ঢাকা | খ্রি.

ন্যাশনাল ব্যাংককে ৭ হাজার কোটি টাকা ধার দিল সোনালী ব্যাংক

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 14, 2026 ইং | Photo Card
ন্যাশনাল ব্যাংককে ৭ হাজার কোটি টাকা ধার দিল সোনালী ব্যাংক ছবির ক্যাপশন: ছবি সংগৃহীত
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক

আর্থিক সংকট ও তারল্যসংকটে ধুঁকতে থাকা বেসরকারি খাতের ন্যাশনাল ব্যাংককে ৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের শতভাগ গ্যারান্টির বিপরীতে ১০ শতাংশ সুদে তিন মাসের জন্য এ অর্থায়ন করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে ন্যাশনাল ব্যাংক ঋণের অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে গ্যারান্টির শর্ত অনুযায়ী তিন কর্মদিবসের মধ্যে সোনালী ব্যাংককে অর্থ পরিশোধ করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

ব্যাংক খাতে তারল্যসংকট মোকাবিলা ও আস্থা ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগের অংশ হিসেবে এ অর্থায়ন করা হয়েছে। তবে বিপুল অঙ্কের এ ঋণ সহায়তা ন্যাশনাল ব্যাংকের তাৎক্ষণিক অর্থসংকট কতটা কাটাতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ, দীর্ঘদিনের অনিয়ম, উচ্চ খেলাপি ঋণ, ধারাবাহিক লোকসান ও আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে না পারার চাপ এখনো ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থাকে দুর্বল করে রেখেছে।

সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শওকত আলী খান বলেন, ব্যাংক খাতে আস্থা ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংক যে উদ্যোগ নিয়েছে, তার প্রতি সমর্থন জানিয়ে শতভাগ গ্যারান্টির বিপরীতে ন্যাশনাল ব্যাংককে তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। মেয়াদ শেষে ন্যাশনাল ব্যাংক অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ ব্যাংক তিন কর্মদিবসের মধ্যে সোনালী ব্যাংককে ওই অর্থ পরিশোধ করবে। ফলে এ অর্থায়নে সোনালী ব্যাংকের কোনো ঝুঁকি নেই বলে তিনি দাবি করেন। এর আগে ইসলামী ব্যাংকগুলোকে একইভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টির বিপরীতে অর্থ দেওয়া হয়েছিল বলেও জানান তিনি।

অনিয়ম-লুটপাটের প্রভাব কাটেনি

একসময় বেসরকারি খাতের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকগুলোর একটি ছিল ন্যাশনাল ব্যাংক। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। পরবর্তী সময়ে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ চলে যায় সিকদার পরিবারের হাতে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদে আবারও পরিবর্তন আসে।

তবে আগের পরিচালনা পর্ষদের সময়ে সংঘটিত অনিয়ম ও ঋণ বিতরণসংক্রান্ত দুর্বলতার প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারেনি ব্যাংকটি। উচ্চ খেলাপি ঋণের চাপে আর্থিক সূচকগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে। ধারাবাহিক লোকসানের পাশাপাশি আমানতকারীদের চাহিদা অনুযায়ী অর্থ ফেরত দিতে গিয়েও হিমশিম খাচ্ছে ব্যাংকটি।

ব্যাংকটিকে সচল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেও বড় অঙ্কের তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এরপরও স্বাভাবিক লেনদেন পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। সম্প্রতি ন্যাশনাল ব্যাংকের চার আমানতকারী তাঁদের জমা টাকা তুলতে না পেরে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। পরে তাঁদের সঞ্চয়ী হিসাবের অর্থ উত্তোলন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

আমানতকারীদের টাকা ফেরতের নির্দেশ

এ পরিস্থিতিতে গত ৮ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মেলিতা মেহজাবীন ও ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহিদুল হক।

সাক্ষাৎকালে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে ব্যাংকে সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি দক্ষতা ও কার্যক্ষমতা বাড়াতে ঋণ ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা হয়েছে।

গভর্নর ন্যাশনাল ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি এবং আমানতকারীদের চাহিদা অনুযায়ী অর্থ উত্তোলনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার কথা জানান। আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা, ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থা বজায় রাখা এবং ব্যাংকটির কার্যক্রম সুশৃঙ্খল রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দেন তিনি। একই সঙ্গে ১৫ অক্টোবর থেকে ব্যাংকটির সব আমানতকারী যাতে চাহিদা অনুযায়ী টাকা তুলতে পারেন, তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পাওনা ১০ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা

ন্যাশনাল ব্যাংকের তারল্যসংকটের চিত্র আরও স্পষ্ট হয়েছে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের অর্থ পরিশোধে ব্যর্থতার ঘটনায়। এর আগে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ৯৮৫ কোটি টাকা ধার নিয়েছিল ব্যাংকটি। নির্ধারিত সময়ে সেই অর্থ পরিশোধ করতে না পারায় বাংলাদেশ ব্যাংককে দায় মেটাতে হয়। ফলে ওই অর্থ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ন্যাশনাল ব্যাংকের ঋণ হিসেবে দায় তৈরি করেছে।

বর্তমানে ন্যাশনাল ব্যাংকের কাছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পাওনা ১০ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এ অর্থের পুরোটাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন টাকা সৃষ্টি করে সরবরাহ করেছে।

সাময়িক স্বস্তি, দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিয়ে প্রশ্ন

ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, তারল্যসংকটে থাকা ব্যাংকগুলোকে সচল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টির বিপরীতে অন্য ব্যাংক থেকে অর্থ ধার নেওয়ার ব্যবস্থা তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে। এতে আমানতকারীদের অর্থ উত্তোলনের চাপ সামাল দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয় এবং ব্যাংকিং কার্যক্রম সচল রাখা সহজ হয়।

তবে শুধু ঋণ বা তারল্য সহায়তা দিয়ে একটি ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। খেলাপি ঋণ আদায়, ঋণ বিতরণে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং লোকসান কমানোর কার্যকর উদ্যোগ না থাকলে সংকট আবারও ফিরে আসতে পারে।

ন্যাশনাল ব্যাংকের ক্ষেত্রে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার, আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং ঋণের অর্থ যথাসময়ে পরিশোধের সক্ষমতা অর্জন। সোনালী ব্যাংকের দেওয়া ৭ হাজার কোটি টাকার সহায়তা সাময়িক স্বস্তি আনতে পারে; কিন্তু ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে কাঠামোগত সংস্কার ও কার্যকর ঋণ আদায়ের বিকল্প নেই।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : নিউজ বাংলা চ্যানেল

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ