ঢাকা | খ্রি.

বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের নতুন দিগন্ত, বাণিজ্য-বিনিয়োগ ও কৌশলগত সহযোগিতায় গুরুত্ব

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 13, 2026 ইং | Photo Card
বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের নতুন দিগন্ত, বাণিজ্য-বিনিয়োগ ও কৌশলগত সহযোগিতায় গুরুত্ব ছবির ক্যাপশন: ছবি সংগৃহীত
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক

স্বাধীনতার পর পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে গড়ে উঠেছে আস্থা, বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক সহযোগিতার সুদৃঢ় সম্পর্ক। অবকাঠামো উন্নয়ন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, প্রযুক্তি, মানবসম্পদ, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাপানের ধারাবাহিক সহযোগিতা বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পরিবর্তিত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতির প্রেক্ষাপটে দুই দেশের এই সম্পর্ক এখন উন্নয়ন সহযোগিতার গণ্ডি পেরিয়ে বিস্তৃত অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্বের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগামী ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর জাপান সফরকে ঘিরে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্রগুলো বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলমের মতে, পাঁচ দশকে বাংলাদেশ ও জাপানের কূটনৈতিক সম্পর্ক কেবল দাতা ও গ্রহীতার সম্পর্কে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা কৌশলগত অংশীদারিত্বের নতুন রূপ নিয়েছে। শিক্ষা, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক অর্থনীতির সমন্বিত অগ্রগতি দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। এই মূল্যায়ন দুই দেশের সম্পর্কের ক্রমবর্ধমান গভীরতা এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার বহুমাত্রিক সম্ভাবনাকে তুলে ধরে।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে টোকিও সফরে যাবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারপ্রধান হিসেবে তাঁর এই সফরে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পাশাপাশি বাণিজ্য সম্প্রসারণ, জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণ, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। সফরে জাপানের সম্রাট নারুহিতোর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের পাশাপাশি দেশটির ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গেও আলোচনার কর্মসূচি রয়েছে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর টোকিও সফরের প্রধান অগ্রাধিকার হবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করা, অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব গভীর করা এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা। তাঁর বক্তব্যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় রূপ দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের আগ্রহ স্পষ্ট হয়েছে।

অবকাঠামো উন্নয়নে জাপানের গুরুত্বপূর্ণ অবদান

বাংলাদেশের উন্নয়ন অবকাঠামোয় জাপানের অবদান দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম দৃশ্যমান দিক। যমুনা বহুমুখী সেতু, কর্ণফুলী টানেল, ঢাকার মেট্রোরেল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, যমুনা রেলওয়ে সেতু এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে জাপানের অর্থায়ন ও কারিগরি সহযোগিতা রয়েছে। এসব প্রকল্প দেশের যোগাযোগব্যবস্থা আধুনিকায়ন, পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রম সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখছে।

জাপানের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশকে দেওয়া দেশটির ঋণসহায়তার পরিমাণ প্রায় ৩৩ হাজার ৬১৮ কোটি ইয়েন। একই সময়ে অনুদানসহায়তা ছিল প্রায় ৫ হাজার ১৮৪ কোটি ইয়েন এবং কারিগরি সহযোগিতা প্রায় ১ হাজার ৮১ কোটি ইয়েন। ২০২৪ সালের ওইসিডি/ডিএসি হিসাবেও বাংলাদেশে জাপান ছিল বৃহত্তম দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী। দীর্ঘমেয়াদি এই সহযোগিতা দুই দেশের সম্পর্ককে কূটনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি বাস্তব উন্নয়ন অংশীদারিত্বে পরিণত করেছে।

অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তিতে নতুন সম্ভাবনা

বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক সম্পর্কের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো বাণিজ্য ও প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ। দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) কার্যকর হলে বাজার সম্প্রসারণ, ব্যবসায়িক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণ, শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জাপানের বাজারে পণ্যের প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণে এ চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (জেবিসিসিআই) নবনির্বাচিত সভাপতি কাজুইকি কাতাওকা জানিয়েছেন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অবকাঠামো খাতে বাংলাদেশের উন্নয়নে জাপানের দীর্ঘদিনের অবদান আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার পাশাপাশি খাতভিত্তিক ব্যবসা সম্প্রসারণে তাঁরা কাজ করবেন। প্রায় ৪০০ সদস্যপ্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সেমিনার, ব্যবসায়িক যোগাযোগ ও জ্ঞান বিনিময়ের উদ্যোগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তিকে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, চুক্তিটি অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি করবে। জাপানি বিনিয়োগের কয়েকটি উদ্যোগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে উল্লেখ করে তিনি সেগুলো যথাসময়ে বাস্তবায়নের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। পাশাপাশি শিল্পের বহুমুখীকরণ, পশ্চাৎমুখী শিল্পের বিকাশ, অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক বাধা দূর করা এবং তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

জেবিসিসিআইয়ের বিদায়ী সভাপতি তারেক রাফি ভূঁইয়া চুক্তিটির সময়োপযোগী অনুসমর্থন ও কার্যকর বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে ব্যবসায়ীদের এর সুযোগ কাজে লাগানোর প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে, চেম্বারের মহাসচিব রাবিউল আলম বলেছেন, নতুন পরিচালনা পর্ষদ পূর্ববর্তী নেতৃত্বের শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে দুই দেশের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে চেম্বারকে এগিয়ে নিতে কাজ করবে। ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বর মেয়াদের জন্য কাজুইকি কাতাওকাকে নতুন সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে।

জাপান-বাংলাদেশ বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা কমিটির চেয়ারম্যান ফুমিয়া কোকুবু জানিয়েছেন, বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনাকারী ৮৫ শতাংশ জাপানি কোম্পানি ২০২৬ সালের মধ্যেই অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার প্রত্যাশা করে। তিনি বাংলাদেশের করনীতি সংস্কারের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন। জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী নোরিহিকো ইশিগুরো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও নতুন বিনিয়োগের সুযোগকে জাপানি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে তুলে ধরেছেন।

প্রযুক্তি, জ্বালানি ও শিল্পে জাপানি বিনিয়োগ

বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে মারুবেনি কর্পোরেশন। প্রতিষ্ঠানটির প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসায়ুকি ওমোটোর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, সার ও জ্বালানি খাতে সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে তাঁদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি, সার ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের জন্য তিনি মারুবেনি কর্পোরেশনকে স্বাগত জানিয়েছেন।

আলোচনায় বাংলাদেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ডেটা সেন্টার স্থাপন, কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানিতে বিদ্যমান বিনিয়োগ সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও উঠে এসেছে। দেশে দ্বিতীয় একটি কাফকো স্থাপনের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রকৌশল স্নাতকদের তথ্যপ্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তায় দক্ষ করে তোলার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে জাপানি প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের সঙ্গে বাংলাদেশের তরুণ জনশক্তির সমন্বয়ে নতুন কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

জ্বালানি সহযোগিতাও ভবিষ্যৎ অংশীদারিত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। বাংলাদেশের চলমান অফশোর বিডিং রাউন্ড ২০২৬-এর আওতায় বঙ্গোপসাগরের ২৬টি ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে সহযোগিতা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির অবনতির কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা ও মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব মোকাবেলায় বাংলাদেশকে প্রায় ৩১ কোটি ২০ লাখ ডলারের জরুরি ঋণসহায়তা দিচ্ছে জাপান। এ বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে ঋণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। জাপান দূতাবাসের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ঢাকায় জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী নোট বিনিময় চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। পরে জাইকা বাংলাদেশ কার্যালয়ের প্রধান প্রতিনিধি তাকাহাশি জুনকো ও ইআরডি সচিব ঋণ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। অর্থনৈতিক সহনশীলতা বৃদ্ধি ও স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে এ সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ

বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের আরেকটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হলো দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি। অতীতে নীতিগত দুর্বলতা, মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটনির্ভর ব্যবস্থার অভিযোগ এবং কারিগরি ও ভাষা প্রশিক্ষণের সমন্বিত কাঠামোর অভাবে জাপানের শ্রমবাজারে বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণ প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি। পরবর্তী সময়েও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও কার্যকর উদ্যোগের সীমাবদ্ধতা এ ক্ষেত্রে অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করেছে।

বর্তমান সরকারের উদ্যোগে জাপানি ভাষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ, জাপানি সরকার ও ব্যবসায়িক সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং দক্ষ কর্মী তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়ায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তব সাফল্যে রূপ দিতে প্রশিক্ষণের মান নিশ্চিত করা, স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা গড়ে তোলা, অভিবাসন ব্যয় কমানো এবং কর্মীদের অধিকার ও নিরাপত্তা সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।

জাপানের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের কর্মীদের জন্য সুযোগ বাড়লে বৈদেশিক কর্মসংস্থান, রেমিট্যান্স বৃদ্ধি এবং দেশের বেকারত্ব মোকাবেলায় ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে জাপানের চাহিদা অনুযায়ী ভাষাগত দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও পেশাগত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা এ ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ।

স্বাস্থ্য, মানবিক নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান

অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি স্বাস্থ্য, মানবিক নিরাপত্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও জাপানের সহায়তা অব্যাহত রয়েছে। গত ৬ অক্টোবর জাপান সরকার ঢাকার বস্তি এলাকায় যক্ষ্মা শনাক্তকরণ কার্যক্রম সম্প্রসারণে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) সঙ্গে ১ লাখ ৪৫ হাজার মার্কিন ডলারের অনুদান চুক্তি স্বাক্ষর করে। এ অর্থে একটি টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজার ও একটি বহনযোগ্য ডিজিটাল এক্স-রে ইউনিট সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটির মাধ্যমে বছরে প্রায় ৯ হাজার মানুষের যক্ষ্মা শনাক্তকরণ সেবা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি বলেছেন, মানুষের জীবন ও মর্যাদা সুরক্ষায় মানবিক নিরাপত্তাকে জাপান বিশেষ গুরুত্ব দেয়। স্বাস্থ্যসেবার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীর কাছে প্রয়োজনীয় সেবা পৌঁছে দেওয়ার মধ্য দিয়ে এই অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হচ্ছে।

নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সহায়তার ক্ষেত্রেও জাপানের ভূমিকা রয়েছে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সঙ্গে চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক ও কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধিতে জাপান ৬৯৫ মিলিয়ন ইয়েন অনুদান দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। ভোটার ও নাগরিক শিক্ষা, নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণ এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বৃদ্ধিতে এ সহায়তা ব্যবহারের লক্ষ্য রয়েছে।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন সহযোগিতাটিকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, এটি জনসাধারণের আস্থা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সমুন্নত রেখে নির্বাচন আয়োজনের সক্ষমতা শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে। ইউএনডিপি বাংলাদেশের আবাসিক প্রতিনিধি স্টেফান লিলারও জাপানের সহযোগিতাকে শান্তিপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের যৌথ লক্ষ্যে নতুন শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

গবেষণা, শিক্ষা ও সমুদ্র অর্থনীতিতে সহযোগিতা

গবেষণা, শিক্ষা ও সমুদ্র অর্থনীতিতেও বাংলাদেশ-জাপান সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র রয়েছে। বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. ইমদাদুল হক বলেছেন, জাপানের উন্নত গবেষণাগার ও প্রযুক্তি বাংলাদেশের কৃষি ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

একইভাবে, আইসিওজির পরিচালক ড. কে এম আজম চৌধুরী সামুদ্রিক বিজ্ঞান, পরিবেশ পর্যবেক্ষণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় যৌথ গবেষণার সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, জাপানের উপকূলীয় ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশগত অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের ব্লু ইকোনমির বিকাশে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন, উপকূলীয় দুর্যোগ, সামুদ্রিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার এবং আধুনিক মৎস্য ব্যবস্থাপনায় দুই দেশের গবেষণা সহযোগিতা নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে।

জাপানের দূতাবাসের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দৈনিক ইনকিলাবকে জানিয়েছেন, গণমাধ্যমে তাৎক্ষণিক বা সরাসরি মন্তব্য প্রকাশের ক্ষেত্রে দূতাবাসের আনুষ্ঠানিক প্রটোকল ও পূর্বানুমতির বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সংক্ষিপ্ত মন্তব্য প্রকাশের জন্যও নির্দিষ্ট অনুমতি প্রয়োজন হয়। দূতাবাসের জনসংযোগ ও সাংস্কৃতিক শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান ই-মেইলের মাধ্যমে অনুমতি দিলে কেবল তখনই এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়া সম্ভব।

কৌশলগত অংশীদারিত্বের নতুন সম্ভাবনা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এস এম আলী রেজার মূল্যায়নে, দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক কৌশলগত গুরুত্ব বহন করছে। জাপানের ইন্দো-প্যাসিফিক ভিশন এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে এই সহযোগিতার সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হতে পারে।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ও জাপানের সম্পর্ক এখন ঐতিহাসিক উন্নয়ন সহযোগিতার ভিত্তি অতিক্রম করে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, জ্বালানি, মানবসম্পদ, স্বাস্থ্য, গবেষণা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার বিস্তৃত পরিসরে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন টোকিও সফর এই সম্পর্ককে আরও সুসংহত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। তবে সফরের সাফল্য নির্ভর করবে আলোচনায় গৃহীত সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন, অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তির কার্যকর অগ্রগতি, বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি এবং দক্ষ জনশক্তি উন্নয়নে দৃশ্যমান পদক্ষেপের ওপর। পারস্পরিক আস্থা ও দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের ভিত্তিতে উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক দুই দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও কৌশলগত সহযোগিতায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : নিউজ বাংলা চ্যানেল

কমেন্ট বক্স
অস্ত্র ছাড়লেও রাজনীতি থেকে সরবে না হামাস

অস্ত্র ছাড়লেও রাজনীতি থেকে সরবে না হামাস