চিকিৎসক শিহাব রাজধানীর বারডেম হাসপাতালের চক্ষু বিভাগে কর্মরত। তাঁর স্ত্রী নাফিজা নাওয়ার খান কাজ করেন মুগদা হাসপাতালে। শনিবার সকালে ইনানীর রিসোর্টে আগুন লাগার পর তাঁদের আনন্দময় অবকাশ মুহূর্তেই পরিণত হয় প্রাণ বাঁচানোর লড়াইয়ে। ঘরে আগুন ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি চারদিকে ধোঁয়া জমে যাওয়ায় বের হওয়ার পথ খুঁজে পাচ্ছিলেন না তাঁরা।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে বিয়ের পর থেকে নিয়মিত কক্সবাজারে বেড়াতে যেতেন শিহাব ও নাফিজা। পর্যটন নগরীর ব্যস্ততা এড়িয়ে নিরিবিলি সময় কাটাতে এবার তাঁরা বেছে নিয়েছিলেন মেরিন ড্রাইভের পাশের একটি রিসোর্ট। কিন্তু শনিবারের অগ্নিকাণ্ড তাঁদের সেই ভ্রমণকে ভয়াবহ অভিজ্ঞতায় পরিণত করে।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিহাব জানান, আগুন লাগার সময় তাঁরা দুজনই ঘুমিয়ে ছিলেন। সকালে চিৎকার ও হইচই শুনে তাঁদের ঘুম ভাঙে। স্ত্রী নাফিজা তাঁকে ডেকে রিসোর্টে কোনো সমস্যা হয়েছে বলে জানান। এরপর ঘর থেকে বেরিয়ে আগুনের ভয়াবহতা দেখতে পান তাঁরা।
শিহাবের বর্ণনা অনুযায়ী, অল্প সময়ের মধ্যেই চারপাশ ঘন ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে যায়। রিসোর্টের কাঠের কাঠামোর কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছিল। দরজা খুলে বাইরে বের হলেও নিচে নামার কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছিলেন না তাঁরা। এমন অবস্থায় স্ত্রীকে নিয়ে বেলকনিতে চলে যান শিহাব। সেখান থেকে নিরাপদে বের হওয়ার অন্য কোনো উপায় না দেখে দুজন পাশের টিনের ঘরের ছাদে ঝাঁপ দেন।
ছাদটি ভেঙে গেলে তাঁরা নিচে পড়ে যান। এতে নাফিজার পায়ে আঘাত লাগে। শিহাবের হাত ও কাঁধেও চোট লাগে। তবে দুজনই শেষ পর্যন্ত সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন।
পরে এক অটোরিকশাচালক আহত দম্পতিকে উদ্ধার করে প্রথমে উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তাঁদের কক্সবাজার সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
হাসপাতালে শিহাবের এক পরিচিতজন তাঁকে বিস্কুট ও কলা খাওয়াচ্ছিলেন। এ সময় আগুনে ছয় স্বজনকে হারানো আশিকুল অন্য একটি শয্যা থেকে উঠে এসে শিহাবের কাছে জানতে চান, তাঁর স্ত্রী ফিরে এসেছেন কি না। সরাসরি উত্তর না দিয়ে শিহাব তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, ‘এটাই তো ক্ষণিকের দুনিয়া।’ নিজের স্ত্রীসহ ছয় স্বজনকে হারানো আশিকুল হয়তো মনে করছিলেন, অন্যরাও তাঁর মতো প্রিয়জনকে হারিয়েছেন।
শিহাবের পরিবারে চিকিৎসকের সংখ্যা অনেক। তাঁর পরিবারের ১০ সদস্যই চিকিৎসক। অন্যদিকে, তাঁর স্ত্রী নাফিজা কুমিল্লার পরিচিত কাজি পরিবারের মেয়ে।
মেরিন ড্রাইভের শান্ত পরিবেশে অবকাশ কাটাতে বারবার কক্সবাজারে যাওয়া এই দম্পতির এবারের অভিজ্ঞতা পর্যটন এলাকার আবাসনব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে রিসোর্টে অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি বহির্গমন পথ এবং বিপদের সময় পর্যটকদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থাও যথাযথ কি না, ইনানীর এই অগ্নিকাণ্ড সেই বিষয়টি পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।
নিউজ বাংলা চ্যানেল