নিজস্ব প্রতিবেদক
এল ক্লাসিকো মানেই উত্তেজনা, মর্যাদার লড়াই আর রোমাঞ্চকর ফুটবল। আর সেই লড়াইয়ে আবারও নিজের কৌশলী কোচিংয়ের ছাপ রাখলেন হোসে মরিনহো। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনাকে তাদেরই মাঠে হারিয়ে শিরোপার দৌড়ে নতুন করে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছে রিয়াল মাদ্রিদ।
লা লিগায় রোববার ক্যাম্প ন্যুতে অনুষ্ঠিত ম্যাচে কিলিয়ান এমবাপের জোড়া গোলে বার্সেলোনাকে ২-১ ব্যবধানে হারায় রিয়াল। শেষ মুহূর্তের জয়সূচক গোলের পর মরিনহোর পরিচিত হাঁটু গেড়ে স্লাইড করে উদযাপন ম্যাচের উত্তেজনায় যোগ করে নতুন মাত্রা।
এই জয়ের মধ্য দিয়ে এল ক্লাসিকোতে টানা ছয় ম্যাচ অপরাজিত থাকার কীর্তি গড়েছেন মরিনহো। রিয়াল মাদ্রিদের ইতিহাসে মাত্র তৃতীয় কোচ হিসেবে এই অর্জন তাঁর। এর আগে মিগেল মুনিয়োজ ১৯৬২ থেকে ১৯৬৫ সাল এবং ভিসেন্তে দেল বস্কে ২০০১ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে টানা ছয় এল ক্লাসিকোতে অপরাজিত ছিলেন। বার্সেলোনার বিপক্ষে রিয়ালের কোচ হিসেবে মরিনহোর সর্বশেষ ছয় ম্যাচে জয় চারটি, ড্র দুটি।
মরিনহোর এই সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জনেই সীমাবদ্ধ নয়, লা লিগার শিরোপা লড়াইকেও দিয়েছে নতুন উত্তাপ। এই ম্যাচের আগে বার্সেলোনা জিতলে দুই দলের ব্যবধান বেড়ে নয় পয়েন্ট হতে পারত। কিন্তু রিয়ালের জয়ে সেই সম্ভাবনা শেষ হয়েছে। এখন প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দলের ব্যবধান মাত্র তিন পয়েন্ট।
এ ছাড়া বার্সেলোনার ঘরোয়া প্রতিযোগিতায় টানা নয় ম্যাচ জয়ের ধারাও থামিয়ে দিয়েছে রিয়াল। শেষ আট ম্যাচে বার্সেলোনার বিপক্ষে এটি তাদের মাত্র দ্বিতীয় জয় হলেও গুরুত্বপূর্ণ এই সাফল্য শিরোপার লড়াইয়ে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
ম্যাচ শেষে মরিনহো বলেন, ‘আমার মতে, রিয়াল মাদ্রিদ ক্যাম্প ন্যুতে শুধু ম্যাচ জিততে নামে না, তারা লা লিগা জিততে নামে।’
দলের পারফরম্যান্সে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমরা হয়তো ভাগ্যের সহায়তায় জিততে পারতাম, কিন্তু আমরা শান্ত থেকে এবং পুরোপুরি যোগ্যতা দিয়েই জিতেছি। এটি খুব শক্তিশালী একটি দল। সবাই কঠোর পরিশ্রম করে এবং সবাই জয়ের জন্য প্রস্তুত ছিল।’
খেলোয়াড়দের কৃতিত্ব দিয়ে মরিনহো আরও বলেন, ‘কৃতিত্ব খেলোয়াড়দেরই প্রাপ্য। জিতলে কৃতিত্ব তাদের যায়, কিন্তু হারলে দায়ভার কোচের ওপর পড়ে। এ জন্যই আমরা প্রতি সপ্তাহে কোচদের চাকরি হারাতে দেখি।’
১৩ বছর পর গত গ্রীষ্মে রিয়ালে ফিরে আসা এই পর্তুগিজ কোচের জন্য বার্সেলোনার বিপক্ষে জয়টি ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এল ক্লাসিকোতে তাঁর জয় ও পরাজয়ের সংখ্যা এখন সমান—ছয়টি করে।
দলের শক্তির জায়গাগুলো তুলে ধরে মরিনহো বলেন, ‘আমি বুঝেছি, আমার কাছে অসাধারণ একটি দল আছে, যারা মানসিকতা ও দক্ষতা দুই দিক থেকেই অনন্য।’
মিডফিল্ডের বৈচিত্র্যকে দলের বড় শক্তি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘মিডফিল্ডে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের খেলোয়াড় থাকাটা আমাদের বাড়তি সুবিধা দেয়। এটি রক্ষণে ভারসাম্য এবং আক্রমণে গুণগত মান নিশ্চিত করে।’
বড় ব্যবধানের জয় পেলেও বার্সেলোনার বিপক্ষে ম্যাচের কঠিন বাস্তবতা মনে করিয়ে দিয়েছেন মরিনহো। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা অনেক দলকে চার বা তার বেশি গোলের ব্যবধানে হারিয়েছি। কিন্তু এটি বার্সেলোনা। খেলোয়াড়রা অসাধারণ পারফরম্যান্স দিয়েছে। আমাদের এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে এবং এই জয়ের পর অতিরিক্ত উচ্ছ্বসিত হওয়া যাবে না।’
অন্যদিকে, হারের পর অজুহাত দিতে চাননি বার্সেলোনার কোচ হান্সি ফ্লিক। তবে ব্যস্ত সূচির কারণে দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে সতেজতার ঘাটতি ছিল বলে স্বীকার করেছেন তিনি।
ফ্লিক বলেন, ‘আমরা সেই সতেজতাটাই হারিয়েছিলাম। খেলোয়াড়দের জন্য বিষয়টি সহজ ছিল না। এখন আমাদের ভালোভাবে সেটা পুনরুদ্ধার করতে হবে, ভালো অনুশীলন করতে হবে এবং এই হার থেকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে।’
ম্যাচের ফল নির্ধারণে ছোট ছোট বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘বড় ম্যাচগুলোতে ছোট ছোট বিষয়ই পার্থক্য গড়ে দেয় এবং ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে। আজ সেগুলো আমাদের পক্ষে ছিল না।’
ফ্লিকের মতে, দলের পারফরম্যান্সে পরিবর্তন আনার জন্য সতেজতা ফিরে পাওয়া জরুরি। তিনি বলেন, ‘আমি দেখতে পাচ্ছি, আজ আমরা সতেজ ছিলাম না এবং এটিই আমাদের পরিবর্তন করতে হবে।’
বার্সেলোনার বিপক্ষে এই জয় রিয়াল মাদ্রিদকে যেমন শিরোপার লড়াইয়ে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে, তেমনি মরিনহোর কৌশল ও দলের মানসিক দৃঢ়তারও প্রমাণ দিয়েছে। তবে লিগের শিরোপা নির্ধারণে এখনো অনেক পথ বাকি। তাই এই জয়ের আনন্দে ভেসে না গিয়ে ধারাবাহিকতা ধরে রাখাই হবে মরিনহো ও তাঁর দলের পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জ।
নিউজ বাংলা চ্যানেল