মো: মামুনার রশিদ : বাংলাদেশ এমন এক ভূতাত্ত্বিক অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকি বহু বছর ধরেই বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে আসছেন। কিন্তু আজকের সাম্প্রতিক ভূকম্পন আবারও দেখিয়ে দিল—আমাদের প্রস্তুতি যতটা থাকার কথা ছিল, বাস্তবে তার কাছাকাছিও নেই। আতঙ্ক, দৌড়াদৌড়ি, যাচাইবাছাইহীন গুজব—সব মিলিয়ে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়, যা মূল ভূমিকম্পের চেয়েও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
যে সত্যটি আমাদের বুঝতে হবে—ভূমিকম্প থামানো সম্ভব নয়, তবে এর ক্ষতি কমানো সম্পূর্ণভাবেই সম্ভব। আর এজন্য প্রয়োজন ভয় নয়, জ্ঞাত ও সংগঠিত প্রস্তুতি।
সাম্প্রতিক ভূমিকম্পে বহু স্থানে ভবনে ফাটল, জানালার কাচ পড়ে যাওয়া, পুরনো রেলিং ধসে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। ভয় ও আতঙ্ক এতটাই ছড়িয়ে পড়ে যে মানুষ পরিকল্পনা ছাড়া সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে নেমেছে, কেউ কেউ লিফট ব্যবহারেরও চেষ্টা করেছে। অথচ সঠিক জ্ঞান থাকলে এ ধরনের বিশৃঙ্খলা সহজেই কমানো যেত।
আজকের এই বাস্তবতা আমাদের সামনে স্পষ্ট করে বলছে—শুধু “টিকে থাকা” নয়, বরং “প্রস্তুত থাকা”ই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। ভয় নয়—প্রস্তুতিই আসল অস্ত্র।
১. ভূমিকম্পের সময় করণীয় :
মাথা ও শরীর ঢেকে টেবিলের নিচে বা দেয়ালের শক্ত অংশে আশ্রয় নিন।
জানালা, আলমারি, ভারী আসবাবের পাশে থাকবেন না।
বাইরে থাকলে উন্মুক্ত স্থানে যান, বৈদ্যুতিক খুঁটি বা ভবনের খুব কাছে না দাঁড়ান।
২. পরিবার ও অফিসে জরুরি পরিকল্পনা :
ভূমিকম্প হলে সবাই কোথায় জমায়েত হবেন তা ঠিক করুন।
বিকল্প যোগাযোগ পদ্ধতি ঠিক রাখুন।
নিয়মিত ড্রিল পরিচালনা করুন, যাতে আতঙ্ক নয়, স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
৩. ভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন :
পুরনো বা ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের কাঠামো পর্যালোচনা করা জরুরি।
বারান্দার রেলিং, দেয়াল, সিঁড়ির বেয়ারিং—এসব জায়গা নিয়মিত চেক করা উচিত।
নির্মাণ বিধিমালা কঠোরভাবে প্রয়োগ না হলে ভবিষ্যৎ ঝুঁকি ভয়াবহ হতে পারে।
৪. জরুরি কিট প্রস্তুত রাখুন। একটি ছোট ব্যাগে রাখুন—টর্চলাইট, প্রাথমিক চিকিৎসা, পাওয়ার ব্যাংক, পানি, শুকনো খাবার, গুরুত্বপূর্ণ কাগজের কপি।
গুজব নয়, তথ্যই হোক ভিত্তি । ভূমিকম্পের পর একদল মানুষ গুজব ছড়ায়—“আরও বড় ভূমিকম্প আসছে”, “ফল্ট লাইন ছিঁড়ে গেছে” ইত্যাদি। অথচ বিশ্বের কোথাও ভূমিকম্প আগাম ১০ মিনিটও পূর্বাভাস দেওয়া যায় না। গুজব আতঙ্ক বাড়ায়, সিদ্ধান্ত ভুল পথে নেয়।
সঠিক সূত্র—ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র, আবহাওয়া অধিদপ্তর, জাতীয় দুর্যোগ প্রতিরোধ সংস্থার আপডেট—এসবের ওপর ভরসা করা উচিত। আজকের সতর্কতা—আগামী দিনের প্রস্তুতির সোপান। আমাদের রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলো ঘনবসতিপূর্ণ, ভবন নির্মাণে অনিয়ম কম নয়। এই বাস্তবতায় ভূমিকম্প যখনই আসে, ক্ষতির ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। তাই আজকের অভিজ্ঞতা আমাদের চোখ খুলে দেয়—
প্রস্তুতির ঘাটতি আছে।
সচেতনতা কম।
ভবন নিরাপত্তায় ত্রুটি রয়েছে।
পরিবারগুলো জানে না কী করতে হবে।
অতএব এখনই সময় এসব পরিবর্তন করার। ভূমিকম্পের ভয় কখনোই শেষ হবে না—এটা প্রকৃতির নিয়ম। কিন্তু ভয়কে নিয়ন্ত্রণ করা, ক্ষতি কমানো এবং বাঁচার পথ তৈরি করা মানুষের হাতে। আজকের ভূমিকম্প আমাদের সেই কথাই মনে করিয়ে দিল— ভূমিকম্পে ভীত হওয়া নয়—প্রস্তুত হওয়ার সময় এসেছে।
এখনই সচেতন হই, পরিবারকে প্রস্তুত করি, ভবনকে নিরাপদ করি।
কারণ দুর্যোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে বড় শক্তি—জ্ঞান, প্রস্তুতি ও শৃঙ্খলা।
নিউজ বাংলা চ্যানেল