নিজস্ব প্রতিবেদক
টেস্টোস্টেরন শব্দটি শুনলেই অনেকের মনে পুরুষত্ব, শক্তি কিংবা পেশিবহুল শরীরের কথা আসে। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে টেস্টোস্টেরন কেবল ‘পুরুষ হরমোন’ নয়। এটি মানবদেহের গুরুত্বপূর্ণ একটি হরমোন, যা যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ছাড়াও পেশি, হাড়, রক্তকণিকা, শক্তি, মেজাজসহ শরীরের বিভিন্ন কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়ঃসন্ধিকালে ছেলেদের শরীরে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা বাড়ার সঙ্গে শারীরিক নানা পরিবর্তন ঘটে। কণ্ঠস্বর ভারী হওয়া, মুখ ও শরীরে লোম গজানো, পেশির বিকাশ, হাড়ের দৃঢ়তা এবং প্রজনন অঙ্গের পরিপূর্ণ বিকাশের সঙ্গে এই হরমোনের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে।
তবে টেস্টোস্টেরনের ভূমিকা কৈশোরেই শেষ হয়ে যায় না। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের যৌন আকাঙ্ক্ষা, শুক্রাণু উৎপাদন, পেশির ভর ও শক্তি এবং হাড়ের ঘনত্ব বজায় রাখার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে এর ভূমিকা রয়েছে। ফলে শরীরে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় কমে গেলে শারীরিক সক্ষমতা ও সামগ্রিক জীবনযাত্রার ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে।
টেস্টোস্টেরনের সঙ্গে মানসিক সুস্থতারও সম্পর্ক রয়েছে। মাত্রা কমে গেলে কিছু মানুষের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি, উদ্যমের ঘাটতি, মনোযোগ কমে যাওয়া, মনমরা ভাব কিংবা যৌন আগ্রহ কমে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে এসব লক্ষণ শুধু টেস্টোস্টেরনের ঘাটতির কারণে হয়—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়। ঘুমের সমস্যা, স্থূলতা, দীর্ঘস্থায়ী কিছু রোগ, নির্দিষ্ট ওষুধসহ বিভিন্ন কারণেও একই ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
সাম্প্রতিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে টেস্টোস্টেরনের ভূমিকা যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিপাকীয় স্বাস্থ্যের সঙ্গেও আলোচিত হচ্ছে। শরীরের চর্বির পরিমাণ, পেশির ভর এবং বিপাকীয় কার্যক্রমের সঙ্গে টেস্টোস্টেরনের সম্পর্ক রয়েছে। তাই হরমোনের ঘাটতি থাকলে সামগ্রিক স্বাস্থ্য মূল্যায়নের প্রয়োজন হতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, শুধু ক্লান্তি বা যৌন সক্ষমতার পরিবর্তন দেখেই টেস্টোস্টেরনের ঘাটতি ধরে নেওয়া উচিত নয়। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শে রক্ত পরীক্ষা করে হরমোনের মাত্রা মূল্যায়ন করা হয়। সাধারণত রোগীর উপসর্গ, শারীরিক অবস্থা ও পরীক্ষার ফল—সবকিছু বিবেচনা করেই টেস্টোস্টেরনের ঘাটতি নির্ণয় করা হয়।
টেস্টোস্টেরনের ঘাটতি নিশ্চিত হলে রোগীর বয়স, কারণ, অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে টেস্টোস্টেরন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি বিবেচনা করা হতে পারে। তবে এই চিকিৎসা সবার জন্য উপযুক্ত নয় এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ছাড়া হরমোন গ্রহণ ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা থাকা পুরুষদের ক্ষেত্রে চিকিৎসার ধরন নির্ধারণে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, সুষম খাবার এবং ধূমপান ও অতিরিক্ত অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা সামগ্রিক হরমোন ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ দীর্ঘদিন থাকলে নিজে থেকে হরমোন বা কোনো ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টেস্টোস্টেরন শরীরের গুরুত্বপূর্ণ একটি হরমোন হলেও এর মাত্রা নিয়ে অযথা আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং শরীরের পরিবর্তন, দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি, যৌনস্বাস্থ্যের সমস্যা বা অন্য কোনো উপসর্গ দেখা দিলে যথাযথ চিকিৎসা মূল্যায়ন জরুরি।
অতএব, টেস্টোস্টেরনকে শুধু পুরুষত্বের প্রতীক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, পেশি ও হাড়ের স্বাস্থ্য, যৌন ও প্রজনন সক্ষমতা এবং সামগ্রিক সুস্থতার সঙ্গে জড়িত এই গুরুত্বপূর্ণ হরমোন সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। সময়মতো স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সঠিক রোগনির্ণয় এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াই পারে দীর্ঘমেয়াদি সুস্থ জীবন নিশ্চিত করতে।
নিউজ বাংলা চ্যানেল