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গাজী নজরুল ইসলামের সংসদীয় অবস্থান নিয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তা জাতীয় সংসদ ও নির্বাচন কমিশনকে স্পষ্ট করতে হবে।
তবে সংবিধানের ৬৬(২)(ঘ) অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করে টিআইবি বলেছে, নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে অন্তত দুই বছরের কারাদণ্ড হলে একজন ব্যক্তি সংসদ সদস্য থাকার অযোগ্য হন। ফলে শুধু অভিযোগ, গ্রেপ্তার, রিমান্ড বা দলীয় তদন্তের সিদ্ধান্তের কারণে সংসদ সদস্য পদ সাংবিধানিকভাবে বাতিল হয় না।
তবে গুরুতর নৈতিক স্খলন, স্বার্থের সংঘাত, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা সংসদের মর্যাদা ক্ষুণ্নকারী আচরণের ক্ষেত্রে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছে টিআইবি।
সংস্থাটি জানায়, সংসদ সদস্যদের জন্য নৈতিক আচরণবিধি প্রণয়নের দাবি তাদের দীর্ঘদিনের। ২০১০ সালে ‘দ্য মেম্বার্স অব পার্লামেন্ট কনডাক্ট বিল, ২০১০’ সংসদে উত্থাপিত হলেও তা আইনে পরিণত হয়নি। ২০২৪-পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কারের প্রস্তাবেও সংসদ সদস্যদের জন্য পৃথক ‘মেম্বার অব পার্লামেন্ট কনডাক্ট অ্যাক্ট’ প্রণয়নের সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া জনপ্রতিনিধিদের সম্পদ বিবরণী প্রতিবছর হালনাগাদের বিধানসহ আইন প্রণয়নের প্রস্তাবও এসেছে বলে জানিয়েছে টিআইবি।
নিউজ বাংলা চ্যানেল