নিউজ বাংলা ডেস্ক: আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে নতুন ঋণচুক্তির আলোচনা সামনে রেখে সংস্থাটির আগের বেশ কিছু কঠোর শর্ত থেকে ধীরে ধীরে সরে আসছে সরকার। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ না দেওয়ার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে সরকার কিছু ক্ষেত্রে আইএমএফের প্রত্যাশিত নীতির পরিবর্তে তুলনামূলক জনবান্ধব অবস্থান গ্রহণ করছে। এতে নতুন ঋণচুক্তি নিয়ে আলোচনা কতটা সহজ হবে, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট মহলে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
সরকারের অবস্থান হলো, দেশের স্বার্থের পরিপন্থি কোনো শর্ত মেনে আইএমএফের সঙ্গে ঋণচুক্তি করা হবে না। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্প্রতি একাধিক অনুষ্ঠানে এ অবস্থানের কথা স্পষ্ট করেছেন। ফলে নতুন ঋণচুক্তির ক্ষেত্রে সরকার একদিকে আন্তর্জাতিক সংস্থাটির শর্ত বিবেচনা করছে, অন্যদিকে জনগণের জীবনযাত্রার ওপর সম্ভাব্য প্রভাবও হিসাব করছে।
নতুন ঋণচুক্তির প্রস্তুতি
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আইএমএফের কাছে নতুন ঋণ সহায়তা চেয়ে চিঠি দেয়। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে করা আগের ঋণচুক্তি বাতিল করে নতুন চুক্তির দিকে এগিয়ে যায় সরকার।
এরই ধারাবাহিকতায় আইএমএফের একটি মিশন ১২ থেকে ১৬ জুলাই ঢাকা সফর করে। সফরকালে মিশন বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, বৈদেশিক মুদ্রাবাজার, মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব, ব্যাংকিং খাতসহ বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে আইএমএফ নতুন ঋণের সম্ভাব্য শর্ত নির্ধারণ করবে বলে জানা গেছে।
পরবর্তী সময়ে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সভার সাইডলাইনে ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর সরকারের সঙ্গে এসব বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। ওই আলোচনাতেই নতুন ঋণচুক্তির কাঠামো ও শর্ত নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
ডলার বাজারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ
আইএমএফের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া। অর্থাৎ ডলারের দাম নির্ধারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি হস্তক্ষেপ না করার কথা ছিল।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আবারও বাজার পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় হয়েছে। আগস্টের শুরুতে ডলারের দাম দ্রুত বাড়তে থাকলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে আন্তঃব্যাংক বাজারে ১২৩ টাকা ৮২ পয়সার বেশি দরে ডলার না কেনাবেচার জন্য মৌখিকভাবে নির্দেশনা দেওয়ার কথা জানা যায়। এর পর আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলারের দাম ১২২ টাকা ৭৭ পয়সার কাছাকাছি নেমে আসে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যুক্তি হলো, ডলারের দাম অতিরিক্ত বেড়ে গেলে আমদানি ব্যয় বাড়বে এবং এর প্রভাব পড়বে পণ্য ও সেবার দামে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে। বাজারে কারসাজির মাধ্যমে ডলারের দাম বাড়ানোর প্রবণতা থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নজরদারি প্রয়োজন বলেও মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
মূল্যস্ফীতি কমার আগেই সুদের হার কমানোর উদ্যোগ
আইএমএফের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল মূল্যস্ফীতি সন্তোষজনক পর্যায়ে না আসা পর্যন্ত কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রাখা। কিন্তু সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাম্প্রতিক সময়ে সুদের হার কমানোর পথে এগিয়েছে।
আগস্টের শুরুতে নীতি সুদের হার কমানো হয়েছে। একই সঙ্গে ঋণের সুদের হার কমানোর জন্যও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল ঋণের উচ্চ সুদের হার কমানো। তাদের যুক্তি, বেশি সুদের কারণে নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং ব্যবসার ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
সরকারও বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে সুদের হার কমানোর প্রয়োজনীয়তা দেখছে। তবে মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসার আগেই মুদ্রানীতি শিথিল করা হলে আইএমএফের সঙ্গে নতুন ঋণচুক্তির আলোচনায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।
জ্বালানি ও ভর্তুকিতে কঠোর অবস্থান নেই
আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারের দাম সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিল আইএমএফ। পাশাপাশি বিভিন্ন খাতে সরকারি ভর্তুকি কমানোর কথাও ছিল।
কিন্তু বর্তমান সরকার এসব ক্ষেত্রে আগের মতো কঠোরভাবে এগোচ্ছে না। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে পুরোপুরি সমন্বয় করে দাম নির্ধারণ করলে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, কৃষি উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে।
নিউজ বাংলা চ্যানেল