ঢাকা | খ্রি.

রাজধানীতে ভবনের অনিয়ম ঠেকাতে নাগরিক সচেতনতার ওপর জোর রাজউক চেয়ারম্যানের

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Aug 8, 2026 ইং | Photo Card
রাজধানীতে ভবনের অনিয়ম ঠেকাতে নাগরিক সচেতনতার ওপর জোর রাজউক চেয়ারম্যানের ছবির ক্যাপশন: ছবি সংগৃহীত
ad728
নিউজ বাংলা ডেস্ক : রাজধানীতে ভবন নির্মাণে অনিয়ম বন্ধ করতে রাজউকের পাশাপাশি ভবন মালিক, স্থপতি, প্রকৌশলী ও সাধারণ নাগরিকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম। তিনি বলেন, কোনো ভবনের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পরও অনেকে অবৈধভাবে পুনরায় সংযোগ নেন এবং পরে আদালতের আশ্রয়ও নেন। ফলে প্রতিটি ভবনের পেছনে আলাদা করে পরিদর্শক নিয়োগ করা রাজউকের পক্ষে সম্ভব নয়।

শনিবার (৮ আগস্ট) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে ঢাকা ইউটিলিটি রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডুরা) আয়োজিত ‘ভূমিকম্প ঝুঁকিতে দেশ: আমাদের করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

ভবন নির্মাণে নিয়ম লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বাস্তব সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘একটা বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ কাটা হলে তারা আবার চুরি করে লাগায়, কোর্টে যায়। তাহলে একটা বাড়ির পেছনে কি আমাকে একজন করে ইন্সপেক্টর লাগিয়ে রাখতে হবে? এত লক্ষ ইন্সপেক্টর আমি কোথায় পাব? এই চ্যালেঞ্জগুলো আমাদের প্রতিনিয়ত মোকাবিলা করতে হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ভবনের প্ল্যান বা ডিজাইন তৈরি হয় নাগরিকদের পক্ষ থেকেই, আর রাজউকের কাজ মূলত সেটির অনুমোদন দেওয়া। প্রতিটি বাড়ি পুলিশিং করে নির্মাণ করা কোনো দেশের পক্ষেই সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

রাজউক চেয়ারম্যানের ভাষায়, ‘প্ল্যান বা ডিজাইন তো আপনাদের এন্ড থেকেই আসে, রাজউক শুধু অনুমোদন দেয়। পৃথিবীর কোনো দেশে কি পুলিশিং করে বাড়িঘর তৈরি করা সম্ভব? একটা বিল্ডিংয়ের মিটার নিয়ে আমরা কী করব? এটা সচেতনতা বৃদ্ধির বিষয়। আমরা একটা গাইডলাইন দিতে পারি। কিন্তু তারা অবৈধভাবে পাশের বাড়ি থেকে মিটার আনে, অথবা মিটার হারিয়ে গেছে বলে জিডি করে নতুন মিটার আনে। এটা তো পাবলিক এন্ডের অবস্থা।’

রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে শুধু নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। ভবন মালিক, স্থপতি, প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে। কারণ প্রতিটি ভবনে সার্বক্ষণিক নজরদারি করা রাজউকের পক্ষে বাস্তবসম্মত নয়।

পরিকল্পিত নগরায়ণ ও আবাসন নিয়ে রাজউক কাজ করছে জানিয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের বিভিন্ন অনিয়মের ধারাবাহিকতায় বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। রেগুলেটরি ইস্যুতে রাজউকের উপস্থিতি দুর্বল হলেও এই অবস্থার মধ্যেই কাজ শুরু করতে পারাকে তিনি বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন।

ভবন নির্মাণের পুরোনো পদ্ধতির প্রসঙ্গ তুলে ধরে রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, আগে শুধু আর্কিটেকচারাল প্ল্যানের ভিত্তিতেই ভবন নির্মাণ করা হতো। তখন ফায়ার সেফটি, ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল কিংবা স্ট্রাকচারাল ড্রয়িংয়ের প্রয়োজন হতো না। বর্তমানে এসব ঘাটতি দূর করার পাশাপাশি পুরোনো ভবন রেট্রোফিটিংয়ের দায়িত্বও রাজউকের ওপর এসেছে।

ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমাতে রাজধানীর ভবনগুলোর ত্রুটি শনাক্ত করে পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। তাঁর মতে, ভবন ধসে পড়ার ঝুঁকি শুধু ভবনের উচ্চতার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; ত্রুটিপূর্ণ নকশা, মাটির অবস্থা এবং নির্মাণে অনিয়মও গুরুত্বপূর্ণ কারণ। তাই অনুমোদিত নকশা অনুসরণ, মাটি পরীক্ষা এবং প্রকৌশলগত মান নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

রাজধানীতে বিপুলসংখ্যক ভবন থাকায় একসঙ্গে সব ভবনের ঝুঁকি নিরূপণ করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে রিয়াজুল ইসলাম বলেন, এজন্য ধাপে ধাপে র‌্যাপিড ভিজ্যুয়াল অ্যাসেসমেন্ট, প্রিলিমিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসেসমেন্ট এবং ডিটেইল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসেসমেন্ট করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

ভূমিকম্প মোকাবিলায় রাজউকের সক্ষমতা বাড়াতে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। এর মাধ্যমে ভূমিকম্পের আগে ঝুঁকি নিরূপণ, জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং প্রয়োজনীয় গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।

ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবিলায় শুধু রাজউককে দায়ী করা ঠিক হবে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ফায়ার সার্ভিসসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। কার্যকর সিটি গভর্নমেন্ট ব্যবস্থা থাকলে নগর ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন কার্যক্রম আরও সহজ ও সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা সম্ভব বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

ভবন নির্মাণে অনিয়মের বিষয়ে রিয়াজুল ইসলাম স্পষ্ট করে বলেন, অনুমোদিত ছয়তলা ভবনকে নিয়মবহির্ভূতভাবে ১০ তলা করা কিংবা অনুমোদিত নকশা পরিবর্তন করে নির্মাণের সুযোগ দেওয়া হবে না। এ ধরনের ভবনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কারিগরি ও আইনি যাচাই ছাড়া অনুমোদনের কোনো সুযোগ নেই।

নকশা প্রণয়নকারী স্থপতি ও প্রকৌশলীদেরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। শুধু নকশায় স্বাক্ষর করাই তাদের দায়িত্ব নয়; নির্মাণকাজের বাস্তবায়ন ও তদারকিতেও তাদের ভূমিকা থাকতে হবে। অনিয়মের ক্ষেত্রে তাদেরও আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলে জানান রাজউক চেয়ারম্যান।

নাগরিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা নিয়মের মধ্যে আসুন। অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী ভবন নির্মাণ করুন এবং অকুপেন্সি সার্টিফিকেট নিন।’ গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভবন নির্মাণসংক্রান্ত অনিয়মের তথ্য যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।

রাজউকের বর্তমান দুর্বল উপস্থিতিকে আরও শক্তিশালী পর্যায়ে নিয়ে যাওয়াকে নিজের লক্ষ্য উল্লেখ করে রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘এই কাজ একদিনে সম্ভব নয়। শুরু করেছি, কতটুকু করতে পারব জানি না; তবে আমরা চেষ্টা করছি।’

আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী হাসান আনসারী।

রিহ্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট-১ মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ভবন নির্মাণের ঝুঁকি সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে গণমাধ্যমকে নিয়মিত ভূমিকা রাখতে হবে। একই সঙ্গে প্রকৌশলী ও তদারকি সংস্থাগুলোকে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সততা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, ভূমিকম্পের ঝুঁকি শুধু ভবনের নকশা বা নির্মাণের মান দিয়ে নির্ধারিত হয় না। ভবনটি কোন স্থানে এবং কী ধরনের মাটির ওপর নির্মিত হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। অপরিকল্পিত আবাসন প্রকল্প ভূমিকম্পের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপপরিচালক সালেহ উদ্দিন বলেন, ভূমিকম্প মোকাবিলায় কোনো একটি সংস্থার একার পক্ষে কার্যকরভাবে কাজ করা সম্ভব নয়। সব অংশীজনকে সমন্বিতভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে। এজন্য সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি নিয়মিত মহড়া ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে।

তিনি জানান, ভূমিকম্পের পর দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ঢাকার আশপাশের ৪১টি ফায়ার স্টেশনকে এয়ারমার্ক করা হয়েছে এবং বিশেষ রেসপন্স টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তবে এই প্রস্তুতিকে যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে সরকারি-বেসরকারি সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল বলেন, ঢাকায় অনুমোদিত ভবনের অতিরিক্ত তলা নির্মাণ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এ ধরনের ভবন শনাক্ত করে দ্রুত পরিদর্শনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

ডুরার সভাপতি শাহজাহান মোল্লা বলেন, ঢাকাসহ সারাদেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমকে আরও সক্রিয় হতে হবে। সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের পর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ডুরার সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম। এতে সিনিয়র সাংবাদিক রিপন তালুকদারসহ সংগঠনটির সদস্য ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : নিউজ বাংলা চ্যানেল

কমেন্ট বক্স
ছয় মাসের মধ্যে সুষ্ঠু নির্বাচন করে দায়িত্ব থেকে মুক্তি চাই -

ছয় মাসের মধ্যে সুষ্ঠু নির্বাচন করে দায়িত্ব থেকে মুক্তি চাই -